ত্রয়োদশ পর্ব
১৯৭২ সালের জুলাই মাস।
বাংলাদেশ তখনও স্বাধীনতার প্রথম বছর পার করছে। যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি, মানুষের চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন তখনও টাটকা। কিন্তু সেই সময়ই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ঘটে গেল এমন একটি বিভক্তি, যার অভিঘাত শুধু একটি ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তার গভীর প্রভাব পড়েছিল।
আমরা যারা শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও আ ফ ম মাহবুবুল হকের নেতৃত্বাধীন অংশের অনুসারী ছিলাম, তারা তখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম।
আমরা জানতাম, আমাদের পুরোনো সংগঠন আর আগের মতো নেই। কিন্তু সামনে কী?
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র—এ কথাটিই বা আসলে কী?
সত্যি বলতে কী, তখন আমাদের অধিকাংশেরই এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। আমরা শব্দটি শুনেছি, নেতাদের বক্তৃতায় শুনেছি, কিন্তু এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, অর্থনৈতিক ভিত্তি কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর প্রয়োগ—এসব নিয়ে তখনও আমাদের গভীর পড়াশোনা হয়নি।
তবু শব্দটির মধ্যে একটা আকর্ষণ ছিল।
মনে হতো, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিশ্চয়ই নতুন কোনো পথে নিয়ে যেতে হবে। পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন সমাজ, নতুন রাষ্ট্র এবং নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সেই নতুন পথের নামই যেন—বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।
পরে একটি গল্প আমাদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছিল, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বেতার ভাষণের একটি অংশ।
শোনা যেত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ড. রেহমান সোবহান বঙ্গবন্ধুর ভাষণের খসড়া লিখে একটি ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন। সিরাজুল আলম খান সেই খসড়াটি পড়ে দেখেন এবং সম্পাদনার সময় একটি অংশে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার কথা যুক্ত করেন।
বঙ্গবন্ধু পরে সেই ভাষণই বেতারে পাঠ করেন।
সেখানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হয়।
সেই সময় এই ঘটনা আমাদের কাছে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগত—তাহলে কি স্বাধীন বাংলাদেশ সত্যিই সমাজতান্ত্রিক কোনো নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোবে?
আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম।
কিন্তু জুলাইয়ের বিভক্তির পর অপেক্ষাটা অন্যরকম হয়ে গেল।
একই সংগঠনের মানুষ হঠাৎ যেন অপরিচিত হয়ে গেল।
যাদের সঙ্গে একসময় এক কাপ চা-ও ভাগ করে খেয়েছি, পকেটে টাকা না থাকলে যারা একে অন্যের জন্য চা কিনেছে, আন্দোলনের দিনগুলোতে যারা একই মিছিলের মধ্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছে, বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে—তাদের অনেকেই এখন আমাদের দিকে অন্য চোখে তাকাতে শুরু করল।
মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল।
কেউ কেউ একে অপরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়েও বেশি কিছু ভাবতে শুরু করল।
আমার কিশোর মনে তখনই একটি আশঙ্কা জন্মেছিল।
মনে হয়েছিল, আমরা যেন একটি বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করে ফেলেছি।
আজ সেই সময়ের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই আশঙ্কা একেবারে অমূলক ছিল না।
গাছটি যদি বড় হয়, তার ডালপালা যদি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার ছায়া বাংলাদেশের রাজনীতিকে বহুদিন ঢেকে রাখবে।
আমাদের কাছে ছাত্রলীগ শুধু একটি ছাত্রসংগঠন ছিল না।
স্বাধীনতার আগের দিনগুলোর দিকে তাকালে মনে হতো, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যায়ের সঙ্গে ছাত্রলীগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আওয়ামী লীগ ছিল মূল রাজনৈতিক দল, কিন্তু আন্দোলনের রাজপথে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অনেক সময় অগ্রবর্তী।
পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ইশতেহার রচনা ও পাঠ, ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের আন্দোলন—এসব ঘটনায় ছাত্রলীগের তরুণ নেতাকর্মীদের ভূমিকা আমরা নিজেদের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখতাম।
এমনকি বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করে জাতীয় নেতায় পরিণত করার আন্দোলনেও ছাত্রলীগের অসামান্য ভূমিকা ছিল।
তাই স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ যখন বিভক্ত হলো, আমাদের কাছে বিষয়টি শুধু সাংগঠনিক বিভাজন ছিল না।
আমাদের মনে প্রশ্ন ছিল—
যে ছাত্রলীগ এত বড় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করল, সেই ছাত্রলীগের বিভক্তির সময় বঙ্গবন্ধু কেন একটি পক্ষের সঙ্গে গেলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর আমরা তখন পাইনি।
হয়তো আজও তার সম্পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায়নি।
আমরা তখন তরুণ। ইতিহাসের গভীর রাজনৈতিক হিসাব বোঝার মতো বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা কোনোটিই ছিল না। শুধু অনুভব করছিলাম—আমাদের সামনে পুরোনো পথটি বন্ধ হয়ে গেছে।
নতুন ঠিকানা কোথায়?
জুলাইয়ের সম্মেলনের পর কিছুদিন সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ছিল না।
আমরা অপেক্ষা করছিলাম।
কী হবে?
কোন পথে যাব?
নতুন রাজনৈতিক সংগঠন কি হবে?
আমাদের নেতারা কী সিদ্ধান্ত নেবেন?
এইসব প্রশ্ন তখন আমাদের আড্ডার প্রধান বিষয়।
অবশেষে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে সেই অপেক্ষার মধ্যে একটি খবর যেন নতুন আলোড়ন তুলল।
৪২ নম্বর বলাকা ভবনের অফিস থেকে দপ্তর সম্পাদক রেজাউল হক মুস্তাক সংবাদপত্রগুলোতে একটি প্রেস রিলিজ পাঠালেন।
১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস উপলক্ষে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভা।
খবরটি আমাদের কাছে শুধু একটি জনসভার খবর ছিল না।
আমরা বুঝতে পারছিলাম, দীর্ঘ নীরবতার পর সংগঠন আবার প্রকাশ্যে মাঠে নামছে।
আর পল্টন ময়দান তখন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
মাইকিংয়ের সময় ‘ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান’—এই কথাটি যেন অবধারিতভাবেই উচ্চারিত হতো।
জনসভা মানেই পল্টন।
পল্টন মানেই রাজনীতির উত্তাপ।
সেই সময় জনসভায় মাইক সরবরাহ করত প্রধানত দুটি প্রতিষ্ঠান—তাহের মাইক ও কলরেডি মাইক।
তাহের মাইকের দোকান ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের কাছে উর্দু রোডে। তাহের সাহেবকে আমি চিনতাম। ঢাকার পুরোনো বাসিন্দা, লম্বা, কালো, ছিপছিপে গড়নের মানুষ। মাইক লাগানোর কাজ তিনি শুধু দোকানে বসে দেখতেন না; মাঠে গিয়ে নিজেই তদারকি করতেন।
আরেকটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান ছিল লক্ষ্মীবাজারের কলরেডি মাইক।
১৭ সেপ্টেম্বরের জনসভার জন্য তাহের মাইক নেওয়া হলো।
পল্টন ময়দানের পূর্বদিকে কাঠের গ্যালারির পাশে মঞ্চ তৈরি করা হলো।
দিন যত এগিয়ে আসছিল, আমাদের উত্তেজনাও তত বাড়ছিল।
আমি আমাদের এলাকার ছাত্রলীগ নেতা রাজা ইকবালসহ আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন পল্টন ময়দানে গেলাম।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আলো নামছে।
মাঠে মানুষের ভিড় বাড়ছে।
আমাদের মনে তখন এক অদ্ভুত প্রত্যাশা।
আমরা জানতাম না সামনে ঠিক কী হতে যাচ্ছে।
কিন্তু মনে হচ্ছিল, আজকের সভায় হয়তো নতুন কোনো রাজনৈতিক বার্তা আসবে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করলেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
আম্বিয়া ভাইকে আমরা সবসময় পায়জামা-পাঞ্জাবিতে দেখতাম। সেদিনও তাঁর পোশাকে ছিল সেই পরিচিত সরলতা।
আর মাহবুব ভাই—তাঁকে সেদিন দেখলাম খদ্দরের চেক শার্ট ও ডোরাকাটা প্যান্ট পরে।
দুজনকেই আমরা গভীর শ্রদ্ধা করতাম।
দুজনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যেও ছিল আলাদা বৈশিষ্ট্য।
একজন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্রজীবন থেকেই দুজনের রাজনৈতিক পরিচিতি ছিল শক্তিশালী।
মাহবুব ভাই সেদিন যখন বক্তব্য দিতে দাঁড়ালেন, তাঁর কণ্ঠে আবারও সেই পরিচিত জ্বালা।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বাধীনতার পর মানুষের প্রত্যাশা, ছাত্রসমাজের ভূমিকা—সবকিছু নিয়ে তিনি কথা বললেন।
আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম।
কিন্তু সেদিনের সভার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল আ স ম আবদুর রবের বক্তব্য।
রব ভাই মঞ্চে উঠতেই মাঠের পরিবেশ যেন আরও বদলে গেল।
তাঁর বক্তৃতায় ছিল প্রশ্ন, ছিল উত্তেজনা, ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বললেন।
তারপর হঠাৎ উপস্থিত জনতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন—
দেশে কি একটি নতুন রাজনৈতিক দল দরকার?
মাঠের চারদিক থেকে মানুষের হাত উঠতে শুরু করল।
আমি সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হাজার হাজার হাত যেন একসঙ্গে একটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
হ্যাঁ—নতুন রাজনৈতিক দল চাই।
সেই মুহূর্তে আমাদের কাছে আর কোনো ঘোষণা প্রয়োজন হলো না।
আমরা ইঙ্গিতটি বুঝে গেলাম।
নতুন কিছু আসছে।
আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
জুলাইয়ের বিভক্তির পর যে প্রশ্নটি আমাদের প্রতিদিন তাড়া করছিল—‘এরপর কী?’—সেদিন পল্টন ময়দানের জনসমুদ্র যেন তার প্রথম উত্তর দিল।
আমরা তখনও জানতাম না, সেই নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে কত বড় আলোড়ন তুলবে।
জানতাম না, সামনে আসছে আরও কঠিন সময়, আরও তীব্র সংঘাত, আরও অনেক আশা ও হতাশা।
শুধু বুঝেছিলাম, আমরা আর আগের জায়গায় নেই।
একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে।
আরেকটি অধ্যায়ের দরজা খুলছে।
পল্টন ময়দানের সেই সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল—ইতিহাস যেন আমাদের চোখের সামনে নতুন করে লেখা হচ্ছে।
আর আমরা, সেই সময়ের তরুণ ছাত্রলীগ কর্মীরা, অজান্তেই সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যাচ্ছি।
লেখক : হাবিব বাবুল
৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

