বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সাংবাদিক মতবিনিময় শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ বা বক্তব্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নেতৃত্বের ধরন এবং ভাষাগত ক্ষমতার প্রতীক নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তারেক রহমান নিজেকে ‘মাননীয়’ সম্বোধন না করার যে অনুরোধ জানিয়েছেন, তা দেশের রাজনীতিতে প্রচলিত ক্ষমতা-নির্ভর সম্বোধন সংস্কৃতির প্রতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘মাননীয়’ শব্দটি কেবল সাংবিধানিক পদধারীদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বহু ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ বা সিনিয়র নেতাদের নামের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শ্রদ্ধার চেয়ে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রকাশ্য অনুরোধ—নিজেকে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখতে চাওয়ার বক্তব্যসহ—রাজনীতির ভাষা ও আচরণে ভিন্ন এক বার্তা দেয়। এটি ব্যক্তিগত বিনয়ের প্রকাশ নাকি দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের সূচনা—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
তার বক্তব্যে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও ঐক্যের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা দিকনির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে “৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই”—এই মন্তব্য দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে নতুন কোনো কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বিএনপির অতীত শাসনামল নিয়েও পরোক্ষভাবে আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি করে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার অনুরোধটি কি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিএনপি দলীয়ভাবে রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে এর প্রতিফলন ঘটাবে। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, দলীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার দূরত্ব ভাষার মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়। যদি দলীয় কর্মী-নেতা সম্পর্ক, বা সাংবাদিক-রাজনীতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধরনের সম্বোধন সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না আসে, তবে একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ প্রতীকী গুরুত্ব পেলেও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে না।
তারেক রহমানের বক্তব্যে কর্মসংস্থান, নারী-তরুণ-কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা—এসবই বহুল উচ্চারিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এগুলোর বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে কীভাবে হবে, তা নির্ভর করবে নীতিগত স্পষ্টতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। গণমাধ্যমের প্রতি দায়িত্বশীল ও সাহসী ভূমিকার আহ্বানও একই সঙ্গে প্রত্যাশা ও পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করে, বিশেষ করে ক্ষমতার সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্কের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে।
সব মিলিয়ে, এই মতবিনিময় অনুষ্ঠান তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভাষা ও ভঙ্গি সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত দেয়—যেখানে তিনি নিজেকে ক্ষমতার অলংকারে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। তবে এই বার্তা যদি দলীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে ‘মাননীয়’ শব্দটি বাদ দেওয়ার আহ্বান কেবল একটি আলোচনার বিষয় হয়েই থেকে যাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ভাষার নয়, বরং চর্চার মাধ্যমে।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

