বক্তৃতার জাদু, বিপ্লবের স্বপ্ন এবং এক প্রজন্মের মানসিক রূপান্তর

অষ্টম পর্ব

 

১৯৭৩ সালের সম্মেলনের পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সভাপতি এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে সংগঠন শুধু সাংগঠনিকভাবেই নয়, রাজনৈতিক ভাষা ও উপস্থাপনাতেও এক নতুন রূপ পেতে শুরু করে। বিশেষ করে মান্না ভাইয়ের আবির্ভাব ছাত্ররাজনীতিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল।

সম্মেলনের আগে তাঁকে আমরা অনেকেই তেমন চিনতাম না। নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার পর বিস্ময়ের পাশাপাশি সংশয়ও ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সংশয় কৌতূহলে, আর কৌতূহল শ্রদ্ধায় রূপ নিতে শুরু করল।

এর প্রধান কারণ ছিল তাঁর বক্তৃতা।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে আমরা অনেক শক্তিশালী বক্তা দেখেছি। কেউ বজ্রকণ্ঠে জনতাকে আন্দোলিত করতেন, কেউ স্লোগানে সভা মুখর করে তুলতেন, আবার কেউ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তৃতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।

তাঁর ভাষা ছিল শুদ্ধ, উচ্চারণ ছিল পরিষ্কার, যুক্তি ছিল ধারালো, আর উপস্থাপনা ছিল অসাধারণ সংযত। তিনি বক্তৃতা করতেন না, যেন মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে যখন তিনি বক্তৃতা দিতেন, তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত।

একটি একটি করে ক্লাস বন্ধ হয়ে যেত।

ছাত্ররা ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াত।

অনেক শিক্ষকও নিজেদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে নীরবে তাঁর বক্তব্য শুনতেন।

সবাই যে ছাত্রলীগ করতেন, তা নয়।

অনেকেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্তও ছিলেন না।

কিন্তু একজন ছাত্রনেতার বক্তব্য শোনার জন্য এভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত হওয়া ছিল বিরল ঘটনা।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য বহুবার দেখেছি।

মানুষ বক্তৃতা শুনতে আসে—এটা স্বাভাবিক।

কিন্তু বক্তৃতা শোনার জন্য ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে—এটা খুব সহজে দেখা যায় না।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, পরে শুনেছি দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

মান্না ভাই যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই ছাত্রদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের অনেক কর্মীকেও তাঁর বক্তৃতা শুনতে দেখা যেত। মতাদর্শগত বিরোধ থাকলেও তাঁর ভাষা, যুক্তি এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি তাদেরও এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

আমার দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনা খুব কমই দেখেছি।

এদিকে ১৯৭৩ সালের সম্মেলনে যারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাননি, তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে বলাকা ভবনে আসা কমিয়ে দিলেন।

অভিমান ছিল।

হতাশাও ছিল।

কিন্তু সংগঠনের কর্মসূচি এলে তাঁদের আবার মাঠে দেখা যেত।

মিছিলে, সভায়, প্রচারে—তাঁরা অনুপস্থিত থাকতেন না।

এটাই ছিল আমাদের সময়ের রাজনীতি।

ব্যক্তিগত কষ্ট থাকলেও আদর্শের প্রশ্নে অনেকেই সংগঠনকে ছেড়ে যাননি।

সভাপতি এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বক্তা।

তিনি ছিলেন তাত্ত্বিক।

তাঁর বক্তৃতায় আবেগের চেয়ে বিশ্লেষণ বেশি থাকত।

রাজনীতিকে তিনি শুধু আন্দোলন হিসেবে দেখতেন না; দেখতেন একটি বৈপ্লবিক দর্শনের আলোকে।

মাহবুব ভাইয়ের রাজনৈতিক জীবনও ছিল সংগ্রামের ইতিহাস।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সময় তিনি সহ-সম্পাদক ছিলেন, যখন শাহজাহান সিরাজ সাধারণ সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতের দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ছিলেন সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ।

সেই সময় থেকেই তাঁর লম্বা চুল আর দাড়ি ছিল।

শুনেছি, দেরাদুনে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের কাছেও তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। তাঁকে না দেখলে তাঁরা নাকি মজা করে বলতেন, “বালওয়ালা কাহাঁ হ্যায়?”—অর্থাৎ, “লম্বা চুলওয়ালা কোথায়?”

মাহবুব ভাইয়ের মধ্যে ছিল এক ধরনের বিপ্লবী সন্ন্যাসীর বৈশিষ্ট্য।

তিনি ব্যক্তিগত জীবন, আরাম-আয়েশ বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন না।

তাঁর সমস্ত চিন্তা যেন এক জায়গায় গিয়ে মিলত—

বিপ্লব।

তিনি শুধু নিজে বিপ্লবী হতে চাননি; আমাদেরও বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

আমরা তখন অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোর ।

আমাদের চিন্তায়, অভ্যাসে, জীবনযাপনে সেই মধ্যবিত্ত মানসিকতার ছাপ ছিল।

মাহবুব ভাই প্রায়ই বলতেন, আমাদের সেই “পেটি বুর্জোয়া” মানসিকতা ভেঙে ফেলতে হবে।

তাঁর সামনে গেলেই আমরা অনেক সময় অস্বস্তি অনুভব করতাম।

কারণ তিনি সহজ কথাবার্তার চেয়ে রাজনৈতিক প্রশ্নই বেশি করতেন।

তিনি জানতে চাইতেন—

কী পড়ছ?

কোন বই শেষ করলে?

মার্কস পড়েছ?

লেনিন পড়েছ?

মাও সে তুংয়ের লেখা পড়েছ?

তাঁর বক্তৃতার একটি বাক্য আজও আমার কানে বাজে।

তিনি বলতেন—

“বিপ্লব ভোজসভা নয়। বিপ্লব বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের বিষয়।”

এই কথাগুলো আমাদের কিশোর  মনকে প্রবলভাবে আলোড়িত করত।

আমি যখন তাঁর বক্তৃতা শুনতাম, তখন বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাই বেশি কাজ করত।

মনে হতো, একদিন সত্যিই হয়তো বিপ্লব শুরু হবে।

আমরাই রাজপথে নামব।

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য লড়াই হবে।

সচিবালয়, বেতার ভবন, টেলিভিশন কেন্দ্র, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা—সবকিছু যেন সেই কল্পনার মধ্যে চলে আসত।

আজ এত বছর পরে বুঝতে পারি, সেটি ছিল এক কিশোর কর্মীর রাজনৈতিক কল্পনা।

কিন্তু তখন সেই কল্পনাই আমাদের বাস্তবকে চালিত করত।

সেই সময় আমাদের আরেকটি কথাও বারবার বলা হতো—

“শ্রেণি সৃষ্টি করার জন্য শিক্ষা নয়, শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য শিক্ষা অর্জন করতে হবে।”

এই আহ্বান অনেকের জীবনেই গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

অনেকেই নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাওয়া কমিয়ে দিলেন।

পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে হাতে উঠে এল মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে তুং, হো চি মিনের বই।

দিনের পর দিন চলতে লাগল স্টাডি সার্কেল।

রাতভর চলত রাজনৈতিক আলোচনা।

অনেকেই এমনভাবে মার্কসবাদ অধ্যয়নে ডুবে গেলেন যে, কার্ল মার্কসের Das Kapital বইটিকে প্রায় ধর্মগ্রন্থের মতোই শ্রদ্ধার চোখে দেখতে শুরু করলেন।

আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, তারুণ্যের সেই বিশ্বাসে যেমন আন্তরিকতা ছিল, তেমনি ছিল এক ধরনের সরলতাও।

সেই সময়ের একটি ছোট ঘটনা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।

একদিন আমার হাতে Das Kapital-এর ইংরেজি সংস্করণ।

বইটি নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ দেখা হয়ে গেল জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সাইফুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি আমার হাতে বইটি দেখে হেসে বললেন,

—”তোমার মাথাটাও ওরা খারাপ করে দিল!”

আমি চুপ করে রইলাম।

তিনি বইটির দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,

—”নিজের লেখাপড়া বাদ দিয়ে এসব পড়া শুরু করেছ! এগুলো পরে হবে। আগে নিয়মিত ক্লাস করো। নিজের পড়াশোনায় মন দাও।”

আমি কোনো উত্তর দিইনি।

বইটি তখনও আমার হাতেই ছিল।

একদিকে বিপ্লবের স্বপ্ন, অন্যদিকে ভবিষ্যতের বাস্তব জীবন।

দুইয়ের টানাপোড়েন আমাদের অনেকের জীবনেই তখন নীরবে কাজ করছিল।

সাইফুর রহমানের কথাগুলো সেদিন খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে শুনিনি।

কারণ তখন আমাদের বিশ্বাস ছিল, সমাজ বদলানোর সংগ্রামের চেয়ে বড় কাজ আর কিছু হতে পারে না।

কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—রাজনীতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষা, আত্মপ্রস্তুতি এবং জ্ঞানের গভীরতাও সমান প্রয়োজন।

তবু সেই সময়ের তারুণ্যকে দোষ দিই না।

কারণ আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা ছিল ব্যক্তিগত উন্নতির নয়; একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন।

সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কি না, তার বিচার ইতিহাস করবে।

কিন্তু সেই স্বপ্ন আমাদের জীবনকে যে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, সে সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

লেখক: হাবিব বাবুল

৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.