শিকাগোর ‘হে মার্কেট’ থেকে যে আন্দোলনের ঢেউ জেগে উঠেছিল, তা আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশের প্রান্তে। যেখানে শ্রম শোষণ, সেখানেই বঞ্চনা। বঞ্চিত শ্রমজীবীদের বুকের বেদনা আর স্বপ্ন ধারণ করে, গড়ে ওঠে ন্যায্য মজুরির লড়াই। মালিকের মুনাফা বৃদ্ধির বাসনা আর শ্রমিকের মজুরি দাবির দ্বন্দ্ব, পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। ফলে লড়াই চলছে। সেই লড়াইয়ে- যুক্তি, আবেগ আর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় মে দিবস শ্রমিকদের কাছে এক সংগ্রামী প্রেরণা। ১৮৮৬ থেকে ২০২৬ সাল। মে দিবসের আহ্বান মানুষকে আলোড়িত করে এখনো। প্রকৃতি ও সমাজ নিয়ত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের প্রবাহের মধ্যে মানবজাতি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে নিজেকে রক্ষা ও বিকশিত করে চলেছে। আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের এই অগ্রযাত্রায় যা কিছু মানুষের অর্জন তার সবকিছুর পেছনেই আছে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও সাধনা। মানবজাতির সংগ্রাম ও বিকাশের ইতিহাসে যে দিনগুলো স্মরণীয় হয়ে আছে, যে দিনগুলো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রেরণা জোগায় এবং বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ সমাজের দিশা দেখায়, মে দিবস এর মধ্যে অন্যতম। এই দিবসকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বলা হয়। কারণ ৮ ঘণ্টা কাজের দিবসের দাবি উত্থাপন করেছে শ্রমিকরা, শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন করেছে, নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেছে রক্ত ও জীবন দিয়েছে শ্রমিকরা এবং আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফলে এই আন্দোলন শুধু দেশের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের দেশে দেশে, আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে শ্রমজীবী মানুষের কাছে। কিন্তু এই দিবসের দাবি শুধুমাত্র শ্রমিকদের জন্য নয় বরং সমাজের সব মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের স্বার্থকে তুলে ধরেছিল। তাই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে, যে কোনো ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গের মানুষকে মে দিবস সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে, ঐক্যবদ্ধ করে। বর্ণ, ভাষা আর ধর্মে বিভক্ত মানুষের পৃথিবীতে দুনিয়ার মজদুর এক হও! এই সেøাগান যেন এক ঐক্যের সূত্র। এই ঐক্য গড়ে উঠেছে বেদনায়, রূপ নিয়েছে বিক্ষোভে আর ধারণ করেছে অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। শ্রমজীবী মানুষের কাজ, বিশ্রাম এবং জীবনের বিকাশের দাবি একত্রে এই সেøাগানের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠে পরিণত হয়েছে, মে দিবসের চেতনায়।
মানব জাতির ইতিহাস, প্রকৃতি এবং সমাজকে মানুষের বিকাশের উপযোগী করে তোলার সংগ্রামের ইতিহাস। মানুষ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ভীষণ গরম, বন্যা, খরা ইত্যাদি মোকাবিলা করে যেমন বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে তেমনি চেষ্টা করেছে, প্রকৃতির নিয়মকে জেনে তা কাজে লাগানোর। যাতে জীবন নিরাপদ, সুন্দর হয়। পাশাপাশি মানুষ চেয়েছে, সবাই মিলে বাঁচতে এবং জীবনকে উন্নত করতে। সে কারণেই সমাজের বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, যুগে যুগে মানুষ লড়েছে। প্রকৃতির নিয়ম জানা এবং কাজে লাগানোর জন্য মানুষ হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলগত জ্ঞান। আর সমাজকে বুঝতে ও উন্নত করার জন্য চর্চা করেছে সমাজবিজ্ঞানের। প্রকৃতিকে জানা এবং সমাজকে জানা এই দুই ক্ষেত্রে মানুষ ব্যবহার করেছে শ্রমশক্তিকে। তাই মানব জাতির ইতিহাস, এক অর্থে শ্রমের ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রধান নায়ক শ্রমজীবী মানুষ। শ্রম ছাড়া সম্পদ সৃষ্টি হয় না কিন্তু শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ ও তাদের দাবিকে উপেক্ষা করে পুঁজিবাদী সমাজ শুধু নয়, এ যাবৎকালের সব সমাজ এগিয়ে যেতে চেয়েছে বলে বিশ্বব্যাপী বৈষম্য তীব্রতর হয়েছে দিন দিন। একদিকে মাত্র দশ জন মানুষের হাতে, পৃথিবীর সব মানুষের আয়ের সমান সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। অন্যদিকে শত শত কোটি মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য, প্রাণপণ চেষ্টা করতে হচ্ছে।
কেন এমন হচ্ছে? কেন এই বৈষম্য? এ প্রশ্নের উত্তর কীভাবে পাওয়া যাবে? কেন দিনরাত পরিশ্রম করেও কোটি কোটি মানুষের দিন চলে না, কিন্তু কিছু মানুষের সম্পদ উপচে পড়ে? এটা কি অদৃষ্টের লিখন, নাকি কোনো নিয়ম আছে? সম্পদ তৈরি হয় কীভাবে, সম্পদের মালিকানা চলে যায় কার হাতে? খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে, তারপরও কেন শ্রমজীবী মানুষ পেটভরে খেতে পায় না? জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি হচ্ছে, তারপরও কেন মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে না সাধারণ মানুষের সন্তান? চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতি সত্ত্বেও, মানুষ কেন চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত? সবাই মিলে সম্পদ তৈরি করে, তারপরও কেন মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ? কখনো তা ধর্ম নিয়ে, কখনো নারী-পুরুষের, কখনো গায়ের রঙ নিয়ে আবার কখনো ভাষা নিয়ে? খনি থেকে কয়লা তোলে শ্রমিক, সেই কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হলে এর সুফল কি সব মানুষ ভোগ করে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, এর কারণ হচ্ছে শোষণ। শোষণ কীভাবে হয়? শ্রমিকের যে শ্রমের ফলে সম্পদ তৈরি হয়, সেই শ্রমের ন্যায্য দাম শ্রমিক পায় না। যেটুকু তাকে ঠকানো হয়, সেটাই মুনাফা হিসেবে কারখানা মালিক বা ব্যবসার মালিকের হাতে যায়। ফলে শ্রমিক যতটুকু বঞ্চিত হয় ততটুকুই মালিকদের হাতে সঞ্চিত হয়। এই নিয়মটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন কার্ল মার্কস তার বিখ্যাত উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বে। মজুরির জন্য লড়াই শ্রমিকের দীর্ঘদিনের। বাঁচার জন্য, কাজ করার জন্য, সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাদ্য, পড়ার জন্য পোশাক, বিশ্রামের জন্য ঘর, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। শ্রমশক্তির বিনিময়ে মজুরি আর মজুরির টাকায় তার প্রয়োজন মেটানো একটা আর একটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মজুরি কম হলে, তার প্রভাব পড়ে সবকিছুর ওপর। তার খাওয়া কমে আর কমে যায় জীবনের সব অধিকার। তাহলে কী উপায়? মালিকরা বলে, বেশি কাজ করলে বেশি মজুরি মিলবে। কিন্তু কত বেশি কাজ করতে হবে একজন শ্রমিককে? সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এমনকি তার চেয়েও বেশি সময় কাজ করতে হবে। ১৪/১৫/১৬ ঘণ্টা কাজ করে বাসায় ফেরে, আবার ঘুম ঘুম চোখে ছুটতে হবে কাজের জন্য। এটা কি মানুষের জীবন? শ্রমিকের নিংড়ে নেওয়া শ্রমে যখন সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে তা দেখে বিক্ষোভ জমে শ্রমিকের বুকে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রথমে ভেবেছিল, কারখানাই তাদের প্রধান শত্রু। কারণ এখানেই সে শোষিত হয়। আর ম্যানেজাররাই আসলে শয়তান, তারাই তাদের কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিক কারখানা ভেঙে, মালিক ম্যানেজার হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে চাইল। কিন্তু এটা তো সমাধান নয়। তারা দখল করে নিতে চাইল শহর, নগর। রক্তক্ষয়ী এসব লড়াইয়ের পাশাপাশি, এই ভাবনাও জন্ম নিতে থাকল যে কাজের সময় কমাতে হবে, এমন মজুরি নির্ধারণ করতে হবে যাতে জীবন বিকশিত হতে পারে। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম আর জীবন বিকাশের জন্য আট ঘণ্টা। এই ভাবে দিনকে ভাগ করার দাবি উচ্চারিত হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষের পক্ষ থেকে। শিকাগোর হে মার্কেট থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই আন্দোলন, স্বীকৃতি পেয়েছে দেশে দেশে। মুনাফা বাড়ানোর মানসিকতা যেমন মালিকদের মধ্যে শোষণের ঐক্য তৈরি করে, তেমনি অধিকারের চেতনা শ্রমিকদের মধ্যেও প্রতিবাদী সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করে। বঞ্চনার বেদনা ভুলিয়ে দেয় ভাষা ও অঞ্চলের পার্থক্য। তাই ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষরা আওয়াজ তুলেছিল, কর্মঘণ্টা কমাও। ইউরোপ-আমেরিকার শ্রমিক সংগঠনগুলো, একই লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে থাকে। সংগঠিত হতে থাকে একের পর এক ধর্মঘট। সব আন্দোলনেই দাবি উঠতে থাকে, আট ঘণ্টা কাজের দিন ঘোষণা করো। গড়ে উঠতে থাকে আট ঘণ্টা শ্রম সমিতি। কাজের সময় আট ঘণ্টা করার এই দাবির অন্তরালে যে মুক্তির আকুতি ছিল, তা তুলে ধরেন কার্ল মার্কস। তিনি বলেন, আট ঘণ্টা কর্ম দিবসের দাবির অন্তরালে ছিল ন্যায্য মজুরির আকাক্সক্ষা।
স্বল্প মজুরি আর দীর্ঘসময় কাজ এই দ্বিমুখী আঘাতে পর্যুদস্ত শ্রমিকদের মুক্তির স্বপ্ন তুলে ধরেছিল, মে দিবসের লড়াই। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আইনি স্বীকৃতি এলেও, এখনো বাস্তবে শ্রমিকদের জীবন মজুরির ফাঁদে আটকে আছে। মজুরি কম বলে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। আবার অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে, জীবন বিকাশের কোনো পথ খোলা থাকে না। ফলে স্বল্প দক্ষতা, স্বল্প মজুরি এই চক্রে আটকে পড়েছে শ্রমিকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্থায়ী এবং অনানুষ্ঠানিক কাজের বিপুল বিস্তার। মাসিক মজুরি নয়, দৈনিক মজুরিও নয় এখন চুক্তিভিত্তিক, ঘণ্টাভিত্তিক কাজেই যুক্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। তাদের কাজ অনিশ্চিত, মজুরি স্বল্প, সংগঠিত নয় বলে দাবি উত্থাপন এবং আদায় করার সুযোগ নেই। একটা দেশের ৮০ শতাংশের বেশি শ্রমজীবী মানুষ যদি এই ধরনের শ্রমিক হয় তাহলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব যেমন পড়বে, কর্মসংস্কৃতি এবং রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। আউট সোর্সিং এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা এর নির্মম দৃষ্টান্ত। এদের কর্মঘণ্টা, মজুরি, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সবই অনিশ্চিত। এর বাইরে হালকা যানবাহন চালক, গৃহশ্রমিক, নিরাপত্তা প্রহরী, ইটভাটার শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশা চালক এমন কত ধরনের কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে শ্রমিকরা তার ইয়ত্তা নেই। মে দিবসে তাই আহ্বান কাজের স্বীকৃতি এবং কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করার পাশাপাশি ন্যায্য মজুরিও নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের জীবন নিরাপদ হলে, সমাজ হবে মানবিক ও গণতান্ত্রিক। শোষণের স্বরূপ উন্মোচন আর শ্রমিকদের সচেতন করে তুলতে মে দিবস বারবার আসে প্রেরণার উৎস হয়ে।
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

