অধ্যাদেশগুলোর পরিণতি কী ?

আন্দোলন ছাড়া অভ্যুত্থান হয় না, এটা যেমন সত্য, তেমনি আবার সব আন্দোলনই কিন্তু অভ্যুত্থানে পরিণত হয় না সে কথাটাও প্রমাণিত। ২০০৮ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করেছে। এরপর তিনটি নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। এই সময়কালে আওয়ামী লীগের শাসন যেমন ছিল, তেমনি তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও ছিল। এই সব আন্দোলনে উচ্চারিত মানুষের আকাক্সক্ষা এবং আওয়ামী লীগের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হয়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল ২০২৪ সালে। অভ্যুত্থানের পর পুরনো নিয়মে দেশ চলবে না এই আশা ছিল মানুষের মধ্যে। মানুষের প্রত্যাশা নিজের জন্য বেশি ছিল না বরং চেয়েছিল, দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ও জবাবদিহিমূলক সরকার থাকবে, অতীতের দমনমূলক আইনগুলো বাতিল হবে, পুলিশ এবং প্রশাসন নিপীড়ন চালাবে না, রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা করবে, অর্থনীতিতে লুটপাট, দুর্নীতির অবসানের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হবে আর মানুষ বৈষম্যের বেদনা থেকে মুক্তির পথে যাত্রা করবে। ফলে দরকার ছিল নতুন ঘোষণার। আইন করতে প্রয়োজন সংসদের। কিন্তু সংসদ তো নেই, তাহলে কাজ চলবে কীভাবে? প্রথম পর্যায়ে দেশের মানুষ ভেবেছে, নতুন নতুন অধ্যাদেশ জারি করেই অন্তর্বর্তী সরকার সংসদবিহীন সময়ে কাজ চালাবে। হয়েছেও তাই। কিন্তু সরকারের মনে হয় অধ্যাদেশ জারি করার নেশায় পেয়ে গিয়েছিল। তারা ৫৫৯ দিন দায়িত্ব পালনকালে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেন। সে হিসাবে গড়ে ৪.২০ দিনে একটি করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয় সংসদে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন বসার এক মাসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে হয়। এই নিয়ম মানতে হলে, বর্তমান সরকারকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চারটি করে অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে অনেক অধ্যাদেশ জারি এবং দু-একজন উপদেষ্টার বিশেষ তৎপরতায় কয়েকটি অধ্যাদেশ জারির কথা প্রচারিত আছে। ফলে এসব যাচাই-বাছাই করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কী হবে এসব অধ্যাদেশের?

আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম দেড় মাসে, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সরকার ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দেড় দিনের কম সময়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে জারি হয়েছিল ৮০টি অধ্যাদেশ; অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য সময় লেগেছিল সাড়ে ৪ দিনের মতো। আর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জারি হয়েছিল ১৭টি অধ্যাদেশ। প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়পড়তা সময় লেগেছিল ৯ দিনের মতো। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সময় যত গড়িয়েছে ততই দ্রুত অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, যাওয়ার আগে অধ্যাদেশ জারির এত তাড়া কেন ছিল? তারা কি জানতেন না এসব আইনে পরিণত করতে হলে প্রক্রিয়াটা কি? প্রতিটি অধ্যাদেশের প্রারম্ভে যা লেখা আছে, তা হলো সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশগুলো জারি করেছেন। কী আছে ৯৩ অনুচ্ছেদে? সেখানে বলা আছে, সংসদ অধিবেশনে না থাকলে অথবা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় ‘যদিৃ রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলেৃ তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন।’ এর অর্থ, স্পষ্টতই রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩ বার ‘আশু ব্যবস্থা’ গ্রহণের প্রয়োজন ‘উপলব্ধি’ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতির কি সেই উপলব্ধি করার মানসিকতা ও ক্ষমতা ছিল?

এ কথা কে না জানে ‘উপলব্ধিটা’ হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর এবং তাদের পরামর্শক্রমেই এই অধ্যাদেশ জারির বন্যা এসেছিল। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার আর নেই। তাহলে অধ্যাদেশগুলোর কী হবে? এখন কি যাচাই করে দেখা হবে, এগুলোর আসলেই কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা? প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি ‘অপ্রয়োজনীয়’ মনে হয় তাহলে এর দায় কে নেবে? আর প্রয়োজনীয় হলে, এর ধারাবাহিকতা কীভাবে রক্ষিত হবে? যে সংবিধানের আলোকে অধ্যাদেশ আইন হবে, সংবিধানের সেই ৯৩ অনুচ্ছেদটি খুব সহজ নয়। প্রথমত, রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলেও ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির জন্য তিন-তিনটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। সেগুলো হলো (ক) সংসদ যে আইন সংবিধান অনুযায়ী প্রণয়ন করতে পারে না, সেই রকম আইন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশরূপে জারি করতে পারবেন না; (খ) অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধানকে সংশোধন অথবা বিলুপ্ত করা যাবে না। যেমন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবে না এমন অধাদেশ জারি করা যাবে না; (গ) পূর্বের অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বহাল বা চলমান রাখার জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন না। এই বিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ধরে নেওয়া যাক, প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনোটিই সীমা লঙ্ঘন করেনি অথবা কিছু অধ্যাদেশ এই সীমা লঙ্ঘন করেছে। তাহলে এই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে কিছু কার্যক্রম, পদক্ষেপ, নিয়োগ বা পুরনো কোনো কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। এখন এই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে, এসব অধ্যাদেশের অধীনে সূচিত বা গৃহীত কার্যক্রমের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে জটিলতার অবসান হবে কীভাবে? সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হবে ৯৩ অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ (২) নিয়ে। যখন সংসদ অধিবেশন থাকে না অথবা ভেঙে দেওয়া হয়, শুধু তখনই রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। আগামী ১২ মার্চ নতুন বা ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। উপ-অনুচ্ছেদ (২)-এর নির্দেশনা হলো সংসদ অধিবেশন বসার প্রথম দিনই জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। সেই অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশের সব কটি বিবেচনার জন্য ১২ মার্চ সংসদে উপস্থাপিত হবে। তখন কী হবে? উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী সংসদের জন্য তিনটি রাস্তা খোলা আছে। প্রথমত উপস্থাপনের দিনই সংসদ সব অধ্যাদেশ একযোগেই বাতিল করতে পারে। যদি প্রথম দিনই বাতিল না করা হয় তাহলে সংসদের দ্বিতীয় করণীয় হলো ক্রমান্বয়ে, যেমন প্রথম দিন ৫টি; তার দু-তিন দিন পর আরও ১০টি এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরও ২০টি এভাবেও অধ্যাদেশগুলো বাতিল করতে পারে। কিন্তু যদি অধ্যাদেশগুলো প্রথম দিনে অথবা ক্রমান্বয়ে বাতিল না করা হয় বা কয়েকটি বাতিল হয় আর কয়েকটি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তই না নেওয়া হয়, তাহলে কী হবে?

তাহলে উপ-অনুচ্ছেদ (২) অনুযায়ী প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় যেগুলো বাতিল হবে আর যেগুলোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নেওয়া হবে না, তার সব কটি অধ্যাদেশেরই ‘কার্যকারিতা লোপ পাইবে’। সোজা কথায়, সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মাথায় সব অধ্যাদেশই প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নির্বিশেষে মৃত্যুবরণ করবে। নতুন সংসদ তাহলে কী করবে? নতুন সংসদ হয়তো চাইবে কিছু অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বহাল থাকুক। যে অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা বহাল রাখা হবে সেগুলোকে নতুন করে সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন আইন হিসেবে সংসদকে পাস করতে হবে। আইন প্রণয়নের কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্বারা আইনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে সারসংক্ষেপটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন এবং মন্ত্রিপরিষদ কর্র্তৃক অনুমোদন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আইনটির খসড়া প্রস্তুত করবে এবং খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় পেশ করা হবে। মন্ত্রিপরিষদের খসড়া অনুমোদনের পর, প্রয়োজনে ভাষা, ব্যাকরণ ইত্যাদি ঘষামাজা করে বিল হিসেবে ছাপার জন্য সরকারি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে এবং ছাপা কপি সংসদে উপস্থাপনের আগে সব সংসদ সদস্যের কাছে পাঠানো হবে। এরপর নির্দিষ্ট দিনে সংসদে বিবেচনার জন্য বিলটি উপস্থাপন করা হবে। সংসদে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের কয়েকটি ধাপ আছে, এসব ধাপ পেরিয়ে সংসদে বিলটি পাস হলে, তা পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইন হিসেবে এটি গণ্য হবে এবং জনগণ তখন সেই আইন মানতে বাধ্য থাকবেন। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো ভেবেছিল, অধ্যাদেশ জারি করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের জানা দরকার ছিল অধ্যাদেশ হয় স্বল্পমেয়াদি।

একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর, অর্থাৎ পরবর্তী সংসদের অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে, সব অধ্যাদেশই বিলোপ হয়ে যায়। এ কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা কোনো বিচারেই কার্যকর ব্যবস্থা নয়। ফলে জটিলতার পুনঃআবর্তন হবে এখন। কারণ জারি করা অধ্যাদেশগুলোর অধীন কিছু কার্যক্রম, পদক্ষেপ, নিয়োগ বা পুরনো কোনো কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে, এসব অধ্যাদেশের অধীনে সূচিত বা গৃহীত কার্যক্রমের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে সংকট কি তৈরি হবে না? এক্ষেত্রে অতীতের উদাহরণ মনে করা যেতে পারে। এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জারি করা ৫৯৫টি অধ্যাদেশকে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করে যে অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছিল, সেগুলো সংবিধানবিরোধী। কিন্তু রাষ্ট্র তো আইন শূন্য থাকতে পারে না। তাই রাষ্ট্রীয় শূন্যতা এড়াতে আদালত কিছু ক্ষেত্রে অতীতের সমাপ্ত ও চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন কার্যক্রম নীতির আওতায় আগের কার্যক্রম বহাল রেখেছিল। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদে ১২২টি অধ্যাদেশকেই একসঙ্গে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছিল। সেই পথেই যদি হাঁটে বর্তমান সরকার তাহলেও নিশ্চিত যে, অনেক অধ্যাদেশের অপমৃত্যু ঘটবে আর জটিলতার আবর্তে ঘুরতে থাকবে দেশ।

রাজেকুজ্জামান রতন

লেখক এবং কলামিস্ট ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.