মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত শান্তি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। মানুষ একদিকে যেমন সহাবস্থান, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ করতে চেয়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতা, সম্পদ ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা তাকে ক্রমাগত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে যে অস্থিরতা, যুদ্ধ, বিভাজন ও মানবিক সংকট ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে, তার পেছনে কয়েকটি মৌলিক শক্তি কাজ করছে—উগ্রজাতীয়তাবাদ, ভোগলিপ্সু সমাজব্যবস্থা, লাভলোভী যন্ত্রসভ্যতা, সাম্রাজ্যবাদ এবং বিবেকহীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। এরা কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতার উপাদান নয়; এগুলো আধুনিক সভ্যতার দার্শনিক সংকটেরও প্রতীক।
জাতীয়তাবাদ একসময় ছিল মুক্তির দর্শন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে কেন্দ্র করেই এর উত্থান। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যখন মানবিক চেতনা হারিয়ে উগ্রতার রূপ নেয়, তখন তা অন্য জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতিকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই উগ্রজাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে মানুষের পরিচয় ক্রমে সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে; নাগরিকের চেয়ে “জাতিগত সত্তা” বড় হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক দার্শনিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায়, জাতি একটি “imagined community”; কিন্তু আজ সেই কল্পিত সম্প্রদায় বাস্তব ঘৃণা ও সহিংসতার উৎসে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদ, অভিবাসী-বিদ্বেষ, বর্ণবাদ কিংবা সীমান্তসংঘাতের পেছনে উগ্রজাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তার নামে যুদ্ধাস্ত্র বৃদ্ধি করছে, পারমাণবিক শক্তির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে, এমনকি মানবাধিকারের প্রশ্নকেও জাতীয় স্বার্থের আড়ালে চাপা দিচ্ছে। ফলে শান্তিকামী মানুষ ক্রমশ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। এই জাতীয়তাবাদ মানুষকে মানবিক সংহতির বদলে বিভাজনের রাজনীতিতে আবদ্ধ করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা। আধুনিক পুঁজিবাদ মানুষের চাহিদাকে সীমাহীন করে তুলেছে। মানুষ এখন আর প্রয়োজনের জন্য ভোগ করে না; বরং ভোগের মাধ্যমেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। বিজ্ঞাপন, করপোরেট সংস্কৃতি এবং বাজার অর্থনীতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছে। সুখকে এখন পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ব্যক্তি ক্রমে আত্মকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামুখী হয়ে উঠছে।
কার্ল মার্কস যে পণ্যের ফ্যাসিবাদের কথা বলেছিলেন, আজ তা সর্বব্যাপী বাস্তবতা। মানুষ এখন সম্পর্কের চেয়ে বস্তুতে বেশি আস্থা রাখে। সমাজে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভোগবাদ মানুষকে প্রকৃতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। এর ফলেই পরিবেশ ধ্বংস, মানসিক অবসাদ এবং সামাজিক বৈষম্য বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর একদিকে বিপুল খাদ্য অপচয়, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষের অনাহার—এ বৈপরীত্য ভোগবাদী সভ্যতার নির্মম চিত্র।
ভোগবাদকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা এক নতুন ধরনের ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু প্রযুক্তি যখন মানবকল্যাণের পরিবর্তে মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। আজকের ডিজিটাল পুঁজিবাদ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যকে পণ্যে পরিণত করেছে। মানুষ নিজেই প্রযুক্তির ভোক্তা নয়, বরং প্রযুক্তির উপাদানে পরিণত হচ্ছে।
যন্ত্রসভ্যতার মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে লাভ। ফলে প্রযুক্তির উন্নয়নও মানবিক চাহিদার বদলে করপোরেট মুনাফা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নজরদারি প্রযুক্তি, অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু মিলিয়ে মানুষের স্বাধীনতা নতুনভাবে সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তিকেও প্রভাবিত করছে। মানুষ ক্রমে যান্ত্রিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দার্শনিক হার্বার্ট মারকুস এই অবস্থাকে “one-dimensional man” বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন—যেখানে মানুষ সমালোচনামূলক চিন্তা হারিয়ে ভোগবাদী ব্যবস্থার অনুগত সত্তায় পরিণত হয়।
সাম্রাজ্যবাদ এই সংকটের আরেকটি গভীর মাত্রা। অতীতে সাম্রাজ্যবাদ ছিল সরাসরি ভূখণ্ড দখলের রাজনীতি; বর্তমানে তা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক আধিপত্যের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো উন্নয়ন, গণতন্ত্র কিংবা নিরাপত্তার নামে দুর্বল দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক করপোরেশন এবং সামরিক জোটের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
এই সাম্রাজ্যবাদ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে না; এটি সংস্কৃতি, ভাষা এবং চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা হয়, যেখানে তারা চিরস্থায়ী নির্ভরশীলতায় ভোগে। যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের পেছনেও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ বড় ভূমিকা পালন করে। বিশ্বশান্তির কথা বলা হলেও অস্ত্রব্যবসা ও যুদ্ধ অর্থনীতিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিবেকহীন ব্যবহার। বিজ্ঞান নিজে কখনো অমানবিক নয়; বরং বিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানচর্চার একটি মহান অর্জন। কিন্তু যখন বিজ্ঞান নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা ধ্বংসের শক্তিতে পরিণত হয়। পারমাণবিক বোমা, রাসায়নিক অস্ত্র, জৈব প্রযুক্তির অপব্যবহার কিংবা ডিজিটাল নজরদারি—এসবই বিবেকহীন বিজ্ঞানের উদাহরণ।
আধুনিক রাষ্ট্র ও করপোরেট শক্তি বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের চেয়ে ক্ষমতা ও মুনাফার জন্য বেশি ব্যবহার করছে। ফলে বিজ্ঞান মানবমুক্তির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংসের উপকরণে পরিণত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়লেও মানবিক বোধ একই অনুপাতে বিকশিত হয়নি। এই বৈপরীত্যই আধুনিক সভ্যতার গভীর সংকট।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—অতীতে কি পৃথিবী সত্যিই বেশি শান্ত ছিল? ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ ও শোষণ অতীতেও ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগের সংকটের ব্যাপকতা ও ধ্বংসক্ষমতা ভিন্ন মাত্রার। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বায়ন সংঘাতকে বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে। আগে যুদ্ধ সীমিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকত; এখন তার প্রভাব পুরো পৃথিবীতে পড়ে। আগে মুনাফার পরিধি ছিল সীমিত; এখন বৈশ্বিক পুঁজিবাদ মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকেও বাজারে পরিণত করেছে।
অতএব, বর্তমান অশান্তির মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি সভ্যতার নৈতিক সংকট। মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানবিকতায় পিছিয়ে পড়ছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বাস্তবে মানুষ করপোরেট ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গণতন্ত্রের ভাষা ব্যবহার করা হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। ফলে শান্তির প্রশ্নটি এখন কেবল যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নয়; বরং মানবিক সভ্যতার পুনর্গঠনের প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন মানবিক রাজনৈতিক দর্শনের পুনর্জাগরণ। জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে মানবিক বিশ্বনাগরিকতার ধারণা, ভোগবাদের পরিবর্তে সংযম ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, মুনাফাকেন্দ্রিক প্রযুক্তির পরিবর্তে মানবকল্যাণমুখী বিজ্ঞান এবং সাম্রাজ্যবাদের পরিবর্তে সমতার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা জরুরি।
শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি মানে ন্যায়, মর্যাদা ও সহাবস্থানের পরিবেশ। বর্তমান সভ্যতা যদি উগ্রজাতীয়তাবাদ, ভোগবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বিবেকহীন প্রযুক্তির পথেই এগোতে থাকে, তবে পৃথিবী আরও ভয়াবহ সংকটের দিকে যাবে। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখা। মানবিক বিবেকের পুনর্জাগরণ ছাড়া পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

