ডেটিং অ্যাপে পরিচয়, ভালোবাসার টানে ইটনায় ছুটে এলেন চীনা তরুণ

 

ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, জীবনযাত্রাও সম্পূর্ণ আলাদা। একজন বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণী, আরেকজন চীনের ব্যস্ত নগর জীবনের বাসিন্দা। দুই দেশের দূরত্ব প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ভালোবাসার টানে সেই দূরত্বও যেন হার মেনেছে। ডেটিং অ্যাপসে পরিচয় থেকে শুরু হওয়া সম্পর্কের টানে সুদূর চীন থেকে কিশোরগঞ্জের ইটনায় এসে প্রেমিকার হাত ধরেছেন এক চীনা তরুণ। আর সেই ঘটনাই এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ঘটনাটি কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনার চৌগাংগা ইউনিয়নের কৃষ্টপুর গ্রামের মোড়লপাড়ার।
জানা যায়, চীনের হেনান প্রদেশের শিনশিয়াং শহরের বাসিন্দা গাও ওয়েইয়ানের সঙ্গে প্রায় দুই বছর আগে অনলাইনে পরিচয় হয় কৃষ্টপুর গ্রামের তরুণী ঝুমা আক্তারের। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপসে সাধারণ কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় যোগাযোগ। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে এবং পরে ভালোবাসার সম্পর্কে রূপ নেয়।
দুই দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা কিংবা সাংস্কৃতিক পার্থক্য—কোনো কিছুই তাদের সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলা, একে অপরের সংস্কৃতি ও পরিবার সম্পর্কে জানাশোনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে করতেই তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে দুজনের মধ্যেই একসঙ্গে জীবন কাটানোর ইচ্ছা তৈরি হয়।
অবশেষে দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গত শনিবার রাতে বাংলাদেশে আসেন গাও ওয়েইয়ান। ঢাকা পৌঁছে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে সরাসরি চলে যান প্রেমিকা ঝুমা আক্তারের বাড়িতে। বিদেশি এক তরুণকে গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে মুহূর্তেই কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। হাওরবেষ্টিত শান্ত গ্রামে এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখেননি স্থানীয়রা।

রোববার সকাল থেকে ঝুমাদের বাড়ির সামনে ভিড় করতে থাকেন উৎসুক মানুষজন। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছেন চীনা তরুণকে। স্থানীয় অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। যদিও ভাষাগত সমস্যার কারণে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হয়নি, তবু হাসিমুখ আর আন্তরিক আচরণ দিয়ে গ্রামের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন গাও ওয়েইয়ান।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, বিদেশি এই তরুণ গ্রামের সাধারণ পরিবেশ, মানুষের আতিথেয়তা ও হাওরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। গ্রামের শিশু-কিশোররাও তাকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। অনেকে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝুমা আক্তার বর্তমানে একটি কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত। জন্মসনদ অনুযায়ী তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকেও সম্পর্কটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল এবং তারা একে অপরকে ভালোভাবে বুঝে শুনেই ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান।
তবে ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। অনেকেই এটিকে ভালোবাসার এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবী ছোট হয়ে এসেছে, আর আন্তরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের ব্যবধান এখন আর বড় বিষয় নয়। আবার কেউ কেউ ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে বিয়ে ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, সে বিষয়েও সচেতন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, আন্তর্জাতিক বিয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া, কাগজপত্র যাচাই ও প্রশাসনিক অনুমোদন নিশ্চিত করেই যেন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হবে না।
এ বিষয়ে ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি এবং খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত, তাই আইনগত যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো মেনেই সবকিছু করতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.