চীন-ভারত ভূকৌশলগত দ্বন্দ্ব ও বৈশ্বিক রাজনীতি

 

দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অঞ্চলের দুটি দেশ’-চীন ও ভারতের সম্পর্ককে শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারত যখন চীনের দিকে তাকায় তখন সে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকেই বিবেচনা করে।

দেশ দুটির সুসম্পর্ক বা শত্রুমূলক সম্পর্ক এশিয়ার ভবিষ্যত যেমন, তেমনি বিশ্বব্যবস্থার ভালো-মন্দের জন্য বৃহত্তর দীর্ঘমেয়াদী তাৎপর্য বহন করে। তাই বিশ্বের মঙ্গলের জন্যই দেশ দুটির মধ্যে সুসম্পর্ক এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা অপরিহার্য, অভিমত বিশেষজ্ঞজনদের।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ চীন এবং ভারত। চীনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪১ কোটি এবং ভারতের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪৭ কোটি। দেশ দুটি নিকট প্রতিবেশী এবং বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যায় বৃহত্তম। দুটি দেশের মধ্যে প্রায় ৩৪৮৮ কিমি: দৈর্ঘ্য বিস্তৃত সীমান্ত রয়েছে এবং সীমান্ত নিয়ে সংঘাত ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে বার-কয়েক। সেই সমস্যা এখনও অব্দি চলমান।

দেশ দুটি প্রায় সমকালীন সময়ে, অর্থাৎ ভারত ১৯৪৭ এবং চীন ১৯৫০ সালে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দেশ দুটি সীমান্ত নিয়ে বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলো। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে চীন ভারতীয় সীমান্তে সামরিক হামলা চালায় এবং ভারতও পাল্টা জবাব দেয়। তবে এই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। এই যে সীমান্ত বিরোধ ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছিলো, তার চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এখনো অব্দি।

সীমান্ত বিরোধ নিয়ে সংঘাতের ঘটনা মাঝে মধ্যে ঘটছে। তখন থেকেই দেশ দুটি মনে করে আসছে, অপরপক্ষ তার সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং তাদের শক্তিমত্তাকে অবজ্ঞা করেছে। সীমান্ত নিয়ে দেশ দুটির বিরোধ আরও ব্যাপক গভীর ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী ও নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত ও মান-মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটিই উভয় দেশকে গভীর সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভারত চীনকে প্রধান প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য করে আসছে। অন্যদিকে চীনও ভারতেকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক এই নিরিখে ব্যাখ্যা করতে গেলে যা দাঁড়ায়, তাহলো উভয় দেশের মধ্যে নিরাপত্তার সংকট, নিজেদের সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসকে ধারণা করে সৎ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলা।

একই সঙ্গে দেশ দুটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগী হয়ে ওঠেছিলো, যেটি বর্তমানে আরও তীব্রতা পেয়েছে। অর্থাৎ বলা চলে নিকট প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পথ চলছে উভয় দেশ এবং স্বাভাবিক ভাবেই বৃহৎ দুই প্রতিবেশীর বিরোধ ও সংঘাত দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করেছে নেতিবাচক ভাবে। উভয় দেশই একে-অপরেকে আস্থায় নিতে পারেনি। বিশেষ করে ১৯৬২ সালে চীন কর্তৃক ভারতের সীমান্তে সামরিক হামলা পরিচালনা করে কথিত ভারতীয় ভুমি দখলে নেওয়া এবং অন্যদিকে, চীন কর্তৃক তিব্বত অধিগ্রহণ করা এবং এর প্রেক্ষিতে তিব্বতি নেতা দলাইলামার ১৯৫৯ সালে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেওয়ায়, চীন ও ভারতের মধ্যে যে অবিশ্বাস তীব্র হয়ে ওঠেছিলো, পরবর্তীতে এই আস্থানীনতা তীব্র বিদ্বেষমূলক শত্রুতায় পরিণত হয়েছিলো। ভারতীয়রা চীনকে ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক’ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। চীনও বিষয়টি একই দৃষ্টিতে বিবেচনা করে।

চীন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অন্যতম পরাশক্তি হওয়ায় বিশ্বব্যবস্থায়, এমনকি এশিয়ায় আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ভারতকে মূলত অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করে। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই দেশ দুটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করলেও ভারত পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে চীন অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিশ্বব্যবস্থায়। পাঁচ সদস্যের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে চীনের ভেটো ক্ষমতা থাকলেও ভারতের এই ক্ষমতা নেই। তবে উভয় দেশই এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। দেশ দুটির মধ্যেকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূলে রয়েছে গ্লোবাল সাউথকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিন্ন একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা। চীন নিজেকে গ্লোবাল সাউথের স্বাভাবিক সদস্য হিসেবে গণ্য করে এবং অন্যদিকে ভারত নিজেকে গ্লোবাল সাউথের ‘কণ্ঠস্বর’ বলে মনে করে।

অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে দাপুটে প্রভাব রয়েছে চীনের। এর মোট জিপিডি হলো: ১৮.৭৩ ট্রিলিয়ন ডলার, বৈশ্বিক তালিকায় চীনের অর্থনৈতিক অবস্থান দ্বিতীয়। অন্যদিকে, ভারত ক্রমেই উদীয়মান শক্তি থেকে বিশ্ব শক্তির কাতারে ওঠে আসার জন্য সক্রিয় ভাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির মোট জিডিপি হলো: ০৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক তালিকায় ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ।

চীন এবং ভারত সামরিক শক্তিতেও এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী এবং রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী। দেশ দুটির মধ্যে সঙ্গত কারণেই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলের ওপর নিজ নিজ আধিপত্য এবং প্রভাব বিস্তারের জন্য তীব্র রকমে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ায় সেটি একসময়ে শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। দেশ দুটির কারনে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়েছে এবং উভয় দেশই প্রতিযোগিতামূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সামরিকায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অস্ত্র উৎপাদন, বিপনন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর নিকট থেকে অস্ত্র ক্রয় করে অস্ত্র ভান্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছে।

অতিরিক্ত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সহ গোটা এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানে নিজেদের সুরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের অজুহাতে ছোট বা বড় দেশগুলোও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান ইতোমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন, বিপনন ও মজুদ করেছে। অস্ত্র প্রতিযোগিতা এশিয়ার এই অঞ্চলের দেশগুলোতে চলছে এবং কৌশলগত অঞ্চলের দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন, ভারত ও পাকিস্তান সচেষ্ট রয়েছে। সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের উপস্থিতি আছে দক্ষিণ এশিয়ায়। মিয়ানমার সংকটে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপস্থিতি আছে। চীন মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগরে তার যোগাযোগ বাড়াতে সচেষ্ট এবং অন্যদিকে ভারত চীনের এই উদ্যোগ সহজভাবে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। দেখা যায়, ভারত ও চীন, দেশ দুটির মধ্যে কৌশলগত, অর্থনৈতিক, সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার লক্ষ্য নিয়ে এশিয়া অঞ্চলের, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম ও প্রভাব বিস্তারের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীতায় লিপ্ত রয়েছে।

দেশ দুটির মধ্যেকার ভূ-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ হলো এশিয়ার তথা বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি বা নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় মূল বাধা হলো চীন,-ভারত এমনটিই মনে করে। পাশাপাশি ভারতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও চির শত্রু পাকিস্তানের সাথে চীনের সুসম্পর্ক এবং পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা, অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে সহযোগিতা করার অভিযোগও করে থাকে ভারত। তাছাড়া, ভারত নিজেকে চীনের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করলেও চীন কখনো ভারতকে সমকক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বিধায় উভয়ের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা গোটা এশিয়ার রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছে বছরের পর বছর।

চীন ও ভারতের সম্পর্ক হলো মূলত বিশ্বের দুই জনবহুল ও পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশের মধ্যকার ৩৪৮৮ কি.মি. সীমান্ত যেটি লাইন অব একচ্যুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) সংক্রান্ত ভূমির মালিকানা নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ বিষয়ক বিরোধ।, আছে বানিজ্যিক অংশীদারত্বের বিরোধ এবং কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি জটিল ও সংবেদনশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।

বেইজিং ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে না। বরং ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি উপদ্রব ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল হিসেবে বিবেচনা করে। চীনের ভারত সম্পর্কিত এইরূপ দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা উভয় দেশের মধ্যে নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও উসকে দিয়েছে।

দেশ দুটির শত্রুতা কিন্তু সীমানা ছাড়িয়ে ইন্দো-প্যাসিফিকে, যেটি চীনের “স্ট্রিং অব পার্লস” তথা গোয়াদর, হামবানতোতা পর্যন্ত এবং অন্যদিকে ভারতের “নেকলেস অব ডায়মন্ড” খ্যাত চাবাহার বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। সমস্যা এবং সংকটের এই বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা যেমন দেশ দুটির জন্য, তেমনি গোটা এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সংকটকে তীব্র করে তুলতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

লেখক: অ্যাডভোকেট আনসার খান
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.