শ্রদ্ধাভরে স্মরণে : বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক

১৪ জুলাই—একটি বেদনাবিধুর দিন। এই দিনেই আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ষাটের দশকের প্রখ্যাত ছাত্রনেতা, স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদের অন্যতম সংগঠক, চট্টগ্রাম সমিতি–ঢাকার সাবেক সভাপতি এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারার কৃতি সন্তান রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক

২০২১ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে স্বজন, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী গভীরভাবে শোকাহত ও স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কর্মময় জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, সজীব ও সক্রিয়। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই তিনি নীরবে পাড়ি জমান অনন্তের পথে। পরদিন ১৫ জুলাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। একজন মানুষকে দাফন করা যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শ, মানবিকতা ও ভালোবাসার স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাকের অবদান ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৬৮ সালের ৮ আগস্ট ‘সারথী’ ছদ্মনামে প্রকাশিত ‘আজব দেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনিই সর্বপ্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিহিত করেন—যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঊনসত্তরের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন গণআন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঐতিহাসিক জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ছিলেন নীরব আলোর মানুষ। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তিনি অসংখ্য মানুষের জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যেন ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। কারও কষ্টের কথা শুনলে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না; সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তাঁর কাছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা আত্মীয়-অনাত্মীয়ের কোনো বিভাজন ছিল না—মানুষই ছিল তাঁর একমাত্র পরিচয়।

অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বদলি কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা—এসব মানবিক কর্মকাণ্ড তিনি নীরবে করে গেছেন। চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাঁর সহপাঠীদের অনেকেই পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা স্তরের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে তাঁর ছিল আন্তরিক ও সুদৃঢ় সম্পর্ক। সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছেও তিনি ছিলেন সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের বহু মন্ত্রী ও জাতীয় নেতার আস্থাভাজন ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য। তিনি স্নেহ, ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় মানুষকে আপন করে নিতে জানতেন। আমাকেও তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ২০১২-১৩ সালে চট্টগ্রাম সমিতি–ঢাকার নির্বাহী কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময়ের স্মৃতিগুলো আজও আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। সংগঠন, মানুষ এবং চট্টগ্রাম—এই তিনটি বিষয় তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতেন।

সমাজসেবী, পরোপকারী, সজ্জন ও অমায়িক এই মানুষটি সারাজীবন গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁর জীবন আমাদের জন্য দেশপ্রেম, মানবতা ও নিঃস্বার্থ সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আজ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করি। প্রায়ই মনে হয়, তিনি যেন এখনো কোথাও ব্যস্ত আছেন কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে, কোনো বিপন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চিন্তায়। এমন মানুষ শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও মানুষের হৃদয় থেকে কখনো বিদায় নেন না।

তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ফাউন্ডেশন’। তাঁর সুযোগ্য সন্তান সাদীদ রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ফাউন্ডেশনটি শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ উদ্যোগ তাঁর মানবিক আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাককে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বিনীত প্রার্থনা—তিনি যেন এই মহান দেশপ্রেমিক ও মানবদরদী মানুষকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করে দেন। আমিন।

লেখক:


শহীদুল ইসলাম শহীদ
সাবেক দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম সমিতি–ঢাকা
সরকারি কর্মকর্তা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.