গার দু নর্দ (Gare du Nord অথবা উত্তরের রেলস্টেশন), ইউরোপের ব্যস্ততম রেলস্টেশন। প্যারিসে যারা আসেন বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্রেনে ভ্রমণ করেন, তাদের অনেকের পথই একবার হলেও পড়ে এই গার দু নর্দ স্টেশনটি। এটি শুধু একটি স্টেশন নয়; প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস, স্থাপত্য, এবং ইউরোপের রেল যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৮৪৬ সালে প্রথমবার গার দু নর্দ চালু হয়। তখন এটি পরিচালনা করত Compagnie des chemins de fer du Nord নামে একটি কোম্পানি এবং মূলত প্যারিস থেকে উত্তর ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় স্টেশনটি ১৮৬১–১৮৬৪ সালের মধ্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়। নতুন ভবনের স্থপতি ছিলেন জ্যাক ইগনেস হিটরফ (Jacques Ignace Hittorff)। ভবনের সামনের অংশে ইউরোপের বিভিন্ন বড় শহরের প্রতীকী মূর্তি বসানো হয়—যা স্টেশনের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে বোঝায়।
আজ এটি ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি SNCF দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিদিন কয়েক লক্ষ মানুষ এখানে যাতায়াত করে।

🚆 কোন ট্রেন লাইন কখন চালু হয়েছে:
১৮৪৬ – প্যারিস থেকে লিল (Lille) লাইনের মাধ্যমে স্টেশন উদ্বোধন
১৮৪৮ – প্যারিস– কালে (Calais) রুট চালু (ইংল্যান্ডের সাথে দ্রুত যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ)
১৯০৪ – মেট্রো লাইন ৪ চালু হয়
১৯০৭ – মেট্রো লাইন ৫ যুক্ত করা হয়
১৯৮১ – RER B লাইন গার দু নর্দ দিয়ে চলাচল শুরু
১৯৮৭ – RER D যুক্ত হয়
১৯৯৩ – LGV Nord হাই-স্পিড লাইনের মাধ্যমে TGV উত্তর ফ্রান্সে দ্রুত চলাচল শুরু
১৯৯৪ – চ্যানেল টানেল (ইউরো টানেল) খোলার পর Eurostar ট্রেন চালু হয় (প্যারিস–লন্ডন)
১৯৯৬ – Thalys হাই-স্পিড ট্রেন চালু হয় (প্যারিস–ব্রাসেলস–আমস্টারডাম)

একটি মজার ঘটনা:
১৯৯৪ সালে যখন প্রথম Eurostar ট্রেন চালু হয়, তখন অনেক যাত্রী বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে সমুদ্রের নিচ দিয়ে ট্রেনে করে লন্ডন যাওয়া সম্ভব! সেই সময় সংবাদপত্রগুলো লিখেছিল—
“প্যারিস থেকে লন্ডন এখন আর দূরের শহর নয়, এটি সকালের কফির মতোই সহজ।”
আরেকটি ফরাসি সংবাদপত্র লিখেছিল—
“আগে লন্ডন ছিল সমুদ্রের ওপারের শহর, এখন এটি প্যারিসের প্রতিবেশী।”

✨ কিছু চমকপ্রদ তথ্য:
• এটি ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলোর একটি, বছরে প্রায় ২৫ কোটির বেশি যাত্রী এই রেলস্টেশন ব্যবহার করে।
• স্টেশন ভবনের সম্মুখভাগে মোট ২৩টি বড় ভাস্কর্য রয়েছে, যা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। উপরের বড় ভাস্কর্যগুলো লন্ডন, বার্লিন, ব্রাসেলস ও আমস্টারডামের মতো শহরের প্রতিনিধিত্ব করে যা এই স্টেশনের আন্তর্জাতিক চরিত্র তুলে ধরে। আর নিচের ছোট মূর্তিগুলো ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন- লিল, কালে ইত্যাদি।
• এখানে থেকেই সরাসরি যুক্তরাজ্যে যাওয়ার ট্রেন ছাড়ে। তাই স্টেশনের ভেতরেই UK border control থাকে—যা ইউরোপে খুব কম স্টেশনেই দেখা যায়। প্যারিস থেকে লন্ডনে ট্রেনে যেতে এখন সময় লাগে প্রায় ২ ঘন্টা ১৫ মিনিট।
• বহু সিনেমা ও ডকুমেন্টারিতে এই স্টেশন দেখা গেছে। বিশেষ করে প্যারিসভিত্তিক অনেক চলচ্চিত্রে গার দু নর্দ একটি পরিচিত দৃশ্য।
• ভূগর্ভস্থ এক ছোট শহর: স্টেশনের নিচে রয়েছে বিশাল মেট্রো ও RER নেটওয়ার্ক—যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ট্রেন বদল করে।

ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যা সামাল দিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে Gare du Nord আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন অবকাঠামো ও উন্নত সুবিধা যুক্ত হলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় আন্তর্জাতিক পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাকিবুল ইসলাম, ভ্রমণ লেখক ও শুদ্ধস্বর ডটকমের ফ্রান্স প্রতিনিধি।

