সপ্তম পর্ব
১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনের পর সংগঠনের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছিল। নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে, কিন্তু সেই কমিটিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা ছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছিল। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাহমুদুর রহমান মান্নার নির্বাচন অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। তাঁকে নিয়ে কৌতূহল ছিল, সংশয়ও ছিল। তিনি কি সত্যিই ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল কর্মীদের মনে।
ঠিক এমন সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র—টিএসসিতে একটি কর্মীসভার আয়োজন করা হলো। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে এই সভার উদ্দেশ্য ছিল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা।
সকাল প্রায় দশটার দিকে টিএসসির মিলনায়তনে পৌঁছে দেখি, হলঘর ইতোমধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কর্মীরাই সংখ্যায় বেশি। বিভিন্ন হল থেকে, বিভিন্ন বিভাগ থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে জড়ো হয়েছেন। কেউ সামনের সারিতে বসেছেন, কেউ দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সবার চোখ মঞ্চের দিকে।
সভাপতির আসনে বসেছেন এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক।
তাঁর পাশে নতুন সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না।
কিন্তু মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আমার প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ল, তা হলো—অনেক পরিচিত সিনিয়র নেতা নেই।
যাঁদের ছাড়া এতদিন ছাত্রলীগের কোনো বড় সভা কল্পনাই করা যেত না, তাঁদের অনেকেই অনুপস্থিত।
আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছি, এমন সময় পাশে এসে বসল পলাশীর বাদল।
বাদলকে সবাই চিনত।
প্রায় প্রতিদিনই তাকে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবিতে দেখা যেত। সে সময় খদ্দরের পাঞ্জাবি ছাত্ররাজনীতিতে এক ধরনের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। বাদলের পোশাক-পরিচ্ছদেও সেই সরলতার ছাপ ছিল।
সে আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
—”অন্য নেতারা কোথায়?”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—”কার কথা বলছ?”
সে একে একে কয়েকটি নাম উচ্চারণ করল—
—”জিন্নাহ ভাই, আতাউর, সাইফুর রহমান, হাজারীবাগের রুহুল আমিন, দেলোয়ার ভাই… এদের তো কাউকে দেখছি না।”
আমি চারদিকে আরেকবার তাকালাম।
সত্যিই তো।
আমি নিজেও তাঁদের কাউকে দেখছি না।
মাত্র কয়েকদিন আগেই সম্মেলনের বিশাল আয়োজন সফল করতে তাঁরা দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। প্রস্তুতি কমিটি, সাংগঠনিক কাজ, কাউন্সিল—সবখানেই তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
অথচ আজ, নতুন কমিটির প্রথম বড় কর্মীসভায় তাঁরা কেউ নেই।
কেন নেই?
অভিমান?
রাজনৈতিক অসন্তোষ?
নাকি অন্য কোনো কারণ?
তখন উত্তর জানা ছিল না।
কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতি আমার মনেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর সভা শুরু হলো।
প্রথমে কয়েকজন নেতা সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখলেন।
তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম, কিন্তু পুরো হলঘর যেন অপেক্ষা করছিল একজন মানুষের জন্য।
নতুন সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না।
যখন তাঁর নাম ঘোষণা করা হলো, হলঘরে এক ধরনের নীরবতা নেমে এল।
মনে হলো, সবাই যেন একসঙ্গে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।
আমাদের সবার মনে তখন একই প্রশ্ন—
এই মানুষটি কী বলবেন?
তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
মাইক্রোফোনের সামনে এসে কিছুক্ষণ চারদিকে তাকালেন।
তারপর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন।
কোনো স্লোগান নয়।
কোনো উত্তেজনা নয়।
কোনো কৃত্রিম আবেগ নয়।
অসাধারণ সংযত ভঙ্গিতে তিনি কথা শুরু করলেন।
রাজনীতি নিয়ে বললেন।
সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে বললেন।
তারপর হঠাৎ ঈদের প্রসঙ্গ তুললেন।
বললেন, কয়েকদিনের মধ্যেই ঈদের ছুটি শুরু হবে। সবাই নিজ নিজ গ্রামে, পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন। কিন্তু শুধু উৎসব পালন করলেই হবে না; গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাদের সুখ-দুঃখ জানতে হবে, ছাত্রলীগের আদর্শ পৌঁছে দিতে হবে। ছুটিও যেন সংগঠনের কাজের একটি অংশ হয়ে ওঠে—এই আহ্বান তিনি এমন আন্তরিক ভাষায় জানালেন যে, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।
আমি আজও মনে করতে পারি, তাঁর বক্তৃতার প্রতিটি বাক্য ছিল অত্যন্ত পরিমিত।
কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই।
কোনো নাটকীয়তা নেই।
প্রতিটি বাক্য যেন ভেবেচিন্তে গাঁথা।
মনে হচ্ছিল, যেন ফুল দিয়ে একটি মালা গাঁথা হচ্ছে, আর সেই মালার প্রতিটি ফুলের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।
পুরো হলঘর নিস্তব্ধ।
কেউ কথা বলছে না।
কেউ নড়ছে না।
সবাই শুধু শুনছে।
আমি ছাত্রলীগের অনেক নেতার বক্তৃতা শুনেছি।
কেউ বজ্রকণ্ঠে কথা বলতেন।
কেউ স্লোগানে সভা মাতিয়ে তুলতেন।
কেউ আবেগ দিয়ে কর্মীদের উজ্জীবিত করতেন।
কিন্তু মান্না ভাইয়ের বক্তৃতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার।
তাঁর শক্তি ছিল ভাষায়।
তাঁর শক্তি ছিল যুক্তিতে।
তাঁর শক্তি ছিল উচ্চারণে।
আর ছিল এক অসাধারণ সৌজন্যবোধ।
তিনি বক্তৃতা করছিলেন না—মনে হচ্ছিল, আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
সেই প্রথম আমি উপলব্ধি করলাম, নেতৃত্বেরও নানা ধরন আছে।
সব নেতা একইভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করেন না।
কেউ স্লোগান দিয়ে, কেউ সংগ্রাম দিয়ে, আবার কেউ ভাষা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
সেদিন টিএসসির সেই সভায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, এই মানুষটির মধ্যে ভবিষ্যতের একজন বড় নেতার সম্ভাবনা রয়েছে।
সভা শেষ হওয়ার পর আমরা সবাই টিএসসির সবুজ লনে বেরিয়ে এলাম।
সেই সময় টিএসসির লন ছিল ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র।
মিটিং শেষ হলেই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলোচনা শুরু হতো।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ল।
যাঁরা এতদিন মান্না ভাইকে কিছুটা দূরত্বে রেখে চলছিলেন, তাঁরাও ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এগিয়ে যাচ্ছেন।
কেউ প্রশ্ন করছেন।
কেউ পরিচয় দিচ্ছেন।
কেউ ভবিষ্যতের সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছেন।
আমিও তাঁদের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম।
তিনি সবার কথা মন দিয়ে শুনছিলেন।
কাউকে তাড়াহুড়ো করে বিদায় দিচ্ছিলেন না।
প্রত্যেককে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন।
মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু একজন সাধারণ সম্পাদক নন; একজন মনোযোগী শ্রোতাও।
আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, অনেকের চোখে বিস্ময়।
যাঁরা সম্মেলনের পর তাঁকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁরাও যেন নতুন করে তাঁকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন।
রাজনীতিতে কখনও কখনও একটি বক্তৃতাই মানুষের ধারণা বদলে দেয়।
আমার কাছে মনে হয়েছিল, টিএসসির সেই কর্মীসভা ছিল ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত।
আমি নিজের মধ্যেও এক ধরনের পরিবর্তন অনুভব করছিলাম।
সম্মেলনের দিন যে মানুষটিকে আমি প্রায় চিনতামই না, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিতে শুরু করল।
সেদিন টিএসসির সবুজ লনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, মাহমুদুর রহমান মান্না শুধু ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েই থেমে থাকবেন না।
তাঁর ভাষা, তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর রাজনৈতিক উপস্থাপনা—এসব তাঁকে ছাত্রলীগের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
পরে ইতিহাস সাক্ষ্য দিয়েছে, আমার সেই ধারণা ভুল ছিল না।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাত্ররাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর বক্তৃতা শুনতে শুধু ছাত্রলীগের কর্মীরাই নয়, অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের কর্মীরাও আগ্রহ নিয়ে আসতেন।
তবে সেই উত্থানের গল্প, সেই জনপ্রিয়তার বিস্তার এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ছিল আরও দীর্ঘ ও নাটকীয়।
সেই গল্পই লিখব আগামী পর্বে।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

