হরমুজ প্রণালী সচল রাখতে নৌ-জোট, ট্রাম্পের প্রস্তাবে প্রবল অনিহা আমেরিকার ‘বন্ধু’দেরই

 চাপ বাড়াতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে। বিভিন্ন দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি সঙ্কটে। এই অবস্থায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি আন্তর্জাতিক নৌ নিরাপত্তা জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।  এই জোটের কাজ হবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।

ট্রাম্পের যুক্তি, উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর উচিত এই নৌপথের নিরাপত্তা বিধানে সহায়তা করা। এর পুরো বোঝা কেবল আমেরিকার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের একটি জোট গঠন করা এবং তাকে কার্যকর করে তোলা – শুনতে যতটা সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল।

 

ট্রাম্পের প্রস্তাব
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যেসব দেশকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জ্বালানি আমদানিকারক অন্যান্য প্রধান রাষ্ট্র সমুহ।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুক্তিটি বেশ সরল: এই দেশগুলোর অর্থনীতির একটি বড় অংশ উপসাগরীয় পথ দিয়ে পরিবাহিত তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই এই নৌপথটি উন্মুক্ত রাখার স্বার্থে তাদেরও সামরিকভাবে উদ্যোগী হওয়া উচিত। এই পরিকল্পনার আওতায় নৌবাহিনীর জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে, যাতে কোনও ধরনের হামলা বা বাধার সৃষ্টি না হয়।

এর কোনও পূর্বনজির আছে ?
হ্যাঁ, অতীতেও এ ধরনের বহু-রাষ্ট্রীয় নৌ-অভিযানের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

২০১৯ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলের পথগুলোতে টহল দেওয়া এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে চালু হয়েছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম সিকিউরিটি কনস্ট্রাক্ট’। এ ধরনের অভিযানে মূলত সাধারণত নৌ-টহল, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকির মুখে জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া এবং সম্ভাব্য হুঁশিয়ারির ওপর নজরদারি অন্তর্ভুক্ত।

তবে, এই অভিযানগুলো সফলভাবে পরিচালনার জন্য অংশগ্রহণকারী নৌবাহিনীগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা খুবই জরুরি।

দেশগুলো কেন দ্বিধাগ্রস্ত ?
ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনের ‘বন্ধু’ দেশগুলো বেশ সতর্ক হয়েই প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।

বেশ কয়েকটি দেশের সরকার হয় তাদের অনিচ্ছার ইঙ্গিত দিয়েছে, অথবা তারা এখনও বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করে দেখছে। ইউরোপের কিছু দেশ কেবল প্রতিরক্ষামূলক মিশনে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছে। অন্যদিকে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে অন্য দেশগুলো এখনও সন্দিহান।

উদাহরণস্বরূপ, জাপান জানিয়েছে যে তারা এখনও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে। সেখানে কোনও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়ে তারা এখনও চূড়ান্ত কোনও প্রতিশ্রুতি দেয়নি। পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, টোকিও সেখানে নৌবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি “আপাতত বিবেচনা করছে না”।

অস্ট্রেলিয়াও আপাতত ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাথরিন কিং ‘অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’-কে জানান যে, গোটা বিশ্বে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রণালীটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ক্যানবেরা সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও অনুরোধ পায়নি। বর্তমান পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়া এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছে না।

এদিকে ব্রিটেন সরকার জানিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত রবিবার ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং ওই নৌপথটি পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ বসে সাংবাদিকদের জানান যে, স্টারমার শুরুতে ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীগুলোকে “বিপদের মুখে” ঠেলে দিতে চান না।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে যে, তারা এই অনুরোধ পর্যালোচনা করে দেখছে। তারা আরও উল্লেখ করা হয় যে, ট্রাম্পের এই আহ্বানকে তারা “গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে” এবং আমেরিকার সঙ্গে “ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সতর্ক পর্যালোচনার” মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।

অনেক দেশই আশঙ্কা করছে যে, যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হলে তারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ‘বন্ধু’দেশগুলোর এই সতর্ক অবস্থান ট্রাম্পের মনঃপুত হয়নি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো)-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায় সহায়তা না করে, তবে ওই সংস্থার ভবিষ্যৎ “অত্যন্ত খারাপ” হতে পারে।

সামরিক চ্যালেঞ্জসমূহ
এমনকী যদি একটি জোট গঠন করাও সম্ভব হয়, তবুও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

শুরুতেই যে সমস্যাটি সামনে এসেছে, তা হল এর ভৌগোলিক অবস্থান। এই প্রণালীটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। ফলে এখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-মাইন এবং ছোট ও দ্রুতগতিসম্পন্ন আক্রমণকারী নৌকার হামলার মুখে অত্যন্ত অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে।

এই প্রণালীতে পাল্টা আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা, ‘বন্ধু’দেশগুলো বুঝতে পারলেও আমেরিকা তা আঁচ করতে পারেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘অপ্রতিসম নৌ-যুদ্ধ’-র জন্য ইরান দীর্ঘকাল ধরে প্রস্তুতিবদ্ধ। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তাদের কাছে রয়েছে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট ছোট নৌকার সাহায্যে একযোগে আক্রমণ চালানোর কৌশল, নৌ-মাইন এবং ড্রোন। এর অর্থ হলো, জ্বালানি ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন হবে সার্বক্ষণের নজরদারি এবং বিপুল সংখ্যক নৌ-সেনা ও যুদ্ধজাহাজের মোতায়েন। যদি জোটভুক্ত যুদ্ধজাহাজগুলো সরাসরি ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা দ্রুতই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনও তাৎক্ষণিক সামরিক কর্মপরিকল্পনা না হয়ে বরং আংশিকভাবে একটি কৌশলগত বার্তা মাত্র। বিশ্লেষকরা জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মূলত ‘বন্ধু’দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়ভার ভাগ করে নেওয়ার উপর চাপ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে নিবৃত্ত করার এবং বিশ্বে জ্বালানি বাজারগুলোকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন।

তবে সমালোচকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থনবিহীন কোনও জোটের পক্ষে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা কিংবা কার্যকারিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হল, চীন বা ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলো যদি এই উদ্যোগে অংশ নিতে অস্বীকার করে, তবে এই অভিযানটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা এই জোটের প্রকৃত বহুমুখী প্রচেষ্টার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from শুদ্ধস্বর ডটকম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading