প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর : আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থই হোক সিদ্ধান্তের ভিত্তি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। সর্বশেষ, আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ঢাকার পক্ষ থেকে বর্তমানে আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ভারত সফরে যাওয়া উচিত। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ, অতীতের রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা জনমতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কখনোই সরলরেখায় চলেনি। ইতিহাস, ভূগোল, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে জটিল। দুই দেশের মধ্যে যেমন সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে একাধিক অমীমাংসিত বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে। একইভাবে ভারতেরও নিরাপত্তা, সীমান্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আন্তঃদেশীয় অপরাধ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নিজস্ব উদ্বেগ আছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই মতপার্থক্যগুলোর সমাধান কীভাবে হবে?

উত্তর একটাই: আলোচনা ও কূটনীতি।

দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যত বড় বিরোধই থাকুক, আলোচনার দরজা বন্ধ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধরত রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসেছে। কারণ রাষ্ট্রের সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতো নয়। এখানে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই; আছে স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে দেখা উচিত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মতপার্থক্য আছে বলেই ভারতের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। বরং মতপার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে, বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে রেখে, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির পরিচয়।

এখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি এখন আর কোনো দলের নেতা হিসেবে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না; তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রতিটি বৈদেশিক সিদ্ধান্তকে দেখতে হবে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের আলোকে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর এ ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত শোকবার্তা তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর ছিল শুধু আনুষ্ঠানিক শোকপ্রকাশ নয়; দুই দেশের টানাপোড়েনের মধ্যেও রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

বিশেষ করে লক্ষ করার বিষয় হলো, তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। তারপরও ভারত তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়ে বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের শোকের মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়েছিল। এটিকে কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখা যায়, আবার একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দরজা খোলা রাখার একটি বার্তা হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

এখন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। ফলে ভারতীয় আমন্ত্রণের গুরুত্বও ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভারত সফর মানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ নিয়ে ভারতের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশের মধ্যে ভারতের বিষয়ে ক্ষোভ, অবিশ্বাস বা বিরূপ মনোভাব রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারতের কিছু নীতি ও আচরণ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের একটি অংশের কর্মকাণ্ডও বাংলাদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না।

কিন্তু জনমতের আবেগ আর রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক জিনিস নয়।

একজন প্রধানমন্ত্রীকে জনমতের ভাষা বুঝতে হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্রের প্রয়োজন বিবেচনা করে। জনগণের আবেগকে সম্মান করা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা—দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার বাস্তবতায় ভারতকে পাশ কাটিয়ে চলা যেমন কঠিন, তেমনি বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া ভারতের কিছু আঞ্চলিক স্বার্থও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা আছে। বাংলাদেশ ভারতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ভারতও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচিত ভারত সফরে গেলে বন্ধুত্বের নামে কোনো বিষয়ে আপস না করা, আবার বিরোধের কারণে কোনো আলোচনার সুযোগও নষ্ট না করা। বাংলাদেশের স্বার্থে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো স্পষ্টভাবে উত্থাপন করতে হবে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিকতা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট আলোচনার কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে ভারতের কাছ থেকেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা পরিষ্কার হওয়া দরকার—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে একটি সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা। দুই দেশের সম্পর্ক যদি সত্যিই নতুনভাবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তি অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর তাই নিছক একটি বিদেশ সফর হওয়া উচিত নয়। এটি হতে পারে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি দূর করা, আস্থার সংকট কমানো এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ধরনের নতজানু নীতি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অকারণ ভারতবিরোধিতাও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আত্মমর্যাদাশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে; মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু তার সমাধান হবে আলোচনার মাধ্যমে।

তারেক রহমানের সামনে এখন সেই বাস্তববাদী কূটনীতির সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি ভারত সফর করেন, তাহলে তাঁর উচিত হবে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা, জাতীয় স্বার্থ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়কে একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া।

কিছু ব্যক্তির ভারতবিরোধী অবস্থান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি করা ঠিক হবে না। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার নামে বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য উদ্বেগকেও উপেক্ষা করা যাবে না। রাষ্ট্রনায়কত্বের আসল পরীক্ষা এখানেই—আবেগকে বুঝেও আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে দরজা খোলা রাখা জরুরি। কারণ প্রতিবেশীকে বদলে ফেলা যায় না; কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলানো যায়। বিরোধ থাকলে তা আলোচনায় নিতে হয়, স্বার্থের সংঘাত হলে সমঝোতার পথ খুঁজতে হয় এবং যেখানে সহযোগিতার সুযোগ আছে, সেখানে তা কাজে লাগাতে হয়।

ভারত ও বাংলাদেশ কেউই একে অপরকে এড়িয়ে চলতে পারবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে পাশাপাশি রেখেছে; এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দুই দেশকে সহযোগিতার পথে এগিয়ে নেওয়া।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর সেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে—যদি সফরটি হয় আত্মমর্যাদা, বাস্তববাদ, পারস্পরিক সম্মান এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে।

রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; পরিচালিত হয় স্বার্থ, বাস্তবতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে। তাই ভারত সফরের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত—‘ভারত কী চায়’ নয়, বরং ‘বাংলাদেশ কীভাবে এই সফরকে নিজের জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করবে’। সেই প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে দিল্লি যাওয়া বাংলাদেশের জন্য দুর্বলতার নয়, বরং পরিণত রাষ্ট্রনায়কত্বের পরিচয় হতে পারে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.