Category: মুক্তমত

‘একুশ শতকে গ্রামের আলাপ: বিনোদন প্রসঙ্গ

২০০০ সালে আমাদের গ্রাম এবং আশপাশের অধিকাংশ গ্রামের বাড়িতেই সে সময়ে বিদ্যুৎ ছিল না। হাতেগোনা কিছু বাড়ি ছিলবিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভুক্ত। ওই বাড়িতে টেলিভিশন ছিল আর সাড়া গ্রামে সবমিলে আরো ২টি টেলিভিশন অন্য ২টি বাড়িকেঅলঙ্কৃত করতো। এ দুটি টিভি চলতো ব্যাটারির সাহায্যে, মাঝেমধ্যেই দেখতাম সাইকেলের পেছনটায় ব্যাটারি বেঁধে চার্জারেরদোকানে চার্জ দিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।   শুক্রবারে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হত পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। দিনটি যুবক-কিশোরদের জন্য ইদের দিনের মতোআনন্দের ছিল। যে বাড়িতে টিভি আছে, সে বাড়ি পরিণত হত লোকারণ্যে। বাদ জুম্মা টিভিতে পবিত্র কুরআান হতে তিলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক পাঠান্তে একটি দেশের গান হতো। তারপর ঘোষক হাসিমুখে উপস্থিত হয়ে বলতেন সুধী দর্শক, আজকে দেখবেনপূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি ‘ভণ্ড’ অথবা ‘আখেরি জামানা’; শ্রেষ্ঠাংশে রুবেল, পপি, মৌসুমী, মিজু আহম্মেদ, দিলদার ওঅন্যান্যরা। এই ঘোষণার সময় এবং গোটা সিনেমা জুড়ে তীব্র টানটান উত্তেজনা বিরাজ করতো। সিনেমার বিরতিতে বিজ্ঞাপনচলার সময় অতিরিক্ত চার্জ খরচ বাঁচানোর জন্য খুলে রাখতে হতো ব্যাটারির ক্লিপ। এ সুযোগে অনেকেই প্রাকৃতিক কাজ সেড়েআসতো। আবার শুরু হতো সিনেমার ডুসডুস, ফুঁসফুঁস, চরম উত্তেজনা।  মুহূর্তেই দর্শক হৃদয় হাস্যরস, করুণরস অথবাবীররসে হয়ে উঠত আপ্লুত। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যেই শুধু দর্শকগণ নায়কনায়িকার মিলনদৃশ্য দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো। এই হাফছেড়ে বাঁচাকেই বোধ হয় গ্রিক পণ্ডিত এরিস্টটল ‘ক্যাথারসিস’ বলেছিলেন।   সিনেমা ছাড়া গুলসানাবার, মুগলি ও অন্যান্য অনুষ্ঠান ব্যাটারি চালিত টিভির মালিকগণ খুব হিসেব করে দেখতেন, দীর্ঘমেয়াদীক্রিকেট খেলা দেখানোরতো প্রশ্নই উঠে না। কারণ চার্জ পোড়ানো যে মহা অন্যায়। আর ওইসব অনুষ্ঠানে সকলের প্রবেশাধিকারওছিল না। পরিবারের সদস্যবর্গ এবং বিশেষ প্রতিবেশী স্বজনেরাই ওসব অনুষ্ঠান  উপভোগ করার সাথেসাথে ভোগও করতেন।   মাঝেমধ্যে বাড়ির মালিক কিছু তরুণদেরকে গৃহস্থালি কাজ যেমন ধানের আঁটি আনা, শুপারি সহ অন্যান্য ফল পাড়ানো প্রভৃতিকাজ করার বিনিময়ে টিভি দেখার অনুমতি দিতেন। ওইসব তরুণরাও ‘কাজের বিনিময়ে টিভি দেখা’ প্রকল্পে সোল্লাসে সাড়া দিত।গ্রামের মাঝবয়সী ও মুরুব্বীগণ এহেন সিনেমা ( যাকে তারা ‘বই’ বলতেন) দেখাকে গর্হিত পাপকাজ বলে গণ্য করতেন।   ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্তও গ্রাম অঞ্চলে টিভি খুব বেশি মানুষের বিনোদন মাধ্যম ছিল না। বৃহত্তর পরিসরে এবংনানাঙ্গিকে মনকে রাঙিয়ে তুলতো রেডিও। রেডিও শোনার মাধ্যমেই সবার কাজে সঞ্চারিত হতো গতি। শৌখিন গৃহবধূগণরেডিওর গান শুনতেশুনতে তরকারি কুটতেন, মাটির চুলায় রান্না বসাতেন। অনেক শিক্ষার্থীদেরকেই বেতারের অনুষ্ঠান শুনতেশুনতে অঙ্ক করতে দেখেছি। আমার চাচা রেডিও শুনতে শুনতে ধান কাটতেন, খড় নাড়তেন, জমির আগাছা পরিষ্কার করা সহসকল কাজই করতেন। বিজ্ঞাপনগুলোও অনেকের শুনতেশুনতে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।   তরুণ সমাজে রেডিও সবচে বড় ভূমিকা রেখেছিল ক্রিকেট ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী শোনানোর মাধ্যমে। চৌধুরী জাফরুল্লাশারাফাত, খোদাবক্স মৃধা প্রমুখ ভাষ্যকারগণ তখন রীতিমত তারকা। ধারাভাষ্য শোনা ছাড়াও খবর, গানের ডালি, নাটক, নিশুথি অধিবেশন সহ নানা অনুষ্ঠানের পসরায় জমজমাট থাকতো রেডিও। রোজার দিনে সেহরি ইফতারের সময়সূচি জানারওপ্রধান অনুষঙ্গ ছিল রেডিও। সত্যিকার অর্থেই তখন বেতার ছিল গণমানুষের অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম।   গ্রামের কয়েকঘরে টেপ(গ্রামে ক্যাসেট বলে) বাজতে দেখেছি। তারা ক্যাসেটের ফিতা বাজিয়ে গান শুনতো। জেমস, বাচচু, মনিরখান, আসিফ, মমতাজ, আশরাফ উদাসের গান। অনেকেই শুনতেন ‘মনিরের ফাঁসি’ পালা এবং নানা ধরনের ওয়াজ।মাঝেমধ্যে ক্যাসেট চুরির গল্পও উৎসুক জনের মুখে শুনতাম।   গ্রামের বিয়েতে, মুসলমানির অনুষ্ঠানে, ধানকাটা শেষে অথবা নির্বাচনে জয়ের পর চাঁদা তুলে বা কারো সৌজন্যে ভিসিআরভাড়া করে আনা হতো। বাড়ির আঙিনা ভরে যেত তরুণযুবকের সমাগমে। রাতভর দিনভর চলতো ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, শালমান শাহ, রিয়াজ, অঞ্জু ঘোষ, মৌসুমী,  শাবনুর, পুর্ণিমা, পপিদের ছবি। মৌলভীগণ মাঝেমধ্যে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসতেন।তখন সাময়িকভাবে বন্ধ করে লুকিয়েছাপিয়ে রাখা হতো। ২০০৩ সালের পর গ্রামে ভিসিআরের পরিবর্তে কয়েকবছর সিডিপ্লেয়ারের আগমন নির্গমন দেখেছি।   ২০০৬ সাল পর্যন্ত জনপ্রিয় গানগুলো গ্রামের সবাই একযোগে শুনতো আইসক্রিম ওয়ালাদের মাধ্যমে অথবা কোনও উপলক্ষেমাইক ভাড়া করে আনার বদৌলতে। সাধারণত মমতাজ, আসিফ, মনির খান, শান্ত, বেবি নাজনীনের গান অথবা তরতাজাজনপ্রিয় সিনেমার গানগুলো আইসক্রিমওয়ালা সাগ্রহে বাজাতেন। হালখাতার মাইকেও এমনসব গান শুনতে শুনতেই গানগুলোমুখস্থ হয়ে যেত আগ্রহী সমোঝদারদের।   তরুণ যুবকগণ কোনও উপলক্ষ্যে, সে হতে পারে ঈদ, খেলা, নির্বাচন অথবা প্রেমিকার বিরহযাপনকে আরও লোকদ্যাখানোলোকশোনানো করে তোলার জন্য মাইক ভাড়া করে আনতো। রাতভর সে মাইকে গান বাজতো। ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ ‘ওপাষাণী বলে দাও কেন ভালো বাসোনি’ সহ কঠিন কঠিন সব গান! কখনোও প্রেমিক মাইকের মুখটা প্রেমিকার বাড়ির পানে রেখেএকের পর এক পরিবেশন করতো অতি আবেগীয় গানগুলো। হয়তো, প্রেমিকা বাসায় শুয়ে শুয়ে গর্ববোধ করতো প্রেমিকের গানশুনে।   ২০০৬-০৭ সালের পরের দিকে মাইকের বদলে ইয়াবড় সাউন্ডবক্সে একই কায়দায় দিনভর বাজতো কখনো মিলার’রুপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া’ অথবা ‘পাগলু ড্যান্স ড্যান্স’। গ্রামে, গানের বিটে আজো কাঁপতে থাকে প্রেমিকার বাড়ি সহ গোটাগ্রামই। এ কাঁপন মাঝেমধ্যে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু  মৌলভীগণেরই ছিল।   ২০০৬ সালের আগে গ্রামের কিশোরী, বালিকা ও গৃহবধুদের উল্লেখযোগ্য কোনও বিনোদন ছিলনা বললেই চল। বিটিভিরসিনেমা দেখার সময় কোনও মহিলাদের দেখতাম না। অল্প কয়েকজন শিশু কিশোরী দেখতাম মাঝেমধ্যে। গোল্লাছুট, চারগুটি, ধাপ্পি খেলানোর বয়স পার করার পর গ্রামের মেয়েরা যখন সিক্সসেভেনে উঠতো তখোনি বিয়ে হয়ে যেত কোনও রিক্শাওয়ালাঅথবা দিনমজুরের সাথে। তারপর গৃহপরিস্কার, রান্না, কান্না, বাচ্চা জন্মদান ও তাদের লালনপালনচক্রেই তারা সীমাবদ্ধ। কারোকারো রেডিও শোনাার সৌভাগ্য হতো। আর বাতাসের কল্যাণে যেসব গান ভেসে আসতো ওসবই তারা শুনতেন। না, কোথাওশখ করে বেড়ানো, টিভি দেখা, বই পড়ার মতো শখকে মিটাতে পারা খুব কম নারীর ভাগ্যেই ২০০৬ সালের আগে জুটেছে।   তবে তখন কিছু নারী হয়ত তাঁর স্বামীসহযোগে অথবা স্কুল ডিঙিয়ে কলেজ পড়ার দরুন প্রেমিকসহযোগে মাঝেমধ্যে হলে গিয়েসিনেমা দেখতে পারেন। এই সিনেমা দেখার ভাগ্যও ২০০০ সালের আগেই নারীগণের কপালেই বেশি জুটেছিল কারণ তারপরপরই  ‘মাথা নষ্ট’ ‘নয়া কসাই’ […]

Read more

শেখ হাসিনা এবং নারীর ক্ষমতায়ন- এডভোকেট আব্দুল হান্নান রঞ্জন

১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ মা-বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে […]

Read more

ওয়াজ-মাহফিল সংস্কৃতি প্রসঙ্গে কিছু কথা

ওয়াজ অর্থ উপদেশ, নসিহত, বক্তব্য। যিনি ওয়াজ করেন তাকে ওয়ায়েজ বা বক্তা বলে। ওয়াজ নসিহত বা উপদেশমানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এটি মানব সমাজের উন্নতি ও […]

Read more

তত্বাবধায়কেও আওয়ামী লীগই !

ছলেবলে কলে কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হলে তত্বাবধায়ক ছাড়া যে গত্যন্তর নাই এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে! আমেরিকা যেভাবে ঝাকিজাল নিয়ে নেমেছে তাতে চৌদ্দ’র মত […]

Read more

মেট্রোরেল চালু করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ এবং এখন যা যা করা জরুরী

সন্মানীয় প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে নব ২০২৩ বছরের শুভেচ্ছা এবং ঢাকা–মেট্রোরেল চালু করায় ধন্যবাদ। নিউমোলোজীমতে ২+০+২+৩=৭ সংখ্যার ২০২৩ সাল বাংলাদেশের জন্যে শুভ–পরিবর্তনের বছর। আগেও নজির রয়েছে। ৭ […]

Read more

পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং মহান বিজয় দিবসের সুবর্ণ জয়ন্তী প্রায় একই সময়ে পালনের সুযোগ পাওয়াটাও বাঙালি জাতির জন্য গর্বের। কারণ পাকিস্তানি বর্বরতার […]

Read more

বিএনপির রূপরেখায় রাষ্ট্র ‘মেরামতের’ নির্দেশনা কতটা পাওয়া গেল

বিএনপি রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের জন্য একটি রূপরেখা ঘোষণা করেছে। দু-একটি বিষয় বাদ দিলে খুব বেশি নতুন কিছু নেই এতে। মূলত জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ও […]

Read more

নিউইয়র্কে ঢাবির শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

‘মাছের পচন ধরে মাথা থেকে’। নিউইয়র্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে বক্তাদের অসামানঞ্জস্য বক্তব্য শুনে তাই মনে হয়েছিলো। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রবাসে কোন […]

Read more

পরের টেকনিক কি !

এখন চলছে পোস্ট মর্টেম। কে হারলো কে জিতলো, কার লাভ কার লস  হলো! রাজনীতি যতটুকু বুঝি বা আন্দোলন সংগ্রাম যতটুকু দেখেছি, এটা বলার অপেক্ষা রাখে […]

Read more

আওয়ামী লীগ-বিএনপি দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে না: মুজিবুল হক চুন্নু

রাজবাড়ীতে জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলনে কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, দেশের মানুষের কথা আওয়ামী লীগ-বিএনপি কখনই চিন্তা করে না, […]

Read more