‘মাছের পচন ধরে মাথা থেকে’। নিউইয়র্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে বক্তাদের অসামানঞ্জস্য বক্তব্য শুনে তাই মনে হয়েছিলো। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রবাসে কোন রাজনৈতিক দলের সভায় যাই না। কারণ তাদের অন্ধ ও অনুকরণীয় বক্তব্য বর্তমানের সাথে খুবই বেমানান মনে হয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছিলো সেদিন কোন একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলনে এসেছি। আমার মতো অনেক লোক বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়ার টানে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সে কারণে আমারও উপস্থিতি ছিলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ’র পক্ষ থেকে গত ২৬ নভেম্বর ২০২২ লাগোর্ডিয়া প্লাজা হোটেলের বর্ণিল আয়োজন ছিলো একখন্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিরাট বাজেট (৬০/৭০ হাজার ডলার) নিয়ে অপরাজেয় বাংলা, গ্রন্থাগার, মধুর ক্যান্টিন, ম্যাগাজিনসহ মঞ্চের দুইপাশে এলইডি প্রজেক্টরের মাধ্যমে কার্জন হল, সলিমুল্লাহ হল, সারি সারি জামরুল, কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন দৃষ্টি নন্দন বৃক্ষরাজীর মোহনীয় পরিবেশ। ৫২ থেকে ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের কথাগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণকে অবিকল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যপটে উপস্থাপন করার চেষ্টার আন্তরিকতার কোন ঘাটতি ছিলো না। সেজন্য আয়োজকরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
শতবর্ষের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্জেলর অধ্যাপক ড. আকতারুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এম এ মুহিত এবং নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল ড. মনিরুল ইসলাম এবং কী নোট স্পীকার ছিলেন এমিরাটস অধ্যাপক ড. মোস্তফা সরোয়ারসহ সাবেক শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের চমৎকার আয়োজনে কী নোট স্পীকারের বক্তব্য ছাড়া কোন অতিথি বক্তাদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালী যেমন ১৯২০/২১ সালের প্রথম দিকে যখন ঢাকায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়, তখন হিন্দু প্রভাবশালী জমিদারদের পক্ষ থেকে প্রবল বিরোধীতার সম্মুখিন হয়। তাদের বিরোধীতা সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, নবাব আব্দুল লতিফ, স্যার সলিমুল্লাহ (তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল আছে)। বিশেষ করে ঢাকার নবাব পরিবারের অবদান ছিলো অতুলনীয়। তাঁদের সাহসিকতা ও দানকৃত ৬৫০ একর ভূমির ওপর ১৯২১ সালের ২১ জুলাই মাত্র ১২টি বিভাগ, ৩টি ফ্যাকাল্টি, ৩টি আবাসিক হল, ৬০জন শিক্ষক এবং ৮৭৭জন ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী ছিলেন লীলা নাগ ও নবাব ফজিলাতুননেছা। আজ শতবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বিরাট মহিরূহে পরিণত। ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ফ্যাকাল্টি, ১৯টি আবাসিক হল, ৪টি হোস্টেল, ২ হাজারের বেশি শিক্ষক এবং ৪৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য বুরো, গবেষণা কেন্দ্র, ইন্সটিটিউট এবং এফিলিয়েটেড কলেজ।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকেই বিশ্বখ্যাত অধ্যাপক এবং পৃথিবীজোড়া সোনার মেধাবী শিক্ষার্থীদের সমারোহে ধন্য। যেমন- সত্যেন্দ্রনাথ বসু, নবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস, শিকাগো শহরের উইলিস টাওয়ারের নকশা প্রনয়নকারী বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান, ভারত বর্ষের শ্রেষ্ট ইতিহাসবীদ আর সি মজুমদার, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ট আধুনিক কবি জীবনান্দ দাস, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বিজ্ঞানী আতাউল করীমসহ শত-সহস্রাধিক বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন ছাত্র-শিক্ষক যাদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। দেশে-বিদেশে যেখানেই এলামনাই আছেন, স্বীয় মেধা-মনন ও রুচি-সংস্কৃতিতে ভাস্বর। বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে শহীদুল্লাহ কায়সার, জে সি দেব, মুনির চৌধুরীসহ বিশ্ববদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবি এবং শিক্ষার্থীদের আল বদর বাহিনী দ্বারা হত্যা একাত্তুরের ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ইত্যাদি বহু ঐতিহাসিক স্পর্শকাতর বিষয়কে আমন্ত্রিত অতিথিরা এড়িয়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই ও সচেতন প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। উপরোন্ত প্রধান অতিথি বিভিন্ন বিতর্কিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দেশের মেধাবীরা বিদেশ চলে আসায় অনেক ক্ষতি হয়েছে (তাঁর ভাষায় ব্রেইন ড্রেইন)। তিনি কি জানেন, ‘ব্রেইন ড্রেইন, ইজ দ্যা বেটার দ্যান, ব্রেইন ইন দ্যা ড্রেন’। দেশ থেকে এই মেধাবীরা বেরিয়ে আসার কারণে সারা পৃথিবীর মেধাবীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে বহির্বিশ্বে আমাদের মুখ উজ্জল করেছে। কারণ, আমাদের দেশের মেধার কোন মূল্য নেই। সবকিছুই দলীয় ও বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদকারী এবং অসৎ লোকদের দৌরাত্বে আজ মেধাবীরা কোনঠাসা অথবা বিদেশ পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। তারা বিদেশে এসে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদ-ের ভীত মজবুত করে। আর দেশের দুর্নীতিবাজ, লুটেরাগোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে দেশের মেরুদ- ভেঙ্গে ফেলছে। তথাকথিত শিক্ষিকদের কতটুকু নৈতিক স্খলন হলে একজন সচিব জাল মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে সুবিধা ভোগের পর ধরা পড়ে চাকুরীচ্যুত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের প্রথমেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে জাতির পিতার অবদানের কথা বলেই একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে চলে আসেন এবং একজন নেত্রীও নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন সেই কথাও তুলে ধরেন। তাঁর আর কিছু মনে হয় জানা ছিলো না। যা নিছক ইতিহাস বিকৃতি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০, ৭১-এ স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ ধরে ৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে ছাত্র সমাজই প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দিলে সেলিম, দেলোয়ার, জয়নাল, রাউফুল বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজ, ডা. মিলনসহ অংসখ্য সাথীদের রক্তের বিনিময়ে ৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন হয়েছিলো।
জাতির শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিনির্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পৃথিবীর এমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে আত্মত্যাগী ছাত্রদের অবদান রয়েছে, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতার সংগ্রাম, স্বৈচারের পতন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠাসহ দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে বুকের রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সম্মানকে দুর্নীতি ও দলীকরণের জন্য অযোগ্যরা বড় বড় চেয়ার দখল করার কারণে সেই সম্মান ম্লান হয়ে যাচ্ছে। যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তমনা ও গণতন্ত্রের তীর্থ ভূমি। কিন্তু আজ ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন নেই। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি করার অধিকার নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে চ্যান্সেলরের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের শুনতে হয় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বঙ্গভবনে না আসার স্থুল হাসির গল্প। জ্ঞান ও শিক্ষার মাপ কাঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান আশানুরূপ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পুঁথিগতভাবে উত্তীর্ণ হয়ে সনদ নেয়ার কারখানা নয়। এখান থেকে বের হবে জ্ঞানের সৃজনশীলতা, বিকশিত মানব সম্পদ, সৎ ও চরিত্রবান মানবিক মানুষ। এগুলো যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের রাজনৈতিক চরিত্রগুলোর প্রতিচ্ছবি। পাশাপাশি এই বিশাল অবয়বের বিশ্ববিদ্যলয়ে শিক্ষক ও গবেষকদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, জার্নাল বিশ্বমানের গবেষণাপত্রে কয়টি ছাপা হয়েছে? উত্তর অতিব নগন্য, ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রার্চ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং-এ স্থান ৯৭৭। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২৬৩। এই র্যাংকিং দেখতে পাবেন ইউএস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ওয়েব সাইটে।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললে, মাননীয় ভিসি সাহেব উত্তরে বলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, গবেষণাধর্মী নয়। কিন্তু এটা তো তিনি ১০০ বছর আগের উত্তর দিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ব্যাখ্যাটা খুবই বেমানান, কেউ সহজভাবে নিয়েছেন বলে আমার মনে হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো গবেষণার কেন্দ্র। জ্ঞান-বিজ্ঞান, মানবিকতায় বর্তমান আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হবে। তাই আসুন শতবর্ষ পূর্বে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার পি. জে. হার্টগ, প্রফেসর জি. এইচ. ল্যাঙলি, স্যার এ. এফ. রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরুর পর স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, বোস অধ্যাপক আব্দুল মতিন, প্রফেসর ফজলুল হালিম চৌধুরী, প্রফেসর আব্দুল মান্নানসহ অসংখ্য গুণী পন্ডিত জ্ঞানী ব্যক্তিদের মেধায় বিকশিত এই বিশ্ববিদ্যালয়কে দলমতের উর্ধ্বে থেকে সমস্ত আগাছার জঞ্জাল পরিষ্কার করে, নৈর্ব্যাত্তিকভাবে চোখের মনির মতো লালন করে, বিশ্বমানের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে আগামী প্রজন্মের জন্য গড়ে তুলে, লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ বিনির্মানে এগিয়ে নিয়ে যাই।
শাহাব উদ্দীন

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও নিউইয়র্ক প্রবাসী।

