নির্মাণ খাতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গোপালগঞ্জের তিন যুবককে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় তাদের একজনের বাবা ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে ওসি মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন জানিয়েছেন।
তবে পুলিশ অভিযোগটি এখনো মামলা হিসেবে না নিয়ে আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটির) সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছে।
অন্যদিকে বিএমইটি বলছে, ‘মামলার জন্য তাদের সংশ্লিষ্টতা লাগবে না। পুলিশ মামলা না নেওয়ার যে কারণ দেখিয়েছে, তা ‘অযৌক্তিক’।’
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে জীবন নিয়ে চরম সংশয়ের মধ্যে পড়া এ যুবকরা হলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোষেরচর উত্তরপাড়া গ্রামের মো. জামিল শেখের ছেলে পলাশ শেখ, সুতিয়ারকুল গ্রামের নুরুল ইসলাম ফকিরের ছেলে রনি ফকির ও বলাকৈড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে সৌরভ মোল্লা।
পলাশ শেখের বাবা মো. জামিল শেখের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সত্ত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান গোপালগঞ্জের তিন যুবককে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে রাশিয়ায় কনস্ট্রাকশন সাইটে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। পরে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা করে আদায় করেন।
গত ৭ মে গোপালগঞ্জের তিনজনসহ মোট ৩০ জন বাংলাদেশিকে একটি ফ্লাইটে রাশিয়ায় পাঠান হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতারণা করে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে ‘বিক্রি করে’ দেওয়া হয় বলে জামিল শেখের অভিযোগ।
পলাশরা ‘খুব কষ্টে আছে’ জানিয়ে অভিযোগে বলা হয়, তারা রুশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। তাদের দিয়ে যুদ্ধ করানো হবে বলে জানিয়ে চুল কেটে দেওয়া হয়েছে, সামরিক পোশাকের মাপ নেওয়া হয়েছে। তাদের বুট জুতা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তাদের মোবাইলও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
পলাশ শেখের ফুপাতো ভাই আবু সালেহ বলেন, “পলাশকে প্রো টেকনোলজি কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে রাশিয়ান আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে এক বছরের চুক্তিতে বিক্রি করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।”
তার অভিযোগ, এ বিষয়ে জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের লোকজন ‘আগে থেকেই জানত’।
সুতিয়ারকুল গ্রামের রনি ফকিরের স্ত্রী তৃষা বেগম বলেন, “আমার স্বামী ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। দালালের মাধ্যমে তার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।
“তারা তাকে রাশিয়া নিয়ে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নির্মাণকাজের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।”
তৃষা বলেন, ৭ লাখ টাকা পরিশোধের পর ৭ মে একটি ফ্লাইটে তার স্বামীকে রাশিয়া নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়।
মাঝে মাঝে কিছু সময়ের জন্য তাদের হাতে মোবাইল দেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, সুযোগ পেয়ে এসএমএস ও অডিও বার্তায় রনি জানিয়েছেন, তাদের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, চুল কেটে ফেলা হয়েছে।
“ওদের বন্দুকের মুখে জিম্মি করে সীমান্তবর্তী ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে।”
গত সোমবার শেষবার রনির সঙ্গে যোগাযোগ হয় জানিয়ে তৃষা বলেন, রনি রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি একটি সেনা ক্যাম্পে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন। সেখানে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জীবন নিয়ে সংশয় ও আতংকের মধ্যে আছেন তিনি।
বলাকৈড় গ্রামের সৌরভ মোল্লার চাচি লিমা আক্তার সুখী বলেন, ঢাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা দিয়ে সৌরভকে বিদেশে পাঠানো হয়। ৭ মে সকাল ১১টায় ছিল তার ফ্লাইট।
১৭ মে সৌরভের সঙ্গে পরিবারের কথা হয়। পরে ভিডিও কলে তাকে ‘সামরিক পরিবেশে’ দেখা গেছে বলে তার চাচির ভাষ্য।
লিমা আক্তার বলেন, ‘‘সৌরভের মাকে বিষয়টি বিস্তারিত জানানো হয়নি, কারণ তিনি অসুস্থ। সৌরভের বাবা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন। তাদের একমাত্র দাবি, সন্তানকে যেন নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’’
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ বলেন, “বিষয়টি আমরা শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে সবাইকে এ ধরনের ঘটনায় সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে এই অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরা সতর্ক হতে পারে।”
এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথাও বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
পুলিশ যা বলছে
রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ওসি মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলছেন, ‘‘মঙ্গলবার জামিল শেখের করা অভিযোগটি তারা নথিভুক্ত করেছেন, এখনো মামলা হিসেবে গ্রহণ করেননি।’’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “তারা এজেন্সির মাধ্যমে গেলেও বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) মাধ্যমে বৈধ শ্রমিক হিসেবেই গেছেন। যাওয়ার পরে সেখানে কী হয়েছ, বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। তাই আগে বিএমইটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানাতে হবে।
অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে বিএমইটিতে অভিযোগ দায়ের করে সেই কপি আমাদের কাছে আনলে আমরা মামলা নেব।”
ওসি বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা শুধু অভিযোগটি থানায় নথিভুক্ত করে রেখেছি। এখনো কোনো মামলা দায়ের করিনি, কারণ বিষয়টি মূলত বিএমইটির আওতাধীন রয়েছে। এ ব্যাপারে বিএমইটি কাজ করবে।”
এছাড়া ওই তিন যুবককে উদ্ধার করতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে জানিয়ে ওসি বলেন, “যেহেতু ভুক্তভোগীরা বিপদে আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেজন্য তাদেরকে আগে সেইফ করা প্রয়োজন। সেজন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও সহায়তার প্রয়োজন হবে। আমরা পরিবারের লোকজনকে সেখানেও আবেদন করতে বলেছি।”
মামলা না নিলেও অভিযোগ পেয়ে পুলিশ খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছে বলে জানান ওসি মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন।
তিনি বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়ে সেই এজেন্সির বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি, এজেন্সির লোকজন পলাতক রয়েছেন।”
বিএমইটি যা বলছে
পুলিশ মামলা না নিয়ে বিষয়টি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দিকে ঠেললেও বিএমইটির কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা।
সরকারি এ দপ্তরের বহির্গমন শাখার উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, “না। মামলার জন্য আমাদের সংশ্লিষ্টতা লাগবে না। ধরেন আমাদের কাছে ভিসা যেটা দিছে, ভিসার সাথে একটা চুক্তিপত্র দিছে, আমরা তো এইটা দেখে দিয়ে দিছি (ছাড়পত্র)।
এখন সে যদি ওই জায়গায় নিয়ে তাকে অন্য কিছুতে যুদ্ধ বা খারাপ কাজে… ফোর্সড লেবার যেটা করে, এইটা যদি হয়, তাইলে তো করা ঠিক না।”
তিনি বলেন, “এখন কথা হচ্ছে, এই মামলাটা কোন আইনে হবে? ধরেন এই যে যদি যুদ্ধে জড়িত করে থাকে, তাইলে মানব পাচার মামলাও হতে পারে।
কিন্তু এমনিতে আমাদের কাছে আসলে, যেহেতু সে বৈধভাবে বিদেশ গেছে, আমরা এটা মানব পাচার বলব না। কিন্তু মানব পাচারের আইনে আবার এই ফোর্সড লেবার, যেটা নেওয়ার পরে, এইটা আবার মানব পাচারের ভিতরে পড়ে।
তিনি বলেন, “মামলা নেবে না–এটা তো যৌক্তিক কোন বিষয় হতে পারে না।”
এই কর্মকর্তা বলেন, “এখানে ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স নিয়েছে, এটা ঠিক আছে। ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে তারপরে কী করছে? বিদেশে কী করছে সেটা আসলে এখানে বসে তদারকি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না, পুলিশেরও সম্ভব না। কারোরই সম্ভব না।”
তিনি বলেন, “যে লোকটা নিয়েছে সেও আমাদের দেশের লোক, যে গেছে সেও আমাদের দেশের লোক। যদি তার ট্রেন্ডই এই ধরনের থাকে যে, এই ধরনের জায়গায় পাঠিয়ে ভুয়া চুক্তিতে আমাদের লোকেদেরকে বিপদে ফেলে, তাইলে মানবপাচার (মামলা) দেওয়াই ভালো।
“আবার আপনি খুব ভালো নিয়তেই পাঠাইলেন, নেওয়ার পর যে এমপ্লয়ার, সে যদি তাকে ওই কাজে জোরপূর্বক নিয়োগ দেয়, তাইলে আমাদের দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির বা সরকারের কোনো কিছু করার আছে কিনা এইটাও একটু ভাবনার বিষয়।”
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া অফিসের নম্বরে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

