আইরিন পারভিন খান : বীজব্যাংকের গবেষণা থেকে বাংলাদেশের রান্নাঘর পর্যন্ত এক প্রাচীন শস্যের দীর্ঘ যাত্রা
পৃথিবীর পরিচিত কৃষিব্যবস্থা কোনো বড় বিপর্যয়ে ভেঙে পড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোন শস্যের বীজ সবচেয়ে কাজে আসতে পারে, এমন প্রশ্ন শুনলে মুগ ডালের নাম হয়তো সবার আগে মনে পড়বে না। অথচ অস্ট্রেলিয়ান গ্রেইনস জিনব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, পরীক্ষিত ছয়টি উষ্ণমণ্ডলীয় ফসলের মধ্যে মুগবীজ হিমায়িত সংরক্ষণে অঙ্কুরোদ্গমক্ষমতা সবচেয়ে ধীরে হারিয়েছে। এই ফল থেকেই মহাপ্রলয়ের খাদ্যতালিকায় মুগের জায়গা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে এখানে মহাপ্রলয় কথাটি একটি রূপক। গবেষণাটি দুর্যোগের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বীজ নিয়ে নয়, নিয়ন্ত্রিত বীজব্যাংকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষিত নমুনা নিয়ে।
আরেকটি শব্দগত বিভ্রান্তিও শুরুতেই দূর করা দরকার। ইতালীয় সংবাদে ব্যবহৃত fagioli verdi কথাটি সাধারণ সবুজ শিম বোঝাতে পারে, কিন্তু গবেষণার প্রজাতিটি হলো Vigna radiata, বাংলায় মুগ এবং ইংরেজিতে mung bean বা green gram। আমরা যে আস্ত সবুজ মুগ, খোসাসহ ভাঙা মুগ কিংবা খোসা ছাড়ানো হলুদ মুগ ডাল খাই, সেগুলো একই শস্যের ভিন্ন প্রক্রিয়াজাত রূপ।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষণায় যা পাওয়া গেছে :
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ান গ্রেইনস জিনব্যাংক, এগ্রিকালচার ভিক্টোরিয়া এবং লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা। ক্যাথরিন জে বাউম, স্যালি এল নর্টন, গ্যাব্রিয়েল কিবল গাগনের এবং ম্যাথিউ হেইডেনের গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের Plant Genetic Resources সাময়িকীতে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা জিনব্যাংকে প্রায় ৪০ বছর ধরে জমা হওয়া অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করেছেন।
তাঁরা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলকে তুলনা করেন। এগুলো হলো মুগ, জোয়ার, সয়াবিন, সাধারণ শিম, অড়হর বা পিজন পি এবং আজুকি বিন। বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত বীজের নমুনাগুলো অন্তত ২০ বছর সংরক্ষিত ছিল। ২০২৪ সালে গবেষকেরা আরও ৩ হাজার ৮৬১টি অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা করেন। সব মিলিয়ে তথ্যভান্ডারে ছিল ২৪ হাজার ১৪১টি পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি পরীক্ষায় বীজের শিকড় অন্তত দুই মিলিমিটার বের হলে সেটিকে অঙ্কুরিত হিসেবে গণনা করা হয়।
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে মুগের জন্য ৬৩ দশমিক ৫ বছরের একটি longevity estimate পাওয়া যায়। একই সূচকে জোয়ারের মান ৪৯ দশমিক ৬ বছর, সয়াবিনের ৪৮ দশমিক ৮ বছর, সাধারণ শিমের ৩৩ দশমিক ২ বছর, অড়হরের ৩০ দশমিক ৭ বছর এবং আজুকি বিনের ১৭ দশমিক ৪ বছর। পরীক্ষিত ফসলগুলোর মধ্যে মুগের অঙ্কুরোদ্গমক্ষমতা কমার হার ছিল সবচেয়ে ধীর।
৬৩ দশমিক ৫ বছর কথাটির সঠিক অর্থ :
৬৩ দশমিক ৫ বছরকে মুগবীজের নিশ্চিত মেয়াদ বা গড় আয়ু বলা ঠিক হবে না। গবেষকেরা sigma নামের একটি পরিসংখ্যানগত সূচক ব্যবহার করেছেন। এটি অঙ্কুরোদ্গমক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমতে কত সময় লাগে তার হিসাব। একটি বীজ ৬৩ দশমিক ৫ বছর পর হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাবে কিংবা সব মুগবীজ এত বছর টিকবে, গবেষণাটি এমন দাবি করে না। বীজের প্রাথমিক মান, সংগ্রহের সময়, শুকানোর পদ্ধতি, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং সংরক্ষণের পরিবেশ ফল বদলে দিতে পারে।
তবে গবেষণায় একটি খুব সহজে বোঝা যায় এমন ফলও আছে। ২০২৪ সালের পরীক্ষায় কিছু মুগবীজ ৪৫ দশমিক ৫ বছর সংরক্ষণের পরও অন্তত ৯০ শতাংশ অঙ্কুরোদ্গমক্ষমতা ধরে রেখেছিল। জোয়ারের ক্ষেত্রেও ৪৪ বছরের বেশি সময় পর এমন উচ্চ অঙ্কুরোদ্গম দেখা গেছে। মুগের সব নমুনা একই ফল দেয়নি, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সক্ষমতা ধরে রাখা নমুনার উপস্থিতি বীজব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বীজব্যাংকের প্রয়োজন কেন :
বীজব্যাংককে শুধু বীজের গুদাম ভাবলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেখানে বিভিন্ন জাত, স্থানীয় জাত এবং বুনো আত্মীয় উদ্ভিদের বীজ নির্দিষ্ট আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় রাখা হয়। রোগ, লবণাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা নতুন জলবায়ু পরিস্থিতি সহ্য করতে পারে এমন ফসল উদ্ভাবনের সময় উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা এই জিনগত বৈচিত্র্য ব্যবহার করেন। কোনো জাত মাঠ থেকে হারিয়ে গেলেও তার সংরক্ষিত বীজ ভবিষ্যতের গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।
বীজের অঙ্কুরোদ্গম নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি। পরীক্ষা খুব ঘন ঘন করলে সীমিত বীজের মজুত কমে যায় এবং ব্যয় বাড়ে। আবার দীর্ঘ বিরতিতে পরীক্ষা করলে বীজের সক্ষমতা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার আগেই নতুন করে গাছ উৎপাদন ও বীজ সংগ্রহের সুযোগ হারাতে পারে। নতুন গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি প্রজাতির জন্য বাস্তব তথ্যভিত্তিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা।
ভারতীয় উপমহাদেশে মুগের প্রাচীন ইতিহাস :
মুগের বৈজ্ঞানিক নাম Vigna radiata। প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যা ও আধুনিক জিনগত গবেষণা দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বর্তমান ভারতের ভূখণ্ডকে এর গৃহপালনের প্রধান অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২৩ সালে eLife সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এক হাজারের বেশি মুগের নমুনার জিনগত তথ্য, জলবায়ু মডেল এবং প্রাচীন নথি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। সেই গবেষণা অনুযায়ী মানুষ ভারতে বুনো আত্মীয় উদ্ভিদ থেকে চার হাজার বছরেরও আগে মুগ চাষ শুরু করেছিল।
প্রাচীন কৃষকেরা এমন গাছের বীজ বেছে নিয়েছিলেন যেগুলো সহজে সংগ্রহ করা যায়, দানা ভালো হয় এবং শুঁটি পেকে গেলেই সব বীজ ছড়িয়ে পড়ে না। বহু প্রজন্মের নির্বাচনের ফলে বুনো মুগ থেকে চাষযোগ্য মুগের বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে মহারাষ্ট্র ও হরপ্পা সভ্যতার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার মতো একাধিক অঞ্চলে প্রাচীন মুগচাষের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর অর্থ এই নয় যে আজকের রাষ্ট্রসীমা অনুযায়ী কোনো এক দেশের রান্নাই মুগের একমাত্র উত্তরাধিকারী। মুগের ইতিহাস আধুনিক সীমান্তের চেয়ে পুরোনো এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার যৌথ কৃষি ইতিহাসের অংশ।
বাংলাদেশের কৃষিতে মুগ :
বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু ও খাদ্যাভ্যাসে মুগের দীর্ঘ উপস্থিতি রয়েছে। দেশের বহু অঞ্চলে এটি স্বল্পমেয়াদি ডাল ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে মুগ গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলও। ২০১০ ও ২০১১ সালে বরিশাল, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীতে পরিচালিত একটি গবেষণায় উন্নত বারি মুগ জাতের ব্যবহার, কৃষিপদ্ধতি এবং চাষের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণাটি দেখায় যে কৃষকেরা উন্নত জাত গ্রহণ করলেও মানসম্মত বীজ, শ্রম, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক কৃষি পরামর্শের প্রাপ্যতা উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট মুগের উন্নত জাত ও উৎপাদনপদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছে। বারি মুগ ৬ নিয়ে দক্ষিণ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণাও হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শুধু উন্নত জাতের নাম বা বীজ দিলেই প্রত্যাশিত ফল নিশ্চিত হয় না। জমির পরিমাণ অনুযায়ী সঠিক বীজের হার এবং ব্যবহারবিধি কৃষকের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছানো জরুরি। অর্থাৎ ভালো জাতের সঙ্গে কার্যকর কৃষি সম্প্রসারণসেবাও প্রয়োজন।
মুগ ডালজাতীয় উদ্ভিদ। উপযুক্ত রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার সহায়তায় এর শিকড় বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন মাটিতে স্থির করতে পারে। সঠিক ফসলচক্রে এই বৈশিষ্ট্য মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে। তুলনামূলক কম সময়ে ফসল তোলা যায় বলে প্রধান ফসলের মধ্যবর্তী সময়েও মুগ চাষের সুযোগ তৈরি হয়। তবে অঞ্চল, জাত, পানি, রোগবালাই ও বাজারের অবস্থা বিবেচনা না করে এক পদ্ধতি সব কৃষকের জন্য সমান ফল দেবে না।
বাংলাদেশের রান্নাঘরে মুগের নিজস্ব ভাষা :
বাংলাদেশে মুগ শুধু পুষ্টির উৎস নয়, পরিচিত স্বাদ ও ঘ্রাণের অংশ। শুকনা কড়াইয়ে মুগ ডাল হালকা ভেজে নেওয়া বাংলাদেশের রান্নার একটি বিশেষ কৌশল। ভাজার পর ডালে বাদামের মতো গন্ধ তৈরি হয়। এরপর সেটি পাতলা ডাল, ঘন ডাল অথবা সবজির সঙ্গে রান্না করা যায়। লাউ দিয়ে মুগ ডাল, কাঁচা পেঁপে বা মৌসুমি সবজি দিয়ে মুগ, নারকেল দিয়ে মুগ এবং সাধারণ ভাজা মুগের ডাল দেশের নানা পরিবারের পরিচিত পদ। অঞ্চল ও পরিবারভেদে মসলা ও রান্নার ধরন বদলে যায়।
রুই বা কাতলা মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল বাঙালি রান্নার বিশেষ পরিচিতি বহন করে। মাছের মাথা ভেজে ডালের সঙ্গে রান্না করলে মুগের ঘ্রাণ ও মাছের স্বাদ একসঙ্গে মিশে যায়। আবার বর্ষার দিনের খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি কিংবা পারিবারিক আয়োজনে মুগ ডালের ব্যবহার আমাদের খাদ্যস্মৃতির অংশ। চাল ও ডালের মিশ্রণে তৈরি খিচুড়ি কখনো সাধারণ ঘরোয়া খাবার, কখনো উৎসব বা বৃষ্টির দিনের বিশেষ আয়োজন।
বাজারে মুগ সাধারণত তিনভাবে পাওয়া যায়। আস্ত সবুজ মুগকে অনেকেই মুগবিন বলেন। খোসাসহ দুই ভাগে ভাঙা দানাকে খোসাসহ মুগ ডাল বলা হয়। আর খোসা ছাড়ানো ভাঙা দানাই পরিচিত হলুদ মুগ ডাল। আস্ত মুগ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা যায়, খোসাসহ ডালে আঁশ ও আলাদা গঠন থাকে এবং হলুদ মুগ দ্রুত সিদ্ধ হয়ে দৈনন্দিন রান্নায় সুবিধা দেয়।
ভারতের নানা অঞ্চলে মুগের ব্যবহার:
ভারতে মুগের নাম অঞ্চল ও ভাষাভেদে মুগ, মুঙ্গ, মূং বা পেসারা। উত্তর ভারতে মুগ ডাল ও খিচড়ি বহুল পরিচিত। ভেজানো বা বাটা মুগ দিয়ে চিলা তৈরি হয়। অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় আস্ত বা বাটা সবুজ মুগের প্যানকেক ধরনের পেসারাট্টু জনপ্রিয়। মুগ দিয়ে পাকোড়া, কচুরি, হালুয়া এবং নানা মিষ্টিও তৈরি হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে চাল ও মুগের সংমিশ্রণ সহজ রান্না, ধর্মীয় খাদ্য, অসুস্থতার সময়ের খাবার কিংবা উৎসবের পদ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
চীনে মুগের আগমন ও ব্যবহার :
জিনগত গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়া থেকে মুগ প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, এরপর পূর্ব এশিয়া এবং পরে মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। মুগ সরাসরি দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়ায় যায়নি বলে গবেষকেরা মনে করেন। পানি ও জলবায়ুর পার্থক্য, চাষের মৌসুম এবং স্থানীয় কৃষকের নির্বাচন এর বিস্তারের পথকে প্রভাবিত করেছে।
চীনা লিখিত নথিতে মুগের প্রাচীনতম পরিচিত উল্লেখ পাওয়া যায় ৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দের কৃষিবিষয়ক গ্রন্থ Qimin Yaoshu-তে। চীনে মুগ lǜdòu নামে পরিচিত। মুগবিন স্প্রাউট, মুগের স্টার্চ দিয়ে তৈরি স্বচ্ছ নুডলস, ঠান্ডা বা মিষ্টি মুগের স্যুপ এবং বিভিন্ন পেস্ট ও মিষ্টান্নে এর ব্যবহার রয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রান্নায় মুগের অঙ্কুর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, আর দক্ষিণ এশিয়ায় শুকনা দানা ও ডাল হিসেবে ব্যবহার বেশি দৃশ্যমান। একই শস্য ভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন খাদ্যরূপ তৈরি করেছে।
পুষ্টি ও রান্নার বহুমুখিতা :
মুগে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও শর্করার পাশাপাশি ফোলেট ও আয়রনের মতো পুষ্টি উপাদান থাকে। তবে একটি খাবারের পুষ্টিমান নির্ভর করে দানার ধরন, পরিমাণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রান্নার পদ্ধতির ওপর। মুগ কোনো একক রোগের চিকিৎসা নয়, আর শুধু একটি ডাল দিয়ে সুষম খাদ্যের সব প্রয়োজন পূরণ হয় না। শস্য, সবজি, প্রোটিন ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
মুগের বড় সুবিধা তার বহুমুখিতা। দানা শুকনা অবস্থায় দীর্ঘদিন রাখা যায়, ভেঙে ডাল বানানো যায়, গুঁড়া করা যায়, ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা যায় এবং চাল, সবজি, মাছ বা মাংসের সঙ্গে রান্না করা যায়। এই ব্যবহারিক বৈচিত্র্যই সম্ভবত হাজার হাজার বছর ধরে এশিয়ার বিভিন্ন খাদ্যসংস্কৃতিতে মুগের অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
মহাপ্রলয়ের গল্পে বিজ্ঞানের সতর্কতা :
গবেষণার ফল আকর্ষণীয় হলেও বাড়ির আলমারি বা সাধারণ ফ্রিজে রাখা মুগবীজ একইভাবে ৪৫ বা ৬৩ বছর জীবিত থাকবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। জিনব্যাংকে বীজ নির্দিষ্ট মাত্রায় শুকিয়ে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হয়েছিল। ঘরের তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, পোকামাকড় ও বারবার তাপমাত্রা পরিবর্তনের মধ্যে ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব বীজের আচরণ এক নয়। একই প্রজাতির বিভিন্ন জাত এবং একই জাতের ভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করা বীজের মধ্যেও পার্থক্য ছিল। গবেষণাটি তাই কোনো অলৌকিক অমর বীজের গল্প নয়। এটি বাস্তব তথ্য ব্যবহার করে বীজব্যাংকের নমুনা কখন পরীক্ষা করতে হবে এবং কখন নতুন করে বীজ উৎপাদন করতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত উন্নত করার গবেষণা।
বাংলাদেশের জন্য গবেষণাটির তাৎপর্য :
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং কৃষিজমির ওপর চাপের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় জাত, কৃষকের সংরক্ষিত বীজ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উন্নত জাতের জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি। ভবিষ্যতে কোনো পুরোনো জাতের রোগসহনশীলতা, দ্রুত বেড়ে ওঠার ক্ষমতা অথবা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার বৈশিষ্ট্য নতুন জাত তৈরিতে প্রয়োজন হতে পারে।
এ জন্য বীজ সংরক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা, সঠিক নথি রাখা এবং সময়মতো বীজ নবায়ন প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাটি বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট জাতের সংরক্ষণকাল নির্ধারণ করেনি। তবে এটি দেখিয়েছে, বাস্তব পরীক্ষার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ব্যবহার করে প্রতিটি ফসলের জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণসূচি বানানো সম্ভব। বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বীজসংরক্ষণ কর্মসূচির জন্য এই পদ্ধতিগত শিক্ষা মূল্যবান।
একটি ছোট দানার দীর্ঘ ভবিষ্যৎ :
চার হাজার বছরেরও আগে দক্ষিণ এশিয়ায় চাষ শুরু হওয়া মুগ মানুষের হাত ধরে বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং আরও দূরের অঞ্চলে পৌঁছেছে। কোথাও এটি ভাজা ডাল, কোথাও মাছের মাথার সঙ্গী, কোথাও খিচুড়ি, কোথাও পেসারাট্টু, আবার কোথাও স্প্রাউট বা স্বচ্ছ নুডলস। অস্ট্রেলিয়ার বীজব্যাংকে সেই প্রাচীন শস্যের বীজ কয়েক দশক পরও অঙ্কুরিত হওয়ার শক্তি দেখিয়েছে।
মুগের এই দীর্ঘায়ু আমাদের একটি বাস্তব কথা মনে করিয়ে দেয়। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু আজ কত ফসল ফলল তার হিসাব নয়। ভবিষ্যতের জন্য কত বৈচিত্র্যময় ও জীবিত বীজ আমরা সংরক্ষণ করতে পারলাম, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রান্নাঘরের পরিচিত মুগ তাই একদিকে দৈনন্দিন খাবার, অন্যদিকে কৃষি ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থার মূল্যবান জিনগত সম্পদ।
তথ্যসূত্র :
1 Baum, Katherine J.; Norton, Sally L.; Keeble-Gagnère, Gabriel; Hayden, Matthew. Safeguarding seed longevity under genebank storage. Plant Genetic Resources. Cambridge University Press, ২০২৬। https://doi.org/10.1017/S1479262125100488
2 Ong, Pei-Wen প্রমুখ. Environment as a limiting factor of the historical global spread of mungbean. eLife 12 e85725, ২০২৩।
https://doi.org/10.7554/eLife.85725
3 Islam, Q. M. S.; Miah, M. A. M.; Rahman, M. S.; Hossain, M. S. Adoption of BARI Mung Varieties and Its Constraints to Higher Production in Southern Region of Bangladesh. Bangladesh Journal of Agricultural Research 38(1), ২০১৩। https://doi.org/10.3329/bjar.v38i1.15193
4 de Brauw, Alan; Kramer, Berber; Murphy, Mike. Yielding profits Low adoption of an improved mung bean seed variety in Southern Bangladesh. IFPRI Discussion Paper 1975, ২০২০।
https://ideas.repec.org/p/fpr/ifprid/1975.htm
আইরিন পারভীন খান
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

