১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনে আ ফ ম মাহবুবুল হক সভাপতি এবং মাহমুদুর রহমান মান্না সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর সংগঠনের নতুন পথচলা শুরু হলেও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠতে থাকে। স্বাধীনতার মাত্র দুই বছরের মাথায় মানুষের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আদর্শগত বিভাজন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন ধীরে ধীরে এক অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তখন সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করতে ব্যস্ত। জেলা, মহকুমা, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন একের পর এক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন কমিটি গঠন, কর্মীসভা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ—সব মিলিয়ে আমাদের দিন-রাত কেটে যাচ্ছিল সংগঠনের কাজেই।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল কঠিন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগ এবং মুজিববাদী ছাত্রলীগের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের খবর আসছিল। কোথাও মিছিল নিয়ে সংঘর্ষ, কোথাও ছাত্র সংসদ দখলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, আবার কোথাও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
অনেক সময় সকালবেলা যে খবর শুনতাম, সন্ধ্যার মধ্যেই জানতে পারতাম অন্য কোনো জেলায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকায় বসে আমরা যেন প্রতিদিনই জেলার খবরের অপেক্ষায় থাকতাম।
শুধু ছাত্রলীগ নয়, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদও তখন সারাদেশে ধারাবাহিকভাবে জনসভা করছে। জেলা থেকে জেলা, উপজেলা থেকে উপজেলা—যেখানেই তারা সভা করছে, সেখানেই বিপুল মানুষের উপস্থিতির খবর আসছিল।
সে সময় একটি পত্রিকার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম।
সেই পত্রিকার নাম গণকণ্ঠ।
সকালে পত্রিকা হাতে পেলেই প্রথমে চোখ চলে যেত জাসদের সভা-সমাবেশের খবরের দিকে।
প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও জনসভা, মিছিল, কিংবা রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংবাদ প্রকাশিত হতো। অনেক প্রতিবেদনে দেখা যেত, জাসদের সভায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও জাসদের কর্মীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
দেশের রাজনৈতিক সংঘাত যেন সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন নতুন নতুন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল।
সে সময় গণকণ্ঠের একটি বিষয় আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
জাসদের সভাপতি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর এম. এ. জলিল।
কিন্তু পত্রিকায় তাঁর নামের আগে “অবসরপ্রাপ্ত” শব্দটি ব্যবহার করা হতো না।
ফলে সাধারণ পাঠকের কাছে অনেক সময় এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারত যে তিনি যেন এখনও কর্মরত সামরিক কর্মকর্তা।
এটি সচেতন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত ছিল কি না, সে বিষয়ে আমার নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বিষয়টি আমাদের অনেকের মধ্যেই আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
গণকণ্ঠ তখন শুধু একটি সংবাদপত্র ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অন্যতম মুখপত্র।
এর সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ—বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর, যিনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
পত্রিকাটির আরেকটি বড় শক্তি ছিল এর লেখকগোষ্ঠী।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ ছফা, কবি দিলওয়ার, নির্মলেন্দু গুণ, রণেশ দাশগুপ্ত, আখলাকুর রহমান, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, মহাদেব সাহা, সমুদ্রগুপ্ত, মহিউদ্দিন আহমেদ—এমন অসংখ্য লেখকের প্রবন্ধ, কলাম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
তাঁদের লেখায় শুধু সরকারের সমালোচনা ছিল না; স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র কোন পথে এগোচ্ছে, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী, অর্থনৈতিক বৈষম্য কেন বাড়ছে, সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন কোথায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও উঠে আসত।
ক্রমশ তাঁদের অনেকেই নিজেদের লেখায় তৎকালীন সরকারকে “ফ্যাসিবাদী” বলে অভিহিত করতে শুরু করেন।
আমরা তরুণ কর্মীরা সেই লেখাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।
সব বক্তব্যের সঙ্গে যে সবসময় একমত হতাম, তা নয়। কিন্তু এসব লেখা আমাদের ভাবতে শিখিয়েছিল।
রাজনীতি শুধু মিছিল বা স্লোগানের বিষয় নয়—চিন্তারও বিষয়।
আমারও মাঝে-মধ্যে গণকণ্ঠ অফিসে যাওয়ার সুযোগ হতো।
তখন তাদের কার্যালয় ছিল ২৪/গ, টিপু সুলতান রোডে।
সেই অফিসে সবসময়ই এক ধরনের ব্যস্ততা বিরাজ করত। কেউ লেখা নিয়ে এসেছেন, কেউ খবর সংগ্রহ করছেন, কেউ ছাপাখানার কাজে ব্যস্ত।
১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় জাসদের নির্বাচনী পোস্টারও এই প্রেস থেকেই ছাপা হয়েছিল।
একদিন আমি পোস্টার আনতে গেলাম।
আমি অফিসে পৌঁছালে সিরাজুল আলম খান—যাঁকে আমরা সবাই স্নেহভরে “দাদা” বলেই ডাকতাম—নিজ হাতে আমার কাছে পোস্টারের একটি বড় প্যাকেট তুলে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটি হয়তো খুব ছোট।
কিন্তু আজও স্পষ্ট মনে আছে।
রাজনীতির ইতিহাসে বড় বড় ঘটনার পাশাপাশি এমন ছোট ছোট মুহূর্তও মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকে।
অনেক বছর পরে, ১৯৭৪ সালের ১৮ ই মার্চ, এই গণকণ্ঠ অফিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেটি ছিল আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।
সেই ঘটনার বিস্তারিত আমি পরে লিখব।
কারণ প্রতিটি ঘটনারই নিজস্ব প্রেক্ষাপট আছে, যা আলাদা করে বলার দাবি রাখে।
সেই সময় আমরা যারা ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম, তাদের জীবনটা ছিল অন্যরকম।
আজকের মতো পদ-পদবি নিয়ে এত হিসাব ছিল না।
কে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, কে সম্পাদক, কে সহ-সম্পাদক—এসব নিয়ে খুব একটা আলোচনা হতো না।
আমরা নিজেদের প্রথমে কর্মী, তারপর নেতা ভাবতাম।
আমাদের মধ্যে একটি শব্দ খুব জনপ্রিয় ছিল—
” ভাই ।”
পদবি ভুলে আমরা একে অপরকে ভাই বলেই ডাকতাম।
আমাদের সামনে একটাই স্বপ্ন ছিল—
সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমরা সংগঠনের কাজ করেছি।
কেউ ভাবিনি, ভবিষ্যতে কে মন্ত্রী হবে, কে সংসদ সদস্য হবে, কে বড় নেতা হবে।
সেসব চিন্তা তখন আমাদের মাথায়ই আসত না।
আমাদের কাছে রাজনীতি ছিল আদর্শের সংগ্রাম।
৪২ নম্বর বলাকা ভবনের অফিসে সন্ধ্যা নামলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে আসত।
বিকেল পাঁচটার পর থেকেই একে একে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করতেন।
কেউ জেলা থেকে ফিরেছেন, কেউ কোনো কলেজের সম্মেলন করে এসেছেন, কেউবা সারা দিন পোস্টার সেঁটে এখন একটু বিশ্রাম নিতে এসেছেন।
চায়ের কাপ হাতে চলত অন্তহীন আলোচনা।
কোথাও সংঘর্ষ হয়েছে।
কোথাও ছাত্র সংসদ নির্বাচন।
কোথাও নতুন কমিটি।
কোথাও আবার কোনো কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে।
প্রতিটি খবরই যেন আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে উঠত।
সন্ধ্যার পর অফিসের ছোট্ট ঘরটি ভরে যেত মানুষের কণ্ঠে।
ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, সিগারেটের ধোঁয়া, টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা সংবাদপত্র, দেয়ালে এই তো বাংলাদেশ নামে বিভিন্ন পত্রিকার নিউজ কাটিং ছবি, আর একের পর এক রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে বলাকা ভবনের সেই সন্ধ্যাগুলো আজও আমার চোখে ভাসে।
ঠিক এমনই এক সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় অফিস থেকে খবর পেলাম ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র—টিএসসিতে ছাত্রলীগের একটি কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হবে।
নতুন সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না সেই সভায় প্রথমবারের মতো কর্মীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সবাইকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হলো।
ঈদের আগের সময়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তখন উৎসবের আমেজও রয়েছে, আবার রাজনীতির উত্তাপও কম নয়।
আমাদের মধ্যেও এক ধরনের কৌতূহল কাজ করছিল।
সম্মেলনের পর নতুন সাধারণ সম্পাদককে আমরা অফিসে দেখেছি, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁর ভদ্র ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করেছে।
কিন্তু বড় কর্মীসমাবেশে তিনি কী বলবেন?
কীভাবে কর্মীদের সামনে নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা তুলে ধরবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমিও অধীর আগ্রহে সেই কর্মীসভার অপেক্ষা করতে লাগলাম।
সেদিন আমরা কেউ বুঝতে পারিনি, টিএসসির সেই কর্মীসভা শুধু একটি সাংগঠনিক সভাই হবে না; বরং ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বকে কাছ থেকে দেখার এবং একটি পরিবর্তনশীল সময়কে বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

