বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় শ্রমিক শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, শোষিত ও নিপীড়িত। এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে লেখক নাওজিশ মাহমুদ রচিত “শ্রমিক শ্রেণি ও বাংলাদেশ” বইটি শ্রমিক আন্দোলন, শ্রেণি সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বইটি শুধু শ্রমিকদের দুর্দশার বর্ণনা নয়, বরং কেন এই দুর্দশা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং এর থেকে মুক্তির পথ কী—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক সচেতন প্রয়াস।
লেখক বইটির শুরুতেই বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি আয় এবং শিল্পোৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হয়েও শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা এবং মালিকদের নিষ্ঠুর আচরণ শ্রমিকদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বইটিতে লেখক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—“গার্মেন্টস শ্রমিকরা কি এভাবেই পুড়ে মারা যাবে?” এই প্রশ্ন নিছক আবেগপ্রবণ কোনো মন্তব্য নয়; বরং এটি বাংলাদেশের শিল্প খাতে শ্রমিক নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতার প্রতীক। আমরা বারবার দেখেছি, বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকরা পুড়ে মারা যাচ্ছে, অথচ এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। লেখক দেখিয়েছেন, এই মৃত্যুগুলো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি শোষণমূলক ব্যবস্থার অনিবার্য ফল।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বইটিতে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। হাজারো শ্রমিকের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও লেখকের মতে, বাস্তবে সরকার ও মালিক শ্রেণির মধ্যে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। কিছু সাময়িক সংস্কার ও লোক দেখানো উদ্যোগ নেওয়া হলেও শ্রমিকদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি আজও উপেক্ষিত। লেখক যুক্তি দেন, এর মূল কারণ হলো শ্রমিকদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের অভাব এবং স্বাধীন, শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতি।
নাওজিশ মাহমুদ স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর বড় একটি অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে আবদ্ধ। ফলে এসব সংগঠন শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শ্রমিক সংগঠন যখন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে বন্দি থাকে, তখন শ্রমিকদের মুক্তি আসা অসম্ভব। লেখক তাই শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও স্বতন্ত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
বইটির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো, এখানে কেবল সমস্যার বর্ণনা নয়, বরং সম্ভাব্য সমাধানের দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। লেখক মনে করেন, শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শ্রেণিগত ঐক্য এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। শ্রমিকদের নিজেদের শক্তির ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্র ও মালিক শ্রেণির দয়ার ওপর নির্ভর না করে সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে হবে—এই বার্তাই বইটির মূল সুর।
এ বইটি পড়তে গিয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, লেখক বাস্তবতাকে আড়াল করেননি। আবেগী ভাষা বা অতিরঞ্জনের পরিবর্তে তিনি তথ্য, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থান বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে বইটি শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষক, অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সচেতন পাঠকদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“শ্রমিক শ্রেণি ও বাংলাদেশ” বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে খালিদ নোমান নমি, মনসুরুর রহমান, হাবিব বাবু্ল , এবং রায়হান ফিরদাউস মধুকে। তাঁরা সবাই গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠনে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। এই উৎসর্গ বইটির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
সবশেষে বলা যায়, নাওজিশ মাহমুদের এই বইটি বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব অবস্থার একটি নির্মোহ দলিল। এখানে যেমন শোষণের চিত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে মুক্তির পথের সন্ধান। বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন—কিভাবে সংগঠন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও শ্রেণি ঐক্যের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণি নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যারা শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং একটি মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক : শুদ্ধস্বর ডট কম ।

