বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পরিচয় কোনো পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক দলের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের বিবেক, একটি জাতির নৈতিক সাহস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। নির্মল সেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন একজন আদর্শনিষ্ঠ বামপন্থী রাজনীতিক, নির্ভীক সাংবাদিক, প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সর্বোপরি একজন সৎ ও মানবিক মানুষ। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছিল সত্যের প্রতি অবিচল আনুগত্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে আমার মনে শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুখ ভেসে ওঠে না; ফিরে আসে একজন স্নেহশীল অভিভাবকের মুখ, একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর হাসি, একজন আদর্শ মানুষের স্পর্শ এবং আমার জীবনের বহু মূল্যবান স্মৃতি।
নির্মল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নির্মল সেন নামেই সবার কাছে পরিচিত, ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুরেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত এবং মাতা লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজে বৈষম্য দূর না হলে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেই উপলব্ধিই তাঁকে আজীবন সংগ্রামের পথে নিয়ে যায়।
পাকিস্তান আমলে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল এবং পরে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল না ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার গল্প; বরং এটি ছিল ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা সংকটময় সময়ে নির্মল সেন ছিলেন সত্য উচ্চারণের সাহসী কণ্ঠ। সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের সংকট, রাষ্ট্রের অব্যবস্থা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে তিনি কখনো নীরব থাকেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন রাজনীতিকের প্রথম দায়িত্ব ক্ষমতার প্রতি নয়, জনগণের প্রতি।
রাজনীতির পাশাপাশি সাংবাদিকতা ছিল তাঁর আরেকটি শক্তিশালী পরিচয়। তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ লিখতেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু চিন্তার গভীরতা ছিল অসাধারণ। তিনি তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে কথা বলতেন। কারও মন রক্ষার জন্য সত্যকে আড়াল করেননি, আবার জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কখনো উত্তেজনাপূর্ণ ভাষার আশ্রয়ও নেননি। একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সততা আজও অনুসরণযোগ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে নির্মল সেনের নাম উচ্চারিত হলেই আরেকটি বাক্য অনিবার্যভাবে মনে পড়ে—“স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।” এই একটি বাক্যের মধ্যে তিনি একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে তুলে ধরেছিলেন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য ছিল না; এটি ছিল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে এক বিবেকবান মানুষের আর্তি। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু তাঁর এই উচ্চারণের প্রাসঙ্গিকতা আজও ফুরিয়ে যায়নি।
তবে নির্মল সেনকে আমি সবচেয়ে বেশি মনে রাখি তাঁর মানুষ হয়ে ওঠার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য। তিনি বড় ছিলেন, কিন্তু বড়ত্বের কোনো অহংকার ছিল না। তিনি সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যেতেন, মানুষের কথা শুনতেন এবং ভালোবাসতেন। আমার সৌভাগ্য, তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আমি বাংলাদেশে গেলে একাধিকবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন। আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিকতার। তিনি যখন আসতেন, মনে হতো বাড়িতে কোনো জাতীয় নেতা নন, পরিবারেরই একজন প্রবীণ সদস্য এসেছেন। রাজনীতি নিয়ে কথা হতো, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হতো, আবার পারিবারিক খোঁজখবরও নিতেন সমান আন্তরিকতায়। তাঁর ব্যক্তিত্বে যে বিনয় দেখেছি, আজকের দিনে তা সত্যিই বিরল।

জীবনের নানা সময়ে আমি তাঁর কাছ থেকে সাহস পেয়েছি, অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তিনি কখনো বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে শিক্ষা দিতেন না। খুব সাধারণ কথার মধ্যেই অসাধারণ জীবনবোধ তুলে ধরতেন। তিনি বলতেন, সত্যের পথে থাকলে পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পথই মানুষের সম্মান এনে দেয়। এই কথাগুলো আজও আমার জীবনের পাথেয়।
আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি হলো তাঁর নিজের হাতে লেখা চিঠিগুলো। তিনি নিয়মিত আমার খোঁজ নিতেন। জার্মানিতে তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি চিঠি আমি পেয়েছি। আজও সেগুলো যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, অনেক স্মৃতি মলিন হয়ে যায়; কিন্তু সেই চিঠিগুলো আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন সৎ মানুষের মানবিক স্পর্শের অমূল্য দলিল।
আজকের ডিজিটাল যুগে কয়েক সেকেন্ডে বার্তা পৌঁছে যায়, কিন্তু হাতে লেখা একটি চিঠির যে উষ্ণতা, যে আন্তরিকতা, যে আবেগ—তা কোনো প্রযুক্তি কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। নির্মল সেনের হাতের লেখা দেখলেই আজও মনে হয়, যেন তিনি ঠিক আমার সামনেই বসে কথা বলছেন।
আমার জীবনের আরেকটি অমূল্য স্মৃতি আমার বিয়ের অনুষ্ঠান। ব্যস্ত রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার জীবনের মধ্যেও তিনি আমার বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, একজন স্নেহশীল মানুষ হিসেবে তিনি আমার আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলেন। জীবনের এত বছর পরও সেই মুহূর্ত আমার কাছে আশীর্বাদের মতো মনে হয়। মানুষের জীবনে কিছু স্মৃতি থাকে, যা সময়ের সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। নির্মল সেনের সেই উপস্থিতি আমার জীবনের তেমনই এক স্মৃতি।
তিনি কখনো কাউকে ছোট করে দেখতেন না। তরুণদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের চিন্তা, সততা এবং নৈতিক সাহসের ওপর। তাই তরুণদের তিনি প্রশ্ন করতে, পড়তে, ভাবতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উৎসাহ দিতেন।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন রাজনীতিতে আদর্শের সংকট, সাংবাদিকতায় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট এবং সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। ঠিক এই সময়ে নির্মল সেনের জীবন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ তিনি প্রমাণ করে গেছেন—ক্ষমতা ছাড়াও একজন মানুষ সম্মানিত হতে পারেন, আপস না করেও জনপ্রিয় হওয়া যায়, সত্য বলেও মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া যায়।
২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর শারীরিক প্রস্থান বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু মানুষ তো শুধু শরীরে বেঁচে থাকেন না; তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের চিন্তায়, আদর্শে, কর্মে এবং মানুষের স্মৃতিতে। নির্মল সেনও সেভাবেই আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন।
আজ যখন তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি, তখন বারবার মনে হচ্ছে—আমার কাছে তাঁর রেখে যাওয়া হাতে লেখা চিঠিগুলো কেবল কাগজ নয়, সেগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। তাঁর স্নেহ, তাঁর বিশ্বাস এবং তাঁর শিক্ষা আমার ব্যক্তিগত জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই ঋণ কখনো শোধ করার নয়।
নির্মল সেন আমাদের শিখিয়ে গেছেন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সম্পদে নয়, তাঁর নীতিতে; তাঁর ক্ষমতায় নয়, তাঁর সততায়; তাঁর উচ্চকণ্ঠে নয়, তাঁর সত্য বলার সাহসে।
শ্রদ্ধা আর গভীর কৃতজ্ঞতায় আজ স্মরণ করছি নির্মল সেনকে—বাংলাদেশের বিবেকবান এক মানুষকে, আপসহীন এক সাংবাদিককে, নীতিনিষ্ঠ এক রাজনীতিককে এবং আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় প্রেরণার উৎসকে।
লেখক: হাবিব বাবুল
**প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

