ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনাপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনও সমানভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা দুই ধাপে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগোনোর পথ তৈরি করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই মুহূর্তটি কি সত্যিই শেষ সুযোগ, নাকি ইতিহাসের মতো এখানেও আরও বিকল্প পথ খোলা রয়েছে?
প্রথমত, এই আলোচনার কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সূচনা বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৪৫ দিনের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি, তার সঙ্গে চলমান আলোচনা, এবং পরবর্তীতে একটি চূড়ান্ত চুক্তির পরিকল্পনা—এই পুরো প্রক্রিয়া মূলত “স্টেপ-বাই-স্টেপ ডি-এস্কেলেশন” কৌশলের অংশ। ইতিহাসে আমরা বহুবার দেখেছি, সরাসরি শান্তি চুক্তির চেয়ে এ ধরনের ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে যখন পক্ষগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাস বিরাজ করে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই সংঘাতের চরিত্র আগের অনেক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের চেয়ে জটিল। এখানে কেবল তিনটি রাষ্ট্রের সরাসরি সংঘর্ষ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বৈশ্বিক উদ্বেগ। হরমুজ প্রণালির প্রশ্নটি যেমন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। ফলে এই আলোচনার সফলতা বা ব্যর্থতা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা। পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ক—এই তিনটি দেশের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একটি নিয়ন্ত্রিত সমাধান চায়। এই ধরনের “মাল্টি-লেভেল মিডিয়েশন” অনেক সময় আলোচনাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, কারণ এতে সরাসরি বিরোধী পক্ষগুলোর ওপর চাপ কমে এবং বিকল্প যোগাযোগের পথ তৈরি হয়। একই সঙ্গে, পর্দার আড়ালে বার্তা আদান-প্রদানের যে প্রক্রিয়া চলছে, তা সংকট ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে দেওয়া আল্টিমেটাম, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ ধরনের প্রকাশ্য চাপ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে, কারণ এটি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলে এবং আপসের সুযোগ সংকুচিত করে। ইরানের মতো একটি রাষ্ট্র, যা দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে রয়েছে, তারা সহজে এমন অবস্থায় নতি স্বীকার করবে—এমনটা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়।
ইরানের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা মূলত “বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা” চাইছে। গাজা বা লেবাননের উদাহরণ টেনে তারা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা অমূলক নয়। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির পরও আংশিক বা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা অব্যাহত থেকেছে, যা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে ইরান এমন একটি কাঠামো চাইছে, যেখানে শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিস্থিতি কি সত্যিই “শেষ সুযোগ”? বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সংঘাতের তীব্রতা এবং দ্রুত বিস্তারের সম্ভাবনা বিবেচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ, যদি এই আলোচনাও ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপ হতে পারে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধ, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে যদি সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বাধাগ্রস্ত হয় বা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তবে ইতিহাস আমাদের বলে, “শেষ সুযোগ” বলে কোনো স্থায়ী ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব কমই সত্য হয়। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বহুবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে মনে হয়েছিল যুদ্ধ অনিবার্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথই প্রাধান্য পেয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যেও বিভিন্ন সময় চরম উত্তেজনার পর নতুন করে আলোচনার দ্বার খুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বর্তমান উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সুযোগ নয়। বরং এটি একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত, যেখানে সফল হলে সংঘাতের গতিপথ পাল্টে যেতে পারে, আর ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে—কিন্তু কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আলোচনার ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করছে পক্ষগুলোর “পলিটিক্যাল উইল”-এর ওপর। যদি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপকে অতিক্রম করে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে এই উদ্যোগ সফল হতে পারে। কিন্তু যদি তারা কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে আপস এড়িয়ে যায়, তাহলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এছাড়া আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ, ভবিষ্যতে নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রাথমিক আলোচনায় ব্যর্থতার পর তৃতীয় পক্ষের আরও শক্তিশালী হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে নতুন করে গতি দেয়।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি একটি “ক্রিটিক্যাল উইন্ডো”—যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। এটি হয়তো শেষ সুযোগ নয়, কিন্তু এটি একটি উচ্চঝুঁকির সুযোগ, যেখানে সফলতা বড় ধরনের স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে, আর ব্যর্থতা সংঘাতকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।
অতএব, একে চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে না দেখে বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পথ কখনো একটিই থাকে না—বরং প্রতিটি ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই নতুন আলোচনার সম্ভাবনা জন্ম নেয়। তবে সেই নতুন সুযোগগুলো সাধারণত আরও কঠিন, আরও ব্যয়বহুল এবং আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে—যা এড়িয়ে যাওয়াই সবার জন্য শ্রেয়।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

