বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে যুদ্ধ সবসময়ই ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে ন্যায্যতা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি নির্মম সত্য—মানবিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক অপচয় এবং অগণিত নিরীহ মানুষের জীবনহানি। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় অফিসের প্রধান টম ফ্লেচার যে তুলনাটি তুলে ধরেছেন, তা এই নির্মম বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ইরানে সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় করা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার—এই বিপুল অর্থ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৯ কোটি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দেওয়া যেত।
এই তুলনা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে যুদ্ধের জন্য সীমাহীন অর্থ ব্যয়, অন্যদিকে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের অভাবে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে পতিত লাখো মানুষ—এই বৈপরীত্য সভ্যতার অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যার জন্য দরকার ২৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, ইরানে সামরিক ব্যয়ের প্রায় সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে—কেন এই অগ্রাধিকারহীনতা? কেন অস্ত্রের জন্য অর্থ সহজলভ্য, কিন্তু খাদ্য ও চিকিৎসার জন্য নয় ?
যুদ্ধের পেছনে যে যুক্তিগুলো সাধারণত তুলে ধরা হয়—জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, কৌশলগত আধিপত্য—সেগুলোর কিছু বাস্তব ভিত্তি থাকলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও গভীর অর্থনৈতিক স্বার্থ। অস্ত্রশিল্প আজ বিশ্বের অন্যতম লাভজনক খাত। যুদ্ধ মানেই অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি, এবং সেই সঙ্গে কর্পোরেট মুনাফার বিস্তার। ফলে যুদ্ধ শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি চালিকাশক্তি।
এই বাস্তবতায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—যুদ্ধ কি কেবল নিরাপত্তার জন্য, নাকি এটি একটি ব্যবসা? যখন দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু হলে অস্ত্র কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করে, শেয়ারবাজারে প্রতিরক্ষা খাতের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, যুদ্ধের সঙ্গে অর্থনৈতিক লাভের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করে সাধারণ মানুষ। তারা হারায় তাদের ঘরবাড়ি, প্রিয়জন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ। শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত হয় একটি পুরো প্রজন্ম। এই মানবিক বিপর্যয়ের হিসাব কোনো বাজেট বা পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
ইরান প্রসঙ্গে যে ব্যয়ের হিসাব সামনে এসেছে, তা হয়তো কেবল একটি উদাহরণ। বাস্তবে বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি ছোট অংশও যদি মানবিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হতো, তবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই অনেকটাই এগিয়ে যেত।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কি সত্যিই এই বৈপরীত্য সম্পর্কে অবগত নন? নাকি তারা সচেতনভাবেই যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? বাস্তবতা হলো, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সময় জনস্বার্থের চেয়ে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে মানবিক বিবেচনা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।
তবে এটাও সত্য, বিশ্ব রাজনীতি একমাত্রিক নয়। একটি দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ, আঞ্চলিক সংঘাত, জোট রাজনীতি—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তগুলো জটিল হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই জটিলতার মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষের জীবন কি অস্ত্রের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
টম ফ্লেচারের বক্তব্য এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এটি কোনো আবেগপ্রসূত মন্তব্য নয়; বরং একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন। তিনি মূলত দেখাতে চেয়েছেন, আমাদের অগ্রাধিকারগুলো কোথায় এবং সেগুলো কতটা মানবিক।
বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ও মানবিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকরও। কারণ, যুদ্ধ সমস্যার সমাধান না করে অনেক সময় নতুন সমস্যা তৈরি করে।
অস্ত্র ব্যবসায়ীদের লাভের বিপরীতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি—এই বৈপরীত্য দূর করা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। গণমাধ্যমেরও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে—তাদের উচিত এই বিষয়গুলোকে সামনে আনা, প্রশ্ন তোলা এবং জনমত গড়ে তোলা।
একটি ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়তে হলে আমাদের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যুদ্ধ নয়, মানবিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা—এই খাতগুলোতে বিনিয়োগই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি একটি প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কীভাবে আমাদের সম্পদ ব্যবহার করছি এবং সেই ব্যবহারের প্রভাব কী। যদি এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সৎভাবে খুঁজতে পারি, তবে হয়তো একদিন এমন একটি পৃথিবী গড়ে উঠবে, যেখানে যুদ্ধ নয়, মানবতাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

