ফাতেমা জোহরা :
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠে। সভা – সমাবেশ , মিছিল, রাখী বন্ধন , গান , বন্দে মাতরম ধ্বনি , গ্রেপ্তার, নিপীড়ন — সবকিছু মিলে এক নব জাগরণের হাওয়া চারদিকে । শ্রমিকেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে ; ছাত্ররা ছিল আন্দোলনের পুরোভাগে । কার্জন ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন – বাঙালীরা নিজেদের জাতি ভাবতে শুরু করেছে । বলেছিলেন , ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের কর্তব্য জাতি গঠনের এই চেষ্টাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা ।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ক্রমেই স্বদেশী আন্দোলনে রূপ নেয় , সহিংসতা বৃদ্ধি পায় । সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠে । যার ফলে লর্ড কার্জন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হন। ইতিহাসের কৌতূককর বিষয় এই যে , বাঙালী যে জাতি হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছিল , সে চেষ্টার কারণেই জাতি গঠনের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেল । জাতি বিভক্ত হয়ে গেল দুইভাগে । একভাগ হিন্দু , অন্যভাগ মুসলমান। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনে ব্রিটিশরা উৎসাহ জুগিয়েছে , তাদের স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবী মেনে নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে । সেসময়ের ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের এক গোপন নথিতে এরকম মন্তব্য করা হয়েছে যে , “Hindus and Mussalmans hate each other so much that they have not much time to hate us।”
এই সাম্প্রদায়িকতার পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ অপরিহার্য হয়ে পড়ে । কার্জন ভাগ করতে চেয়েছিলেন প্রদেশকে , সেই বিভক্তিকরণ থামাতেই বাঙালীরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে দূ’টুকরো করে ফেললো তাদের দেশকে । একাংশ রয়ে গেল ভারতে , অপরাংশ অন্তর্ভূক্ত হলো পাকিস্তানের ।
বাঙালী মুসলমানদের পাকিস্তানে অঙ্গীভূত হওয়ার কারণ যতোটা ধর্মীয় , তারচেয়ে অধিক অর্থনৈতিক । মওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছেন , ” বাংলায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু রাজনীতি ও চাকরিতে তারা ছিল কোণঠাসা । ধর্মীয় কারণও ছিল , তবে প্রীতি অর্থে নয় , বঞ্চনার ক্ষেত্রে । ১৯০৫ সাল ও তৎপরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যে মধ্যবিত্তের হাতে ছিল , ধর্মীয় পরিচয়ে তারা ছিলেন হিন্দু । ফলে আন্দোলনে হিন্দু ঐতিহ্য , প্রথা , আচরণের প্রভাব পড়লো, প্রভাতে গঙ্গা স্নান , নগ্নপায়ে স্তোত্রপাঠ , মন্দিরে শপথ গ্রহণ , বন্দে – মাতরম রণধ্বনি – এইসব বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত ও প্রকাশিত হলো । জনগণের কাছে যাবার যে ভাষা , সেসময়ের নেতৃত্বের অনেকেরই তা আয়ত্বে ছিল না । ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে তারা ঐক্য গড়ার চেষ্টা চালিয়েছেন । উনিবিংশ শতাব্দিতে যেসব প্রতিষ্ঠানের হওয়ার কথা ছিল জাতীয় সেগুলো হয়ে গেল হিন্দু মেলা ( জাতীয় মেলা) , হিন্দু কলেজ ও হিন্দু পেট্রিয়ট ( পত্রিকা ) । স্বদেশী আন্দোলনের সময় মুসলমানদের একাংশের আশঙ্কা হলো বঙবঙ্গ রদ হলে হিন্দু আধিপত্য বাড়তেই থাকবে । বঙ্কিম চন্দ্রের মতে ,” সমাজের যে অবস্থা ধর্মের অনুকূল , তাহাকে স্বাধীনতা বলা যায় । ” ভিটেমাটি ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ এপার থেকে ওপারে , ওপার থেকে এপারে এলো । তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ । আশ্চর্য্য রকম স্বাধীনতা বৈকি !
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে এক রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটে পড়েন । ধর্মনিরপেক্ষতার প্রেরণায় নতুন রাষ্ট্রের সূচনাতেই তিনি বলেছিলেন , পাকিস্তানে ধর্মীয় বিভাজন থাকবে না । সকল নাগরিক সমান । সবাই সমানভাবে পাকিস্তানি । তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের ঐক্যের ভিত্তিটা কি হবে ? জিন্নাহ সেখানে ভাষাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন । ভাষার ভিত্তিতে ঐক্য গড়তে গিয়ে জিন্নাহ নিজের গড়া পাকিস্তানকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দিলেন।
অবিভক্ত ভারতে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও পাকিস্তান আমলে আঞ্চলিক বৈষম্য মূখ্য হয়ে উঠে । অথচ পাকিস্তান আন্দোলনের সময় একমাত্র পূর্ব বাংলা পাকিস্তানকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দেয় । পাকিস্তানের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার আইনসভার সদস্যরা তাদের জন্য নির্ধারিত আসনে পাঁচজন অবাঙালীকে নির্বাচিত করে । তাদের একজনও বাঙালিদের পক্ষে একটা শব্দও উচ্চারণ করে নি । স্বাধীনতা ততোদিনে অপহৃত হয়ে গেছে । যার অনিবার্য ফল ভাষা আন্দোলন , যার মূল শক্তি ছিল ছাত্র সমাজ । ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত রায় প্রকাশ করে।
বলা হয়ে থাকে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে বাঙালিরা দুইবার মাত্র একত্রিত হতে পেরেছিল। ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ৭০ এর নির্বাচন । একত্রিত হবার সুফল যেমন এসেছিল , আত্মকলহে নিমজ্জিত হয়ে সেই সুফল হাতছাড়া করতেও সময় লাগে নি । রাস্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দিয়ে প্রদেশে গভর্নরের শাসন প্রবর্তিত হয় । ১৯৫১ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে চলছিলো মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা , সাত বছরে ছয় প্রধানমন্ত্রী । গভর্নর গোলাম মোহাম্মদের সুনজর আকর্ষনে পূর্ব বাংলা আওয়ামী লীগ ও কৃষক – শ্রমিক পার্টির হাস্যকর প্রতিযোগিতা চলে । অনিবার্য বিরোধ বাধে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে । সেই দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্ব , ব্রিটিশ যুগে যেটা ছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে । এর রেশ ধরে আইনসভার অধিবেশনে স্পীকারের প্রাণ হারানোর ঘটনা পর্যন্ত ঘটে ।
স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে এদেশের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত।
স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে এদেশের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত । স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষণা আসে ১০ ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে মুজিবনগর সরকার গঠনের মাধ্যমে ।
৬৯ এর গণজাগরণকে ” জালেম ” ও
” মজলুমের ” এর মধ্যকার সংঘাত হিসেবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে মওলানা ভাসানী ” Prophet of Violence ” হিসেবে পরিচিতি পান । ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের নায়ক ছিলেন ভাসানী । সেই অভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে । বিক্ষোভ কমাতে ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন। এক মানুষ , এক ভোট কায়েম হলো ।৭০ এর নির্বাচনে কেন্দ্র ও প্রদেশে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে । সেই রায়ের মুখোমুখি সামরিক শাসকেরা আর ছদ্মাবরণ ধরে রাখতে পারে নি। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে , শুরু হয় গণহত্যা ।
গণহত্যার অন্যতম নায়ক রাও ফরমান আলী লিখেছেন :
” স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের একটি প্লাটুন রাত ১ টা ৩০ মিনিটে শেখ মুজিবর রহমানকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে । তাদের বেশকিছু প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয় । রাত ২ টায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় । পিলখানায় রাত ২ টা ৩০ মিনিটে ইপিআরকে (২৫০০) নিরস্ত্র করা হয় । তারা কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা নিয়েছিল । রিজার্ভ পুলিশ (২০০০), যারা কঠোর প্রতিরোধ করেছিলো তাদের নিরস্ত্র করা হয় রাত ৩ টার মধ্যে । তারপর ভোর পাঁচটায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকা দখল করা হয় । ইকবাল হল , লিয়াকত ( সলিমুল্লাহ হল) , জগন্নাথ হলের ছাত্ররা কঠিন প্রতিরোধ গড়ে৷ তুলেছিল , এরমধ্যে মারাত্মক ছিল জগন্নাথ হলের প্রতিরোধ । আওয়ামী বিখ্যাত সব নেতাদের বাসভবন ঘেরাও করা হয়েছিল কিন্তু কাউকেই পাওয়া যায় নি । ” ( দি বার্থ অব বাংলাদেশ – রাও ফরমান আলী)
গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের গ্রেপ্তারে বাংলার মানুষ আপোষহীন হয়ে উঠে । হয় মৃত্যু , নয় স্বাধীনতা এই তাদের মনোভাব । ১৯০৫ সালে ধ্বনি উঠেছিল বন্দে – মাতরম , তার পাল্টা ধ্বনি ছিল আল্লাহু আকবর ।সুভাষ বসু আজাদ হিন্দ ফৌযে সাম্প্রদায়িকতা দূর করার জন্য ” জয় হিন্দ ” রেওয়াজ প্রচলন করেন । আওয়ামী লীগ ৭০-৭১ সালে ” জয় বাংলা ” রণধ্বনি উচ্চারণ করে , যা ছিল অসাম্প্রদায়িক । ১৯৪৭ সালে ধর্মকে রাজনীতির সাথে মিশিয়ে ফেলার যে ভুল ছিল , সেটার সংশোধনের চেষ্টা যেন ।
১৯৭১ সালে নয়মাসব্যপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা । স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করে । ১৯৭৫ সালে ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের সূত্রপাত হয় ।
সদ্য স্বাধীন দেশে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সশস্ত্র বাহিনীকে পর্যাপ্ত সুযোগ – সুবিধে প্রদানে অক্ষমতা , পাকিস্তান প্রত্যাগত ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যেদের দ্বন্দ্ব , সেনাবাহিনীর সমান্তরাল রক্ষীবাহিনী গঠন – এসব সেনাবাহিনীতে নানামাত্রিক অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ২৫ বছর ব্যপী ভারতের সাথে সাম্য – মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি , বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন , এর ফলে সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব , চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল গঠন সর্বোপরি দেশি – বিদেশী ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধু হত্যা ও তাঁর সরকারকে উৎখাতের পেছনে কাজ করেছিল। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজের “বাংলাদেশ : এন ফিনিশড রেভ্যুলেশন ”
বই থেকে জানা যায় , মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ’র জ্ঞাতসারে কয়েকজন দক্ষিণপন্থী আওয়ামী লীগ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তাদের বছরাধিক কালের ষড়যন্ত্রের ফলে শেখ মুজিব নিহত হন ।
১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট থেকে ৭ ই নভেম্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে । ১৯৭৭ সালে ২৪ শে এপ্রিল জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন বেসামরিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে । তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উপর গুরুত্ব দেন , বাঙালী ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করেন । জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন । জিয়ার শাসনামলেও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান চেষ্টা অব্যাহত ছিল । টাইমস অব লণ্ডনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২ রা অক্টোবর সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে যে অভ্যুত্থান হয় , এতে সশস্ত্র বাহিনীর ৮০০ এর বেশি সদস্য দোষী সাব্যস্ত হন, তাদের মধ্যে ৬০০ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় । ১৯৮১ সালে ৩০ শে মে সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন । জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি অধিক আনুকূল্য , সেনাবাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাশূণ্য করার পরিকল্পনা ।
১৯৮২ সালে ২৪ শে মার্চ জেনারেল এরশাদ বেসামরিক সাত্তার সরকারকে উৎখাত করে দেশে আবার পূর্ণ সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন । জনগণের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ , সন্ত্রাস , দূর্নীতি , বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার ও বোমা হামলা , বিচারবিভাগকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার — এসব ঘটনা এরশাদের শাসনামলে দেশী ও বিদেশী প্রচারমাধ্যম।
এসব ঘটনা এরশাদের শাসনামলে দেশী ও বিদেশী প্রচারমাধ্যমের নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছিল । জাতীয় সংসদের সবচেয়ে বিতর্কিত সংশোধনী পাশ হয় ১৯৮৮ সালে , ইসলামকে রাষ্টধর্ম করা । সর্বস্তরে দূনীতি ও অপশাসনে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে ।
১৯৯০ সালে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট ও বি এন পি’ র নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোটের যুগপৎ আন্দোলনে এরশাদের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে । এইসময় সেনাবাহিনীও এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে । ৫ ই
ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন । অন্তর্বর্তী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন ।
১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আবার সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় । ক্ষমতার পালাবদলে কখনো বি এন পি ও কখনো আওয়ামী লীগ দেশের দন্ডমুণ্ডের কর্তা । কিন্তু যে আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ; দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে তার ছোঁয়া লাগে নি । বরং দুঃশাসন , সন্ত্রাস , দূর্নীতি , প্রশাসনের সার্বিক দলীয়করণে বর্তমান অবস্থা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন । সাম্প্রতিক সময়ে ভোটারবিহীন নির্বাচন জনগণের অধিকারকে নস্যাৎ করে দিয়েছে ।
মানুষ অপেক্ষা করছে ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের, যে পরিবর্তন অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে । একাত্তরে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল , তা আজ সুদূরপরাহত । শাসকশ্রেণীর সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব চলছে , সেই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে দুপক্ষের মধ্যে । বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব সংকটটাই প্রধান । নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সঙ্গে জনগণের ঐক্যের ভেতর থেকে । সেই ঐক্য অবশ্যই হতে হবে সাংগঠনিক । লক্ষ্য থাকবে গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র
গড়ে তোলা । যার জন্য প্রয়োজন অধিকার ও সুযোগের সমতা , ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসন।
কৃতজ্ঞতা —
আবুল হোসেনের আত্মজীবনী
সৈয়দ আবুল মকসুদ – স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী – স্বাধীনতার স্পৃহা ও সাম্যের ভয় , তিন বাঙালির নেতৃত্ব।
মতিয়ুর রহমান – বাংলাদেশের সেনাশাসন ; রাজনীতিতে অশুভ সূচনা।
লেখক: ফাতেমা জোহরা।

