চতুর্দশ পর্ব
পল্টন ময়দানের সেই জনসভা শেষ হওয়ার পরও আমাদের মনে হচ্ছিল, সভাটি যেন শেষ হয়নি। মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, মঞ্চ গুটিয়ে ফেলার প্রস্তুতি চলছে, মাইকের তার খুলে ফেলা হচ্ছে—কিন্তু আমাদের মাথার ভেতর তখনও বক্তৃতার শব্দগুলো ঘুরছে।
বিশেষ করে আ স ম আবদুর রবের সেই প্রশ্ন—
দেশে কি একটি নতুন রাজনৈতিক দল দরকার?
মাঠের হাজার হাজার মানুষের হাত ওঠার দৃশ্যটি আমাদের চোখে লেগে ছিল।
আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, নতুন কিছু একটা হতে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই জনসভায় আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেটি তখন আমাদের কাছে ছিল রহস্যের মতো।
গেণ্ডারিয়ার ছাত্রনেতা নাজির মোহাম্মদ খসরু একসময় আমাদের বলল, স্টেডিয়ামের গেটের সামনে সে একজনকে দেখেছে।
লোকটির নাম মহিউদ্দিন।
আমরা সবাই তাকে চিনতাম।
সে ছিল অবিভক্ত ছাত্রলীগের একজন পরিচিত নেতা। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বডিগার্ড হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় সে আমাদের কাছে ‘মুন্সিগঞ্জের মহিউদ্দিন’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
খসরু বলল, সে মোটরসাইকেলে করে জনসভা দেখতে এসেছে।
আমরা অবাক হলাম।
প্রধানমন্ত্রীর বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি কেন এমন একটি জনসভায় এলেন?
কী দেখতে?
কার কথা শুনতে?
কেন?
কোনো উত্তর আমাদের জানা ছিল না।
তবে তরুণ বয়সে আমরা যেমন করে রাজনৈতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতাম, সেভাবেই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম।
আমাদের মনে হলো, হয়তো তাকে জনসভায় কী বলা হচ্ছে, কারা কী বক্তব্য দিচ্ছে—এসব দেখার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এটি ছিল আমাদের অনুমান, নিশ্চিত তথ্য নয়।
কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক আবহে এমন একটি ঘটনা আমাদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পল্টনের জনসভা থেকে আমরা যে রাজনৈতিক বার্তাটি পেয়েছিলাম, সেটি ছিল পরিষ্কার—একটি নতুন রাজনৈতিক দল আসছে।
এরপর পত্রপত্রিকায়ও নানা সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ হতে শুরু করল।
আমরা তখন খবরের কাগজ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।
সকালে পত্রিকা হাতে পেলেই প্রথমে রাজনৈতিক খবর খুঁজতাম।
কোন নেতা কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে কার বৈঠক হলো, কোথায় সভা হলো, নতুন দল নিয়ে কে কী বললেন—সবকিছুই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তখনও নতুন দলের সম্ভাব্য নেতৃত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তালিকা প্রকাশিত হচ্ছিল না।
আমাদের নিজেদের মধ্যে অবশ্য কিছুটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আ স ম আবদুর রব এবং শাহজাহান সিরাজ যে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের মূল নেতৃত্বে থাকবেন, এ নিয়ে আমাদের খুব বেশি সন্দেহ ছিল না।
আর একজনের নাম আমরা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জানতাম—
সিরাজুল আলম খান।
দাদা।
আমাদের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি চিন্তার কেন্দ্র।
তাঁর চারপাশে ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে উঠেছিল।
অনেক তরুণকে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন। অনেককে সংগঠিত করেছিলেন। আওয়ামী লীগের বহু নেতার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল।
নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ শুরু হলে দাদা সেই পুরোনো সম্পর্কগুলোকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করলেন।
তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করলেন।
শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেকের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ ছিল।
দাদার সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক মতের মিল সবসময় ছিল না।
বিশেষ করে দাদার বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারেননি।
কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়নি।
এটাই ছিল দাদার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখতেন না।
তখন আমরা ভাবতাম, নতুন দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে দাদা থাকবেন না।
তিনি থাকবেন চিন্তার জায়গায়।
নীতির জায়গায়।
তাত্ত্বিক নেতৃত্বে।
সেটাই যেন তাঁর স্বাভাবিক ভূমিকা।
১৯৭২ সালকে আজ ফিরে তাকালে আমার কাছে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বাঁক বলে মনে হয়।
স্বাধীনতার মাত্র এক বছর।
কিন্তু সেই এক বছরের মধ্যেই রাজনীতির ভেতরে নতুন নতুন রেখা তৈরি হতে শুরু করেছে।
আওয়ামী লীগে ভাঙন নেই, কিন্তু ভেতরে মতপার্থক্য আছে।
ছাত্রলীগ বিভক্ত।
বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণা নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে উত্তেজনা।
মুক্তিযুদ্ধফেরত তরুণদের মধ্যে হতাশা।
রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন।
অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস।
আর এর মধ্যেই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্মের প্রস্তুতি।
আমরা তখন বুঝতে পারছিলাম না, ইতিহাসের কোন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি।
শুধু অনুভব করছিলাম, কিছু একটা বদলাচ্ছে।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে নতুন দল গঠনের তৎপরতা চলল।
আলোচনা, বৈঠক, যোগাযোগ—সবকিছুই যেন গোপন অথচ প্রকাশ্য।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন বাড়ছিল।
আমাদের মধ্যেও নানা অনুমান চলত।
কে সভাপতি হবেন?
কে সাধারণ সম্পাদক?
কারা থাকবেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে?
আমাদের ধারণা ছিল, আ স ম আবদুর রব সভাপতি হবেন এবং শাহজাহান সিরাজ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব নেবেন।
কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের গল্প মেলায় না।
অবশেষে এল সেই দিন—
৩১ অক্টোবর ১৯৭২।
স্থান—জাতীয় প্রেস ক্লাব।
সেদিন সকাল থেকেই প্রেস ক্লাবের আশপাশে অন্যরকম উত্তেজনা।
সাংবাদিকেরা আসছেন।
সাবেক ছাত্রনেতারা আসছেন।
রাজনৈতিক কর্মীরা আসছেন।
আমাদের মতো কৌতূহলীরাও ভিড় করছি।
প্রেস ক্লাবের ভেতরে জায়গা কম।
বাইরেও মানুষের ভিড়।
সবাই অপেক্ষা করছে একটি ঘোষণার জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঘোষণা এল।
নতুন রাজনৈতিক দলের নাম—
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল।
সংক্ষেপে—
জাসদ।
নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো, আমরা যেন সত্যিই একটি নতুন যুগে প্রবেশ করলাম। অবশ্য এর আগে প্রেস রিলিজের মাধ্যমেই জাসদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয় , এবং গণকন্ঠ পত্রিকায় জাসদের এই ঘোষণা উপলক্ষে এক পৃষ্ঠার একটি টেলিগ্রামও বের হয়েছিলো ।
আমাদের এতদিনের অপেক্ষার একটা নাম হলো।
একটি রাজনৈতিক পরিচয় পেল আমাদের স্বপ্ন।
তবে নেতৃত্বের তালিকা দেখে আমরা কিছুটা বিস্মিতও হলাম।
আ স ম আবদুর রব ও মেজর জলিল হলেন যুগ্ম আহ্বায়ক।
মেজর জলিলের নামটি আমার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ছিল।
তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নাম আমরা শুনেছি।
আরও আগে তাঁর একটি ছবি আমি পত্রিকায় দেখেছিলাম।
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল—এমন খবরও তখন প্রকাশিত হয়েছিল।
দৈনিক পূর্বদেশে তাঁর ছবি ছাপা হয়েছিল।
ছবির নিচে লেখা ছিল—
‘হিপ্পিবেশে মেজর জলিল।’
আমি তখন সেই ছবিটি দেখেছিলাম এবং মনে মনে ভেবেছিলাম—এই মানুষটি নিশ্চয়ই খুব সাহসী এবং চৌকস একজন অফিসার।
স্বাধীনতার পর তাঁর আরেকটি পরিচয় আমাদের কানে এসেছিল।
ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়েছিল এবং তাঁকে আটক করা হয়েছিল—এমন কথাও তখন প্রচলিত ছিল। ভারতীয় বাহিনীর সম্পদ নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছিল বলে আমরা শুনেছিলাম।
এখন সেই মানুষটিই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
রাজনীতির কী অদ্ভুত পরিণতি!
একজন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, অন্যদিকে ছাত্র আন্দোলনের অগ্রগামী তরুণ নেতা—দুজন একই মঞ্চে।
আমাদের কাছে এটি ছিল একেবারেই নতুন দৃশ্য।
আ স ম আবদুর রব ও মেজর জলিলের সঙ্গে আরও পাঁচজনকে আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হলো—
শাহজাহান সিরাজ, বিধান কৃষ্ণ সেন, সুলতান উদ্দিন আহমেদ, নূর আলম ঝিকু এবং রহমত আলী।
কিন্তু ঘোষণার মুহূর্তেই একটি অস্বাভাবিক ঘটনা সামনে এল।
রহমত আলী সেখানে উপস্থিত নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ল—
তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে।
প্রেস ক্লাবের বাইরে ফিসফাস।
কেউ বলছে, তাঁকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেউ বলছে, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
কেউ আবার বলছে, তিনি নিজেই আসতে চাননি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাত স্থান থেকে তাঁর নামে একটি বিবৃতি এল।
সেখানে জানানো হলো, তিনি নতুন দলের সঙ্গে নেই।
ঘটনাটি আমাদের আরও কৌতূহলী করে তুলল।
একটি নতুন রাজনৈতিক দলের জন্মের দিনই এমন নাটকীয়তা!
রাজনীতি যেন শুরু থেকেই তার নিজের রহস্য নিয়ে হাজির হয়েছে।
প্রেস ক্লাবের সেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি চারদিকে তাকাচ্ছিলাম।
কেউ উত্তেজিত।
কেউ উল্লসিত।
কেউ চিন্তিত।
কেউ আবার দূর থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
আমাদের মতো তরুণদের চোখে তখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
মনে হচ্ছিল, এই নতুন দল হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারা বদলে দেবে।
আমরা তখনও জানতাম না সামনে কত কঠিন পথ।
জানতাম না, এই দলের সঙ্গে যুক্ত হবে ছাত্রসমাজের এক বড় অংশ।
জানতাম না, রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এই দলের সংঘাত কতটা তীব্র হবে।
জানতাম না, আমাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গেও এই রাজনীতি কত গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে।
সেদিন প্রেস ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার মনে হচ্ছিল—১৯৭২ সাল সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতির এক বাঁকবদলের বছর।
ছাত্রলীগের বিভক্তি দিয়ে যে অস্থিরতার শুরু, পল্টন ময়দানের জনসভায় যার পূর্বাভাস আমরা পেয়েছিলাম, ৩১ অক্টোবর প্রেস ক্লাবে এসে তার একটি আনুষ্ঠানিক রূপ হলো।
জাসদের জন্ম হলো।
আর আমরা?
আমরা তখন নতুন স্বপ্নের যাত্রী।
আমাদের সামনে নতুন দলীয় পতাকা নেই, নতুন অফিস নেই, সবকিছু এখনও পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠেনি।
কিন্তু একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় জন্ম নিয়েছে।
আমাদের মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের একটি দরজা খুলে গেছে।
সেই দরজার ওপারে কী আছে, তা কেউ জানত না।
আমরাও না।
শুধু জানতাম—ফিরে যাওয়ার পথ আর নেই।
লেখক : হাবিব বাবুল
৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

