নকশালবাড়ির ছায়া, বিপ্লবের স্বপ্ন এবং গোপন পাঠচক্র

নবম পর্ব

 

১৯৭৩-৭৪ সালের বাংলাদেশ ছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামের পাশাপাশি আদর্শের লড়াইও ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল পর্যন্ত রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা যারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম, আমাদের কাছে তখন মনে হতো—ইতিহাস যেন খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা সেই ইতিহাসের ভেতরেই হেঁটে চলেছি।

সেই সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নকশালবাড়ি আন্দোলনের খবর আমাদের কল্পনাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করত। সংবাদপত্রে যতটুকু প্রকাশিত হতো, তার চেয়ে বেশি খবর ছড়াত মুখে মুখে। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, ভারতের কোথাও না কোথাও বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে, আর তার ঢেউ একদিন বাংলাদেশেও এসে পৌঁছাবে।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে নানা ধরনের খবর আসত। কেউ বলত, নকশালপন্থী কর্মীরা গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তারা বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। কতটুকু সত্য, কতটুকু গুজব—তখন তা যাচাই করার উপায় ছিল না। কিন্তু আমাদের কিশোর মন সেই গল্পগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনত।

একটি কথা তখন প্রায়ই শোনা যেত—

“শ্রেণিশত্রুর রক্তে হাত না রাঙালে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না।”

এই ধরনের কথাবার্তা আমাদের কাছে একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর এবং রহস্যময় মনে হতো। বিপ্লবকে আমরা তখন বইয়ের পাতায় যেমন পড়ছিলাম, বাস্তবেও তেমন কিছু ঘটতে চলেছে—এমন ধারণা আমাদের অনেকের মনেই জন্ম নিয়েছিল।

এদিকে আমাদের সভাপতি এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকের বক্তৃতায়ও আমরা বারবার বিপ্লবের আহ্বান শুনছিলাম।

তিনি বলতেন—

“আধা-সামন্তবাদী, আধা-পুঁজিবাদী সমাজকে আঘাত করতে হবে।”

তিনি আঘাতের রাজনৈতিক অর্থ ব্যাখ্যা করতেন, কিন্তু আমাদের মতো অল্পবয়সী কর্মীরা অনেক সময় নিজেদের কল্পনায় সেই কথার আরও কঠোর অর্থ দাঁড় করিয়ে নিতাম। মনে হতো, বিপ্লব বুঝি খুব কাছেই, আর একদিন সত্যিই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সংগ্রাম শুরু হবে।

আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষারও সীমাবদ্ধতা ছিল।

রাশিয়াপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিকে আমরা “সংশোধনবাদী” বলতাম।

সভা-সমাবেশে এই শব্দটি বারবার উচ্চারিত হতো।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, “সংশোধনবাদ” বলতে আসলে কী বোঝায়, তার পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তখন আমাদের অধিকাংশেরই জানা ছিল না। আমরা সংগঠনের শিক্ষা, স্টাডি সার্কেল এবং নেতাদের বক্তব্য থেকেই শব্দগুলো শিখছিলাম।

সেই সময় উত্তরবঙ্গ থেকে প্রায়ই সংঘর্ষের খবর আসত।

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপি)-এর বিভিন্ন অংশ, রক্ষীবাহিনী এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের সংবাদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্র এবং আন্ডারগ্রাউন্ড বামপন্থী সংগঠনগুলোর সংঘাত যেন ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল।

ঢাকার দেয়ালও তখন যেন রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র।

রাতারাতি দেয়ালে লেখা হতো—

“চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান।”

এই স্লোগানগুলো লিখত বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড বামপন্থী সংগঠন।

সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির তৎপরতাও তখন ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল। আমরা সংক্ষেপে তাদের “এস.এস.” বলেই ডাকতাম।

কোথাও কোথাও তাদের সঙ্গে আমাদের ছাত্রলীগের সংঘর্ষও হতো।

এমনই একটি ঘটনার মুখোমুখি আমিও হয়েছিলাম।

বিক্রমপুরের সিরাজদিখানের একটি স্কুলে ছাত্রলীগের সভা করতে গিয়েছি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন কৃষক লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফজলুর রহমান ভুলু, ঢাকা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতম গিয়াসউদ্দিন খিজির, হুমায়ুন কবিরসহ আরও কয়েকজন।

সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমরা টের পেলাম, এলাকার এস.এস.-এর কর্মীরা চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলেছে।

পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল।

সংঘর্ষ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আমরা কয়েকজন দ্রুত পরামর্শ করলাম।

তারপর বক্তৃতার ভাষাই বদলে দিলাম।

আমরা বললাম—

“আপনাদের সঙ্গে আমাদের মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। আমাদের লক্ষ্যও বিপ্লব। পার্থক্য শুধু এই যে, আপনারা গোপনে কাজ করছেন, আর আমরা প্রকাশ্য রাজনীতি করছি। আমরা একে অপরের শত্রু নই, বরং একই স্বপ্নের ভিন্ন পথের যাত্রী।”

আজও মনে আছে, কথাগুলো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিল।

উত্তেজনা ধীরে ধীরে প্রশমিত হলো।

সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানো গেল।

সেদিন বুঝেছিলাম, কখনও কখনও একটি বক্তৃতা সংঘর্ষের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।

রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পড়াশোনা।

শুধু সভা-মিছিল নয়, আমরা বই নিয়েও সমান উৎসাহী ছিলাম।

সেই সময় কলকাতা থেকে গোপনে নানা বামপন্থী পত্রিকা ও বই বাংলাদেশে আসত।

“লাল ইশতেহার”, “পূর্ব তরঙ্গ”—এসব নাম আমাদের কাছে ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

অনেক সময় একটি পত্রিকা হাতে পাওয়াই ছিল বড় ঘটনা।

ঢাকার বাংলাবাজারের ১৪ নম্বরে ছিল চলন্তিকা বইঘর

ছোট্ট সেই দোকানটি তখন অনেক রাজনৈতিক কর্মীর কাছে পরিচিত ছিল। দোকানের মালিক ছিলেন ভুঁইয়া সাহেব। প্রকাশ্যে সব বই সাজানো থাকত না। পরিচিত লোকদের জন্য আলাদা করে কিছু বই রাখা হতো।

একদিন ছাত্রলীগের নগর শাখার সার্বক্ষণিক কর্মী গোলাম মাহমুদ আমাকে নিয়ে গেলেন সেখানে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্রনেতা নাজির মোহাম্মদ খসরু।

গোলাম মাহমুদ একসময় পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। খসরুও ছিলেন পড়াশোনাপ্রিয় একজন কর্মী।

সেদিন চলন্তিকা বইঘর থেকে আমরা অনেক বই কিনলাম।

বেশিরভাগই নকশালবাড়ি আন্দোলন, চীনা বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে।

সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার কিম ইল সুং-এর কয়েকটি বইও নিলাম।

বইগুলো আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলাম।

একজন একটি বই পড়বে, তারপর অন্যজনকে দেবে।

এভাবেই চলত আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষা।

শুধু বই কিনলেই দায়িত্ব শেষ হতো না।

পড়া শেষ হলে বসত পাঠচক্র।

কখনও গোলাম মাহমুদের কে. এম. দাস লেনের বাসায়।

কখনও নাজির মোহাম্মদ খসরুদের গেণ্ডারিয়ার ৪ নম্বর দীননাথ সেন লেনের বাড়িতে।

রাত গভীর পর্যন্ত চলত আলোচনা।

কেউ মার্কস পড়ে এসেছে।

কেউ লেনিন।

কেউ মাও সে তুং।

কেউ আবার নকশালবাড়ির অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা কোনো পুস্তিকা।

কখনও তর্ক এতটাই দীর্ঘ হতো যে, বুঝতেই পারতাম না কখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেছে।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, আমাদের সেই পাঠচক্র ছিল শুধু বই পড়ার আসর নয়।

সেখানে আমরা রাজনীতি শিখেছি, মতাদর্শ নিয়ে তর্ক করেছি, স্বপ্ন দেখেছি, ভুল করেছি, আবার শিখেছিও।

আমাদের অনেক উপলব্ধিই হয়তো ছিল অসম্পূর্ণ, অনেক বিশ্বাসই ছিল আবেগনির্ভর, কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না—

আমরা বিশ্বাস করতাম, সমাজ বদলানো সম্ভব।

আর সেই বিশ্বাসই আমাদের প্রজন্মকে বইয়ের দোকান, পাঠচক্র, সভা, মিছিল এবং সংগ্রামের পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

সেই পথের প্রতিটি বাঁক আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।

লেখক: হাবিব বাবুল

৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রপন্থী ছাত্রলীগের সংগঠক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.