মুক্ত সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ বছরের ইতিহাসে বর্তমানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে সাংবাদিকতা এখন কার্যত একটি ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন বৈশ্বিক ফেনোমেনন বা প্রপঞ্চে পরিণত হয়েছে।
১৮০টি দেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে দেখা গেছে, প্রথমবারের মতো অর্ধেকের বেশি দেশ ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করতে রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। সূচক অনুযায়ী, মাত্র ৭টি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ‘ভালো’ অবস্থায় রয়েছে, যার অধিকাংশই নর্ডিক দেশ। তালিকায় শীর্ষ তিনে রয়েছে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া। অন্যদিকে, ফ্রান্স রয়েছে ২৫তম স্থানে।
তালিকায় নাটকীয় পতন ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটি বর্তমানে ৬৪তম স্থানে রয়েছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অবনতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণকে এক ‘পদ্ধতিগত নীতি’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভ কভার করার সময় সালভাদোরান সাংবাদিক মারিও গেভারাকে আটক ও পরে বহিষ্কার এবং বিভিন্ন পাবলিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত করার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সংস্থাটির মতে, পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৭০ জন সরাসরি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর ইসরায়েলের এই লক্ষ্যভেদী আক্রমণ দেশটিকে সূচকের ১১৬তম স্থানে নামিয়ে দিয়েছে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার অবনতি হয়েছে চোখে পড়ার মতো। জাভিয়ের মিলে-র শাসনামলে দেশটি ৯৮তম স্থানে নেমে গেছে। এল সালভাদোর গত ১০ বছরে ১০৫ ধাপ পিছিয়ে বর্তমানে ১৪৩তম স্থানে রয়েছে। এশিয়ায় ভারত (১৫৭তম), তুরস্ক (১৬৩তম) এবং হংকং (১৪০তম)-এর মতো দেশগুলোতে সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও কারাদণ্ডের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়া (১৭২তম), মিশর (১৬৯তম) এবং ইরান (১৭৭তম) সূচকের একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে। আরএসএফ-এর সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে বলেন, “কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো এখন সরাসরি ও প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তারা প্রচলিত আইন এবং জরুরি অবস্থাকালীন বিধানগুলোকে অপব্যবহার করে সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে প্রচার করছে।”
প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই বৈশ্বিক পতনের পেছনে চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে স্বৈরশাসক ও অগণতান্ত্রিক সরকারগুলোর ক্ষমতায় টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারগুলো সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক, বৃহৎ করপোরেট ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলো যারা তাদের স্বার্থবিরোধী সংবাদ প্রকাশে বাধা দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গুজব ও ভুল তথ্যের আধিপত্য প্রকৃত সাংবাদিকতাকে কোণঠাসা করছে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার বিচার না হওয়া বা ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আন্তর্জাতিক আইনগুলো বর্তমানে লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং কার্যকর কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা সাংবাদিকদের পাশে নেই। অ্যান বোকান্দে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক সরকার ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নিষ্ক্রিয়তা প্রকারান্তরে এই দমন-পীড়নকে সমর্থন করারই নামান্তর। কর্তৃত্ববাদী শাসন বা সাংবাদিকতার এই পতন অনিবার্য নয়, যদি এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়।” সূচকের এই ফল নির্দেশ করছে যে, তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং সত্য প্রকাশ আজ বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে। সাংবাদিকতা যদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে থাকে, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়বে এবং জনস্বার্থ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

