বিনম্রতা ও গভীর শোকের সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। আপোষহীন নেতৃত্ব, আত্মমর্যাদা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে নির্ভীক অবস্থানের জন্য তিনি ছিলেন এক অনন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কোটি মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসে গড়ে ওঠা এই নেত্রী আজ স্মৃতিতে পরিণত হলেও তাঁর প্রভাব বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী যার জীবন ছিল মূলত ব্যক্তিগত এবং আড়ালেই সীমাবদ্ধ। অতি সাধারণ এই জীবনপ্রবাহ থেকেই তিনি ধীরে ধীরে উঠে আসেন রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে। এই যাত্রা ছিল নীরব সংগ্রাম, সহনশীলতা এবং দৃঢ়তার ইতিহাস। সামাজিক সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তিগত শোক এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের যে দৃশ্যমান অধ্যায়, তার প্রথম স্পষ্ট ও অস্বীকার্য নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, এই সত্য ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে আছে।
১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে এক গভীর ব্যক্তিগত শোক নিয়ে আসে। সেই শোক থেকেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৮৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর এই উত্থান ছিল নারীদের জাতীয় নেতৃত্বে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃশ্যমান।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমবার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত, দ্বিতীয়বার ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং তৃতীয়বার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ়করণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ কখনোই সহজ ছিল না। সেই দুর্গম পথে তিনি ছিলেন এক অবিচল যাত্রী। বিশ্বাসের প্রশ্নে তিনি নতি স্বীকার করেননি, চাপের মুখে নিজের অবস্থান বদলাননি। তাঁর রাজনীতি ছিল আপামর মানুষের শক্তির ওপর আস্থাভিত্তিক, আর সেই আস্থাই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি এনে দিয়েছিল।
তিনি একবার বলেছিলেন, দেশের বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশেই তাঁর শেষ ঠিকানা। সেই কথার ভেতর ছিল গভীর দেশপ্রেম ও মাটির প্রতি অটল বন্ধন। আজ তিনি সত্যিই তাঁর প্রিয় দেশবাসীকে শোকের ভার দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
দলীয় রাজনীতির বাইরে বেগম খালেদা জিয়া মূলত সহনশীলতা ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক।
এক মহীয়সী, আপোষহীন নারীর এই প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতার অবস্থান নয়। নেতৃত্ব মানে দায়, সাহস এবং দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বাস বহন করার শক্তি। তিনি চলে গেলেও মানুষের স্মৃতিতে, আলোচনায় এবং ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্যে চির জাগরূক হয়ে থাকবেন।
বিদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
শান্তিময় হোক তাঁর অনন্তযাত্রা।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসিনী করুন। আমীন।
হুসনা খান হাসি
লন্ডন, ইউকে

