দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি আবারও অস্থিরতার এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত সংঘর্ষ নয়; এটি একটি জটিল ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, আদর্শিক টানাপোড়েন, এবং কৌশলগত ব্যর্থতার বহুমাত্রিক ফলাফল। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানের নঙ্গরহার ও পকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমানহানার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। ডুরান্ড লাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কামান, মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার এবং সাঁজোয়া যান নিয়ে উভয় পক্ষের সম্মুখসমর কার্যত পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের রূপ নেয়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মহম্মদ আসিফ ঘোষণা করেন, ‘অপারেশন গজ়ব লিল হক’ তালিবানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। এই ঘোষণা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
২০২৬ সালের Global Firepower সূচক অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতায় পাকিস্তান বিশ্বের ১৪তম স্থানে, যেখানে তালিবান-শাসিত আফগানিস্তান ১২১তম। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সংখ্যাগত শক্তি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই চূড়ান্ত নির্ধারক নয়। আফগানিস্তান গত দুই শতকে ইংল্যান্ড , রাশিয়া এবং আমেরিকা এই তিন পরাশক্তিকেই সামরিকভাবে ব্যর্থতার মুখে ফেলেছে।
আমেরিকার Boston University-এর গবেষক Ivan Arreguín-Toft তাঁর বই How the Weak Win Wars-এ ‘অসম যুদ্ধ’-এর তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, দুর্বল পক্ষ যদি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা কৌশল ও ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগাতে পারে, তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলতে সক্ষম হয়। পাকিস্তান ও আফগান তালিবানের সংঘাত সেই তত্ত্বেরই সমসাময়িক প্রতিফলন। পাকিস্তানের সামরিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সমতল ও মরু সীমান্তে যান্ত্রিক যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতমালার দুর্গম গিরিপথে সেই কৌশল অকার্যকর হয়ে পড়ে।
পাকিস্তান আকাশপথে অভিযানে নির্ভর করছে General Dynamics নির্মিত F-16 ব্লক ৫১ প্লাস এবং Chengdu Aircraft Corporation নির্মিত JF-17 যুদ্ধবিমানের উপর। কিন্তু আফগানিস্তানের পাহাড়ি গুহা ও প্রাকৃতিক বাঙ্কার কাঠামো আকাশ হামলার কার্যকারিতা সীমিত করে দেয়। RAND Corporation-এর বিশ্লেষক Benjamin Lambeth তাঁর বই Air Power Against Terror-এ উল্লেখ করেছেন, প্রতিকূল ভূপ্রকৃতিতে কেবল আকাশশক্তি দিয়ে টেকসই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কঠিন।
এই সংঘাতের পেছনে কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, আদর্শিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বও রয়েছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে আফগান ভূখণ্ডকে কৌশলগত ‘গভীরতা’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর ইসলামাবাদের প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে বলে ইসলামাবাদের অভিযোগ। তালিবান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করলেও বাস্তবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নবিদ্ধ।
দুই ইসলামী রাষ্ট্রের এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বহুমাত্রিক হুমকি তৈরি করছে। প্রথমত, সীমান্ত অস্থিরতা শরণার্থী স্রোত বাড়াতে পারে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলি সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটাতে পারে। তৃতীয়ত, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ প্রকল্পগুলি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। এর প্রভাব পড়বে গোটা অঞ্চলের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশে।
ভারত, ইরান, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—সবাই এই সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ আফগানিস্তান দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল। এখানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে তা সীমান্ত পেরিয়ে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও সামরিক ব্যয়ের চাপ বাড়বে, যা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে। ইতিমধ্যেই মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটিকে নাজুক অবস্থায় রেখেছে।
সমাধানের পথ কী ? প্রথমত, কূটনৈতিক সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। কাতার, চীন বা তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশকে সামনে এনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতা গড়ে তোলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যৌথ সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে টিটিপি বা অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি দুই দেশের মধ্যে বিভেদ উসকে দিতে না পারে। তৃতীয়ত, ডুরান্ড লাইনের বিতর্কিত অংশে উন্নয়ন প্রকল্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে সীমান্ত অঞ্চল কেবল সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক ফোরাম—যেমন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা—কে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত সংযোগ জোরদার হলে যুদ্ধের প্রণোদনা কমে। পঞ্চমত, উভয় দেশকে বুঝতে হবে যে, ‘অসম যুদ্ধ’-এ সামরিক জয়ের চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতাই অধিক কার্যকর। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে, যার দায় শেষ পর্যন্ত উভয় সরকারের উপরই বর্তাবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইসলামাবাদ ও কাবুল—দুই দেশকেই তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে এগোতে হবে। শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি সাময়িক জনপ্রিয়তা আনতে পারে, কিন্তু তা টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—আফগানিস্তানের পাহাড় কেবল সামরিক শক্তির অহংকার ভেঙে দেয়; কিন্তু সমাধান আসে আলোচনার টেবিলে।
দক্ষিণ এশিয়া ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের চাপে রয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান-আফগান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলবে। তাই এখনই প্রয়োজন সংযম, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠন। অন্যথায় ডুরান্ড লাইনের সীমান্তবর্তী গোলাগুলির শব্দ খুব দ্রুতই সমগ্র অঞ্চলের শান্তি ও উন্নয়নের স্বপ্নকে ভেঙে দিতে পারে।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

