দুই জোটের শাসন নিয়ে ইব্রাহিম খালেদ :
দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শাসনামলকে নির্বাচনের আগে নির্মোহভাবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলকে ‘জঙ্গিবাদের উত্থান ও খুনের’ আমল’ এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ১০ বছরের শাসনকালকে ‘ব্যাংক লুটের’ আমল আখ্যা দিয়ে বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত শাসনের সময় দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে। জঙ্গি হামলায় অনকে মানুষ মারা যায়।
আর ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আমলে হয়েছে ব্যাংক লুট। সাংবাদিকদের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। এরপর জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তারা ক্ষমতায় বসাবে। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাগো বাংলা ফাউন্ডেশন আয়োজিত নাগরিক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
জাগো বাংলার প্রধান নির্বাহী নাসির আহমেদের সভাপতিত্বে ‘আসন্ন নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মীজানুর রহমান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) একে মো. আলী সিকদার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হারুন অর রশিদ, এনডিসিআরসির চেয়ারম্যান খান এম হোসেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, কলামিস্ট সুভাষ সিংহ রায় এবং আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বিএনপি-জামায়াত একেবারে মানিকজোড়। তারা একে অন্যকে ছাড়তে পারে না। কারণ দুই দলেরই মুরব্বি এক। তিনি বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই দলই ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু আচরণে ভিন্নতা রয়েছে। পদ্মার জল পরিষ্কার, কিন্তু মেঘনার জল ঘোলা। এ দুই জল এক হতে পারে না। তেমনিভাবে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের আচরণ মিশে না।
তিনি বলেন, বিএনপি আমলে ৬৪ জেলায় বোমা হামলা হয়েছে। অবশ্যই সেখানে সরকারের মদদ ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন জেলায় বোমা হামলা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়েছে। এতে ২৪ জন নিহত হয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়াকে হত্যার চেষ্টা করা হয়নি। তবে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ব্যাংক লুট হয়েছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংক অন্যতম। বেসিক ব্যাংকে যিনি লুট করেছেন, তিনি আওয়ামী লীগের লোক নন। তিনি জাতীয় পার্টির (শেখ আবদুল হাই বাচ্চু)। কিন্তু প্রথম মেয়াদে যখন পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে, তখন তাকে সরানো যেত। না সরিয়ে দ্বিতীয়বার নিয়োগ দেয়া হল। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে সরানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। চিঠিতে গভর্নর বলেছেন, ব্যাংক কোম্পানির ক্ষমতাবলে ওই ব্যক্তিকে বেসিক ব্যাংক থেকে সরান। কিন্তু সেই চিঠিও আমলে নেয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে চেয়ারম্যান পদত্যাগ করে চলে যান। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলতে পারেন, চেয়ারম্যান তো চলে গেছেন। কিন্তু পদত্যাগ আর সরানো এক কথা নয়। এই না সরানোকে আমরা বলি একধরনের অপশাসন।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বেসিক ব্যাংকে লুট হওয়া টাকা সরকারের নয়। এটি জনগণের আমানতের টাকা। কেন আপনার (আওয়ামী লীগের) আমলে জনগণের টাকা এভাবে লুট হল। অর্থাৎ আর্থিক খাতে সুশাসনের পরিবর্তে অপশাসন হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের আমলে অনেক উন্নয়নও হয়েছে। সাংবাদিকদের বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। এরপর জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তারা ক্ষমতায় বসাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই ডেপুটি গভর্নর বলেন, সাংবাদিকদের আরেকটি বিশ্লেষণধর্মী কাজ করা উচিত। যেমন আওয়ামী লীগ বলে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তাদের ভোট দিতে হবে আর বিএনপি বলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাদের ভোট দিতে। বিএনপি যাই বলুক, দলটিকে ভোট দেয়ার মানে হল জঙ্গিবাদের শাসনে ফিরে যাওয়া। আর আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার মানে হল সুশাসনের ঘাটতি থাকবে।
ইব্রাহিম খালেদ বলেন, গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য হল নির্বাচন। কিন্তু শুধু একটি নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। প্রকৃত গণতন্ত্রের যে উন্নয়ন, সেখান থেকে আমরা অনেক পেছনে পড়ে আছি। ব্রিটিশ গণতন্ত্র এখনও আমরা চর্চা করতে পারিনি। কিন্তু ভারত পেরেছে। আর আমরা পারিনি বলেই গণতন্ত্রের পরিমার্জিত ব্যক্তি (রিফাইন ম্যান) তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, নিরপেক্ষতা নিয়ে কথা আসছে। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও নিরপেক্ষতা নেই। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াই একসময় বলেছিলেন শিশু আর পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। আবার বর্তমানে তিনি নিরপেক্ষতা চান। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে যেখানে কাজ করেন, সেখানে আপনি ন্যায়-নিষ্ঠতা ও পেশাদার কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। কিছু সাংবাদিক একটি ভালো খবরকেও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন। খারাপ সংবাদকেও তুলনামূলকভাবে ভালো করে উপস্থাপন করেন। এ কাজ করতে মেধা লাগে। এ কারণে বলতে হবে, সাংবাদিক মেধাবী। ড. মীজান বলেন, আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞা অনুসারে ভোটার ও জনগণ এক নয়। যারা সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে- এমন ঘোষণা বিশ্বাস করেন, তাদের ভোটাধিকার থাকা উচিত না। অন্য বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় রাখতে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

