ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গৃহবন্দি প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা। ডিজিটাল ব্যাংক উয়েনোর পতন ঘিরে রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকটের জেরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

একই সঙ্গে তাকে গৃহবন্দি করার নির্দেশও দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এদিকে একই দিনেই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ।

প্রসঙ্গত, ব্যাংক উয়েনোর সঙ্গে পেনার অতীত সম্পর্ক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে দেশটিতে এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সিনেটের সর্বসম্মত ভোটে অভিশংসিত হন পেনা। এরপরই তার স্থলাভিষিক্ত হন আলিয়ানা।

তবে গত বৃহস্পতিবার পেনা পদত্যাগের প্রস্তাব দিলে সিনেট তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উয়েনোর আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলোই পেনার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিল।

পেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, দেশটির দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়া ডিজিটাল ব্যাংক উয়েনোর সঙ্গে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের সঙ্গে পেনার নামও জড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, ব্যাংকটি প্যারাগুয়ের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবা দিত।

রাজধানী আসুনসিওনে পেনার বাসভবনের বাইরে শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কৌঁসুলিরা।

তারা জানান, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ যুক্ত হতে পারে।

আজ শনিবার সকালে তাকে কৌঁসুলির কার্যালয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।

এদিকে পেনাকে গৃহবন্দি করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাসভবনের বাইরে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়িটির চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করে পুলিশ।

মূলত ব্যাংক উয়েনোর পতন থেকে তার রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান উয়েনোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করলে সংকটের সূত্রপাত হয়। ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছিলো। আগে যাদের কোনো ব্যাংক হিসাব ছিল না, এমন অনেক মানুষও প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক হয়েছিলেন।

তবে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ পদ্ধতি এবং দেশটির রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন উঠছিলো। পেনা গত বছর পর্যন্ত উয়েনোর মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠানের একজন শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। অপরদিকে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্লোস কারভালো ২০২৩ সাল পর্যন্ত উয়েনোর নেতৃত্বে ছিলেন।

শুক্রবার কারভালোর বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন কৌঁসুলিরা। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ব্যাংকটির পতন ঠেকাতে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে কর্তৃপক্ষ যখন শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছিলো, তখনই তার বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

এছাড়া উয়েনোর আট সাবেক নির্বাহীকেও এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। পেনার ঘনিষ্ঠ মহলের আরও কয়েকজনও পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ ও দুই উপদেষ্টা।

পেনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়। যেমন, অভিশংসনের প্রস্তাবে পেনার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, পেনশন তহবিলের অর্থ সরিয়ে নেওয়া ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম আড়াল করার অভিযোগ আনা হয়।

তবে কোনো ধরনের অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করে পেনা দাবি করেন, বিষয়টি মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকিসংক্রান্ত সমস্যা। অপরদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.