১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগ সম্মেলন : লবিং, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং এক স্মরণীয় অধ্যায়

১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলন ছিল শুধু একটি সাংগঠনিক সম্মেলন নয়; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র দুই বছর পর দেশের রাজনৈতিক আবহ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। একদিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ চলছে, অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতির ভেতরেও নানা মত, আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ের একজন প্রত্যক্ষ কর্মী হিসেবে এই সম্মেলনের বহু ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

সম্মেলনকে ঘিরে সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা, লবিং এবং প্রচারণা। প্রার্থীরা নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করতেন। কে কাকে সমর্থন দেবেন, কোন জেলা কার পক্ষে থাকবে, কোন গ্রুপ কতটা শক্তিশালী—এসব নিয়ে তখন সারাক্ষণই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলত।

ঝিনাইদহের মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদ হলে থাকতেন। একদিন সরাসরি আমাকে বললেন, তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে চান। তাঁর কথাবার্তায় ছিল আত্মবিশ্বাস, তবে একই সঙ্গে তিনি সভাপতি এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকের কঠোর সমালোচকও ছিলেন। প্রায়ই বলতেন, মাহবুবুল হক একসময় ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় এসব অভিযোগ ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতো।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে তখন নোয়াখালী গ্রুপ এবং উত্তরবঙ্গ গ্রুপের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। রাজনৈতিক মতের চেয়ে আঞ্চলিক সমীকরণও তখন অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। প্রচার সম্পাদক একরাম ভাই, সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউল আলমসহ আরও কয়েকজনের নাম সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় ছিল।

একদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে জাসদের কার্যালয়ের নিচে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে আমরা কয়েকজন আড্ডা দিচ্ছিলাম। সেখানে হঠাৎ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতা গোফরান এসে যোগ দিলেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম, তিনিও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহী। তাঁর মধ্যে কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না; অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী এবং মেধাবী একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।

সভাপতি পদ নিয়ে অবশ্য তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়েনি। সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকই সভাপতি হচ্ছেন। অন্তত ওই পদে অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য প্রার্থীর নাম আমি শুনিনি।

এরপর গঠন করা হলো সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি। জগন্নাথ কলেজের ভিপি এবং ঢাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী ছাত্রনেতা সাইফুর রহমানকে আহ্বায়ক করা হয়। বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করা হলো। সবগুলোর নাম আজ আর মনে নেই, তবে একটি নাম কখনও ভুলতে পারব না—গয়েশ্বর রায়। তিনি অবিভক্ত ছাত্রলীগের জগন্নাথ হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁকে আপ্যায়ন উপকমিটির আহ্বায়ক করা হয় এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। পরে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন, কিন্তু তখন তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের একজন নিবেদিত সংগঠক।

সম্মেলনের আয়োজন ছিল বিশাল। রমনা রেসকোর্স ময়দানে তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশের ১৮টি জেলা থেকে প্রায় ২০ হাজার প্রতিনিধি অংশ নেবেন। এত মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা সেই সময়ের সীমিত সামর্থ্যে ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

সিদ্ধান্ত হলো সবাইকে ভাত ও ইলিশ মাছ খাওয়ানো হবে। তখন ইলিশ ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে।সোয়ারি  ঘাটের মাছের আড়ত থেকে এক-দুই টাকায় ইলিশ কেনা হয়। বর্তমানে যেখানে কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার, তখন সেখানে নির্মাণকাজ চলছিল। সেই খোলা জায়গাতেই অস্থায়ী রান্নাঘর গড়ে তোলা হয়।

বড় বড় চুলায় সারাদিন রান্না চলেছে। বিশাল কাঠের ডোঙায় ভাত রাখা হতো, অন্যদিকে কড়াইভর্তি ইলিশ ভাজা হচ্ছিল। প্রত্যেক প্রতিনিধিকে এক টুকরো মাছ ও পর্যাপ্ত ভাত পরিবেশন করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে খাবার বিতরণ করা হয়। এত বড় আয়োজনের মধ্যেও বিশৃঙ্খলা খুব একটা চোখে পড়েনি।

একদিন দুপুরে সাইফুর রহমান আপ্যায়নের ব্যবস্থা দেখতে এলেন। ঠিক তখনই সভাপতি পদপ্রার্থী এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক খেতে এসে লাইনের বাইরে দাঁড়ালেন। সাইফুর রহমান আমাকে ডেকে বললেন, “উনাকে লাইনে দাঁড়াতে বলো। লাইন ছাড়া কাউকে খাওয়ানো হবে না।”

আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু নিয়ম সবার জন্য সমান। শেষ পর্যন্ত মাহবুব ভাইকে লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। পরে বুঝেছিলাম, সাইফুর রহমানের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব নতুন কিছু ছিল না। ১৯৭২ সাল থেকেই তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক মতপার্থক্য ছিল। তবে সেই ঘটনার বিস্তারিত এখানে আর উল্লেখ করছি না।

অবশেষে সম্মেলনের শেষ দিন এল। টিএসসিতে অনুষ্ঠিত হলো কাউন্সিল অধিবেশন। আমিও একজন কাউন্সিলর হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সবার চোখ তখন মঞ্চের দিকে। কে সভাপতি হচ্ছেন, কে সাধারণ সম্পাদক—এই ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল পুরো হলরুম।

অবশেষে নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করা হলো। সভাপতি হিসেবে এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকের নাম প্রত্যাশিতভাবেই এল। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হলো মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম।

ঘোষণা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলরুমে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। আমরা অনেকেই বিস্মিত। রায়হান ফিরদৌস মধুসহ আরও অনেক পরিচিত নেতার নাম কমিটিতে নেই। ঢাকা থেকেও যাঁদের থাকার কথা ভেবেছিলাম, তাঁদের কাউকেই দেখা গেল না।

আমাদের কয়েকজনের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধল। কেউ উচ্চস্বরে নয়, কিন্তু ক্ষোভ চেপে রাখতে পারছিল না। আমরা মৃদুস্বরে বলতে শুরু করলাম—“এই কমিটি আমরা মানি না।”

কাউন্সিল অধিবেশন শেষ হলো। টিএসসি থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা কয়েকজন। আমাদের সঙ্গে ছিলেন গয়েশ্বর রায়ও। সবার মুখে তখন হতাশার ছাপ। কারও কণ্ঠে উত্তেজনা নেই, নেই বিজয়ের আনন্দ। বরং এক ধরনের নীরব ক্ষোভ আমাদের ঘিরে ছিল।

টিএসসি থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা রওনা হলাম বলাকা বিল্ডিংয়ের দিকে। সেখানে তখনকার পরিচিত চাইনিজ রেস্তোরাঁ বাংচিন  ছিল ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক জনপ্রিয় আড্ডাস্থল। সিদ্ধান্ত হলো, সেখানে বসে একটু খাওয়া-দাওয়া করা হবে এবং একই সঙ্গে নতুন কমিটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেউ তেমন কথা বলছিল না। মাঝে মাঝে শুধু একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছিল। সবার মনেই একই প্রশ্ন—এই কমিটি কীভাবে গঠিত হলো? এত পরিচিত ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন মুখগুলো কোথা থেকে এল?

বাংচিন  রেস্তোরাঁয় ঢুকে আমরা একটি বড় টেবিলে বসলাম। গরম স্যুপ, ফ্রাইড রাইস আর চাইনিজ সবজি অর্ডার দেওয়া হলো। কিন্তু খাবারের চেয়ে আলোচনাই তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। গয়েশ্বর রায় শান্ত গলায় বললেন, “রাজনীতিতে সব সিদ্ধান্ত সব সময় মাঠের কর্মীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। তবে কর্মীদের মন ভেঙে গেলে সংগঠনও দুর্বল হয়ে পড়ে।”

আমরা কেউ প্রতিবাদ করলাম, কেউ নীরব রইলাম। কিন্তু সেদিনের সেই দুপুরে বাংছিন রেস্তোরাঁর টেবিলে বসে আমরা উপলব্ধি করেছিলাম—ছাত্ররাজনীতি শুধু আদর্শের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতার সমীকরণ, সাংগঠনিক কৌশল এবং অনেক অদৃশ্য সিদ্ধান্তের গল্প।

সেদিন আমরা জানতাম না, এই সম্মেলন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের রাজনীতি যেমন দ্রুত পাল্টে যাবে, তেমনি বদলে যাবে ছাত্ররাজনীতির মানচিত্রও। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা আমরা যেন নিজের চোখের সামনেই প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

(চলবে…)

লেখক: হাবিব বাবুল

৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.