অস্থির সময়, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা

একাদশ পর্ব

 

১৯৭৩-৭৪ সালের বাংলাদেশ ছিল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের সময়। একদিকে স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস তখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্রমেই জন্ম নিচ্ছিল প্রশ্ন, অস্থিরতা ও হতাশা। আমরা যারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম, তারাও বুঝতে পারছিলাম—মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংগ্রামের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

স্বাধীনতার পরপরই আমাদের সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁদের মত ছিল, সদ্য স্বাধীন দেশে কেবল একটি দলীয় সরকার গঠন না করে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ও মতধারাকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ আরও সহজ হবে।

আমাদের তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই প্রস্তাব লিখিত আকারে তুলে ধরেছিলেন—এমন কথাই তখন আমরা শুনতাম।

কেন সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো না?

আজও সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আমার জানা নেই।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ব্যাখ্যা, অনেক বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নিজের ব্যাখ্যাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতো। ইতিহাসের অনেক প্রশ্নের মতো এই প্রশ্নও আজও উত্তরহীন রয়ে গেছে।

সেই সময় আরেকটি অদ্ভুত আলোচনা আমাদের কানে এসেছিল।

শোনা যেত, ভোলার মনপুরা দ্বীপে বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি বিশেষ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে তিনি অবস্থান করবেন, তাঁর সঙ্গে থাকবেন কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও তাত্ত্বিক নেতা। রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যস্ততার বাইরে বসে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে গবেষণা করবেন। পরে বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে সরকার সেই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে।

এমনও বলা হতো, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশে এলে প্রয়োজনে মনপুরায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সে জন্য একটি হেলিকপ্টার অবতরণক্ষেত্র নির্মাণের কথাও আলোচনায় ছিল।

এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবতা ছিল, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা প্রচলিত ছিল এবং তরুণ কর্মীদের কল্পনাকেও তা আলোড়িত করেছিল।

কিন্তু বাস্তবতা অন্য পথে এগোল।

ঘটনার গতি দ্রুত বদলে গেল।

আমাদের কাছেও মনে হতে লাগল, বঙ্গবন্ধু বদলে যাচ্ছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনও বদলে যাচ্ছে।

যে দেশ একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও বহু আইন-কানুনে পাকিস্তানি আমলের ধারাবাহিকতা রয়ে গেল। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত পরিবর্তন; কিন্তু সেই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হলো না।

গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ—সবার মুখে তখন নানা ধরনের অসন্তোষের কথা শুনতাম।

বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ছিল।

খাদ্যসংকটের খবর আসছিল।

ধীরে ধীরে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও মানুষের আলোচনায় উঠে আসতে শুরু করল।

আমাদের মতো তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের মনেও অস্থিরতা বাড়ছিল।

আমরা অনুভব করছিলাম, দেশের রাজনীতি আবার একটি নতুন মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ঠিক সেই সময়ই একটি ঘটনাক্রমে আমি এমন একটি পরিবেশের সাক্ষী হই, যা আমাকে দীর্ঘদিন ভাবিয়েছিল।

সাখোয়াত নামে এক সিনিয়র যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আমাদের সংগঠনেরই এক জ্যেষ্ঠ নেতার মাধ্যমে। তাঁর অফিস ছিল ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলায়। অফিসের সামনে বড় একটি সাইনবোর্ডে লেখা থাকত—

“বিশ্ব বাঙালি যুব সংস্থা”।

সাখোয়াত ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি।

আমি মাঝেমধ্যেই সেখানে যেতাম। রাজনীতি, দেশ, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি—নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা হতো।

একদিন সন্ধ্যায় তিনি আমাকে এবং আমাদের সেই সিনিয়র নেতাকে নিয়ে গেলেন সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে।

বাড়িটির মালিক ছিলেন মুসলিম লীগের একজন প্রবীণ নেতা, যিনি পাকিস্তান আমলে মন্ত্রীও ছিলেন। স্বাধীনতার পরে দালাল আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, পরে মুক্তি পান। তাঁর নাম ছিল আতাউল হক খান।

সেদিন সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তা আমার কাছে নতুন ছিল।

ড্রয়িংরুমে কয়েকজন ভদ্রলোক বসে গল্প করছেন।

তাঁদের কথাবার্তার মূল বিষয় ছিল দেশের রাজনীতি।

মাঝেমধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা সমালোচনা করছিলেন, আবার কোনো কোনো মন্তব্যে হাসির রোলও উঠছিল।

আমি নীরবে বসে সবকিছু দেখছিলাম।

পরে জানতে পারলাম, উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেকেই উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

তাঁরা নাকি প্রায়ই সেখানে আসেন।

তাঁদের জন্য নিয়মিত পোলাও, কোরমা এবং নানা ধরনের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়।

সাখোয়াত কিছুক্ষণ পর আতাউল হক খানের সঙ্গে পাশের একটি ঘরে গিয়ে একান্তে কথা বললেন।

আমি ও আমাদের সঙ্গে থাকা নেতা বাইরে বসেই অপেক্ষা করলাম।

কিছু সময় পরে তাঁরা ফিরে এলেন।

তারপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।

ফেরার পথে আমি সাখোয়াতকে কিছুই জিজ্ঞেস করিনি।

তিনি নিজেও বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

কিন্তু সেই সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা আমার মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।

প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো, প্রশাসনের অন্তত একটি অংশের মধ্যে সরকার সম্পর্কে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সেটি কতটা গভীর, কতটা বিস্তৃত—তা তখন বুঝে ওঠা সম্ভব ছিল না।

তবে বাতাসে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত ভেসে বেড়াচ্ছিল, তা অনুভব করতে পারছিলাম।

পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যেদিকে মোড় নিয়েছে, সেই সন্ধ্যার কথা আমার বারবার মনে পড়েছে।

তখন হয়তো আমরা পুরো ছবিটি বুঝতে পারিনি।

কিন্তু আজ বহু বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, ইতিহাসের বড় পরিবর্তনের আগে সমাজের ভেতরে অনেক অদৃশ্য স্রোত তৈরি হতে থাকে।

সেদিন সেগুনবাগিচার সেই বসার ঘরে বসে আমি হয়তো তেমনই একটি স্রোতের ক্ষীণ শব্দ শুনেছিলাম।

সেই সময়ের আরও কিছু ঘটনা, প্রশাসনের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরও কিছু ইঙ্গিত পরবর্তী পর্বে তুলে ধরব।

লেখক : হাবিব বাবুল

৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.