কলের গান থেকে রীলস্ — বাঙালির গান শোনার বিবর্তনের গল্প

প্রতি বছর ১৮ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব শ্রবণ দিবস (World Listening Day)। ২০২৬ সালের দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য “Listening as a Practice”, যার বাংলা অর্থ— “শ্রবণ একটি চর্চা”। বিশ্বজুড়ে মনোযোগ দিয়ে শোনার গুরুত্ব, শব্দ-পরিবেশ (Acoustic Ecology) সম্পর্কে সচেতনতা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানুষের শ্রবণ-সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

ভাবতে অবাক লাগে—শুধু শোনার জন্যও একটি বিশেষ দিন! অর্থাৎ আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম ছুটে চলেছি, জীবনের প্রয়োজনে ব্যস্ত থেকেছি, অজস্র কথোপকথনে সময় কাটিয়েছি; কিন্তু সত্যিই কি আমরা শুনছি? শুনছি কি একে অপরের কথা? শুনছি কি শহরের প্রান্তে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, নিঃসঙ্গ বনভূমির মর্মরধ্বনি, কিংবা গাছের পাতায় বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ?

এসব নিয়ে আমরা সামাজিক মাধ্যমে লিখি, জানি, ভাগ করে নিই কবিতা, গল্প কিংবা কল্পকাহিনীতে। কিন্তু বাস্তবে শুনে ওঠার অবকাশ যেন ক্রমেই কমে আসছে। প্রকৃত শ্রোতার সংখ্যা আজ বড়ই অল্প। অথচ গভীরভাবে শুনতে জানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবিকতা, সংবেদনশীলতা এবং পরিণত রুচির পরিচয়। যিনি যতখানি শোনেন, তার চেয়েও কম বলেন—তিনিই প্রকৃত শ্রোতা।

আজকের এই ব্যস্ত সময়ে, যখন সবাই নিজের বক্তব্য প্রকাশে ব্যস্ত, তখন একজন নীরব, মনোযোগী শ্রোতার উপস্থিতি জীবনের মূল্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দিনের কিছুটা সময় চোখ বন্ধ করে গান শুনুন, গল্প শুনুন, প্রিয়জনের কথা শুনুন। এক কথায়, কথনের চেয়ে শ্রবণেই বেশি মন দিন।

বিশ্ব শ্রবণ দিবস উপলক্ষে ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় শরৎচন্দ্র বাসভবনে আয়োজিত এক মনোজ্ঞ আলোচনা সভায় এই বিষয়গুলিই বিশেষভাবে উঠে আসে। সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনায় উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন ছায়ানট (কলকাতা)-এর কর্ণধার, বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক। মনোবিশ্লেষক ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিশ্লেষণ ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অনুষ্ঠানটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল দর্শক-শ্রোতাদের সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব, যা সমগ্র আলোচনাকে এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করে।

আলোচনার মূল বিষয় ছিল—“কলের গান থেকে রীলস্—বাঙালির গান শোনার বিবর্তনের গল্প”

সোমঋতা মল্লিকের পরিকল্পনা ও দক্ষ সঞ্চালনায় তথ্যসমৃদ্ধ এই অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামমোহন লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রি রিডিং রুমের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র, প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী স্বর্গীয় সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র ও গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রাহক পরমানন্দ চৌধুরী, মনোবিশ্লেষক ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং বিহান মিউজিকের অন্যতম কর্ণধার নীলাদ্রি দেব ভট্টাচার্য। চারজন বক্তাই নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন।

অনুষ্ঠানে শোনানো হয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা একটি গ্রামোফোন গান, যা পরমানন্দ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পরিবেশিত হয়। এই পরিবেশনায় সহায়তা করেন ছায়ানটের সক্রিয় সদস্য অপ্রতিম বসু

সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি ছিল ব্যতিক্রমী, সংযত ও গভীরভাবে চিন্তন-উদ্রেককারী। শরৎচন্দ্র বাসভবনের সেই সমাবেশে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে সমৃদ্ধ মনে হয়েছি। এমন অনুষ্ঠান আমাদের শুধু গান শোনার ইতিহাসই নয়, মন দিয়ে শোনার সংস্কৃতিকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।

কলমে : সাহানা নন্দন । 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.