বার্লিনে বাম, পূর্বে ডান—জার্মানি কোন পথে ?

 

জার্মানির রাজনীতির আকাশে একই সময়ে যেন দুটি বিপরীত বাতাস বইছে। রাজধানী বার্লিনে বামপন্থী ডি লিঙ্কের উত্থান, আর পূর্বাঞ্চলের একাধিক রাজ্যে ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি—এএফডির শক্তিশালী অবস্থান। একই দেশের ভোটার, অথচ রাজনৈতিক বার্তা দুই প্রান্তে। এই বৈপরীত্য নিছক নির্বাচনী ফলের হিসাব নয়; এটি জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে জমে থাকা অসন্তোষ, উদ্বেগ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

বার্লিনে ডি লিঙ্কের সাফল্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক বছরের ব্যবধানে দলটির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো প্রশ্নকে সামনে রেখে দলটি নগর ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে। বার্লিনের মতো আন্তর্জাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক মহানগরে আবাসন যে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, তা এখন রাজনৈতিক প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। মানুষের আয়ের সঙ্গে বাড়িভাড়ার অসামঞ্জস্য যত বাড়ছে, রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও তত জোরালো বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু একই সময়ে জার্মানির পূর্বাঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক স্রোত দৃশ্যমান। মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে এএফডির শক্তিশালী ফল এবং এর আগে স্যাক্সনি-আনহাল্টে দলটির বড় ব্যবধানের বিজয় দেখিয়ে দিয়েছে, পূর্ব জার্মানির বহু ভোটারের ক্ষোভ অন্য ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে। অভিবাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ব্যয় এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থার সংকট—এসব প্রশ্ন সেখানে ডানপন্থী রাজনীতির পক্ষে জমি তৈরি করছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করার মতো। বার্লিনও সাবেক পূর্ব জার্মানির ভূখণ্ডের অংশ। অথচ রাজধানীর ভোটারদের একটি বড় অংশ যেখানে বামপন্থী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির দিকে ঝুঁকছেন, পূর্বাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলোতে একই ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক অসন্তোষ এএফডির মতো ডানপন্থী দলের পক্ষে ভোটে রূপান্তরিত হচ্ছে। অর্থাৎ অসন্তোষ এক, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রকাশ এক নয়।

এই পার্থক্যটি জার্মান রাজনীতির ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অসন্তোষ নিজে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। অর্থনৈতিক চাপ, রাষ্ট্রের সেবাদানের সীমাবদ্ধতা, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব একই সঙ্গে বাম ও ডান, উভয় প্রান্তের রাজনীতির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কোন দল সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক ভাষা দিতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করছে ভোটের দিক।

এখানে জার্মানির মধ্যপন্থী দলগুলোর জন্য সংকেতটি স্পষ্ট। একসময় খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী, সামাজিক গণতন্ত্রী ও সবুজদের মতো দলগুলো যে রাজনৈতিক পরিসর নিয়ন্ত্রণ করত, তা এখন আগের মতো স্থির নেই। বিভিন্ন রাজ্যে ছোট ও প্রান্তিক দলগুলোর শক্তি বৃদ্ধি এবং ভোটের বিভাজন সরকার গঠনকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। রাজনীতির কেন্দ্র থেকে ভোট সরে গেলে জোটের সমীকরণও বদলে যায়; আর জোট যত জটিল হয়, নীতিনির্ধারণের ওপর রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রভাব তত বাড়ে।

এএফডির উত্থান এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক। তবে কোনো রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া আর সরকার গঠন করা এক বিষয় নয়। জার্মান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জোট এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এএফডিকে ঘিরে মূলধারার দলগুলোর অবস্থানও তাই ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে ডি লিঙ্কের উত্থানও শুধু আদর্শিক বামপন্থার প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বার্লিনের ভোটে আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো অত্যন্ত বাস্তব প্রশ্ন যে কেন্দ্রে উঠে এসেছে, সেটি বরং দেখায়—ভোটাররা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজছেন। এই বাস্তবতা শুধু বার্লিনের জন্য নয়; জার্মানির অন্যান্য বড় শহরেও তা প্রাসঙ্গিক।

জার্মান রাজনীতির সামনে এখন তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন: মানুষ কি প্রচলিত রাজনৈতিক মধ্যপন্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে? নাকি তারা কেবল বিদ্যমান দলগুলোর নীতির পরিবর্তন দাবি করছে?

সম্ভবত উত্তরটি দুইয়ের মাঝামাঝি। কারণ ভোটের ফলাফল বলছে, প্রচলিত দলগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে; কিন্তু একই সঙ্গে দেশজুড়ে কোনো একক বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির আধিপত্যও তৈরি হয়নি। বরং রাজনৈতিক ভূগোল আরও বিভক্ত হচ্ছে। কোথাও বাম, কোথাও ডান, কোথাও আবার মধ্যপন্থী দল—একেক অঞ্চলে একেক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা জোরালো হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি জার্মানির রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা, সমঝোতা এবং মধ্যপন্থার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, তার ওপর এখন নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রাজনীতিকে আরও সংঘাতমুখী করছে।

তবে জার্মানিকে এখনই ‘ডানদিকে যাচ্ছে’ কিংবা ‘বামদিকে যাচ্ছে’—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, দেশটি একটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পুনর্বিন্যাসের বৈশিষ্ট্য হলো—রাজনৈতিক কেন্দ্র সংকুচিত হচ্ছে, প্রান্তের দলগুলো শক্তি অর্জন করছে এবং ভোটারদের একটি অংশ প্রচলিত দলগুলোর বাইরে নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে।

বার্লিনের বামপন্থী উত্থান এবং পূর্বাঞ্চলের ডানপন্থী উত্থান তাই পরস্পরবিরোধী হলেও একই বাস্তবতার দুটি প্রতিফলন। সেই বাস্তবতা হলো—জার্মান সমাজের একটি অংশ বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে আগের মতো সন্তুষ্ট নয়।

আগামী দিনের জার্মান রাজনীতির মূল লড়াই সম্ভবত বাম বনাম ডান—এই পুরোনো সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং প্রশ্ন হবে, কে মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়, আবাসন, অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারে। প্রচলিত দলগুলো যদি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বাম ও ডান—দুই প্রান্তের শক্তিই আরও জায়গা পেতে পারে।

জার্মানির সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল তাই কোনো একটি রাজনৈতিক রঙের বিজয়ের চেয়ে বড় একটি বার্তা বহন করছে। সেটি হলো—জার্মান রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই। ভোটারের মনোভাব বদলাচ্ছে, রাজনৈতিক মানচিত্র বদলাচ্ছে, এবং তার সঙ্গে বদলাচ্ছে ক্ষমতার পুরোনো সমীকরণও।

বার্লিনের ব্যালটবাক্সে বামের উত্থান আর পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে ডানের উত্থান—এই দুই বিপরীত স্রোত মিলিয়ে যে চিত্রটি তৈরি হচ্ছে, তা এক কথায় বলা যায়: জার্মানি এখন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পুনর্বিন্যাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কোন স্রোত শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, অভিবাসন, আবাসন এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগের উত্তর কে কতটা কার্যকরভাবে দিতে পারে তার ওপর।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম , ফ্রাঙ্কফুর্ট জার্মানি ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.