আটলান্টিকে প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাস, কতটা বিপজ্জনক

আটলান্টিক মহাসাগরে ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ নামে একটি প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি বলছে, এখন পর্যন্ত একজনের শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং আরও পাঁচজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। জাহাজটি আর্জেন্টিনা থেকে কেপ ভার্দে যাচ্ছিল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে, সন্দেহভাজন এই আক্রান্তদের বিষয়ে ‘বিস্তারিত অনুসন্ধান’ চলছে এবং বর্তমানে তাঁদের নমুনা গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

হান্টাভাইরাস কী?

হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরবাহিত ভাইরাসের নাম। সাধারণত ইঁদুরের শুকিয়ে যাওয়া বিষ্ঠা থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণা নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশের মাধ্যমে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্যমতে, ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা বা লালা থেকে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিরল হলেও ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও এটি ছড়াতে পারে।

এই ভাইরাস থেকে দুটি মারাত্মক রোগ হতে পারে। প্রথমটি হলো ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস)। এর প্রাথমিক উপসর্গ হলো ক্লান্তি, জ্বর ও পেশিতে ব্যথা। পরবর্তীকালে মাথাব্যথা, ঝিমুনি, শরীরে কাঁপুনি ও পেটের সমস্যা দেখা দেয়। আর শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিলে এই রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।

দ্বিতীয়টি হলো ‘হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম’ (এইচএফআরএস)। এটি আরও বেশি গুরুতর এবং মূলত কিডনিকে আক্রান্ত করে। এর উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং আকস্মিক কিডনি অচল হয়ে যাওয়া।

বিশ্বজুড়ে হান্টাভাইরাস

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এইচএফআরএসে আক্রান্ত হন। এর বেশির ভাগই ইউরোপ ও এশিয়ার। মোট আক্রান্তের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত হয় চীনে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ৮৯০ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ‘সিউল ভাইরাস’ নামের হান্টাভাইরাসের একটি অন্যতম ধরন বিশ্বজুড়েই বিদ্যমান, যা মূলত ‘নরওয়ে র‍্যাট’ বা বাদামি ইঁদুর বহন করে।

হান্টাভাইরাসের চিকিৎসা

হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণ অনুযায়ী ‘সাপোর্টিভ কেয়ার’ বা অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডায়ালাইসিসের মতো আনুষঙ্গিক চিকিৎসার পরামর্শ দেয় সিডিসি।

গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে রোগীদের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসও দিতে হয়।

ভাইরাসের সংস্পর্শ এড়াতে বাড়ি বা কর্মস্থল থেকে ইঁদুর দূর করার পরামর্শ দিয়েছে সিডিসি। এ ছাড়া বাড়ির বেসমেন্ট বা চিলেকোঠায় ইঁদুর ঢোকার পথগুলো বন্ধ করারও সুপারিশ করা হয়েছে। ইঁদুরের বিষ্ঠা পরিষ্কারের সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিতে হবে, যাতে দূষিত বাতাস নিশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে না যায়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হান্টাভাইরাসজনিত শ্বাসকষ্টে মারা যান অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া। তদন্তকারীদের ধারণা, আরাকাওয়া এইচপিএসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রে হান্টাভাইরাসের সবচেয়ে পরিচিত ধরন। যে বাড়িতে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল, সেখানকার বাইরের একটি ঘরে ইঁদুরের বাসা ও কিছু মৃত ইঁদুর পাওয়া যায়। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে বেশ কয়েক দিন আরাকাওয়া ইন্টারনেটে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিডের উপসর্গ নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.