ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক : বিদ্বেষের বদলে কূটনীতি ও সৌহার্দের প্রয়োজন

 

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক যোগসূত্র, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পারস্পরিক নির্ভরতা—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব গোটা অঞ্চলে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্কে আবারও জটিলতার আবির্ভাব ঘটেছে। বিশেষ করে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘সেভেন সিস্টার’ নিয়ে দেওয়া বক্তব্য এবং তা ঘিরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি সৌহার্দের পথ ছেড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছি?

রাজনীতিতে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক রেটরিক প্রায়ই বাস্তব কূটনীতির চেয়ে বেশি তীব্র, আবেগনির্ভর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়। হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যও অনেকের চোখে সেই রাজনৈতিক রেটরিকের মধ্যেই পড়ে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার’ নিয়ে কোনো আগ্রাসী অবস্থান নেয়নি, নেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। তবু একটি রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক স্তরে প্রতিক্রিয়া আসা অনেককে বিস্মিত করেছে।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল? বিশেষত যখন ভারতীয় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারাও অতীতে বাংলাদেশকে নিয়ে নানা ধরনের আপত্তিকর, উসকানিমূলক ও বাস্তবতাবিবর্জিত মন্তব্য করেছেন। সেসব মন্তব্যে খুব কম ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বরং ঢাকা সাধারণত কূটনৈতিক সংযম ও দায়িত্বশীলতার পথই বেছে নিয়েছে। সেই তুলনায় হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক কখনোই আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এখানে ইতিহাস, স্বার্থ, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও বেশি প্রযোজ্য। দুই দেশের সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট, অভিবাসন, নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া উভয় দেশের জন্যই অকল্যাণকর।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশজুড়ে রাজনীতিতে ঘৃণার ভাষা ও বিভাজনের রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি সন্দেহ, ভয় ও বিদ্বেষ উসকে দেওয়া অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক লাভ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্র ও অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কও এই ঘৃণার রাজনীতির শিকার হলে তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের ওপরই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত শক্তি ছিল তার কৌশলগত সংযম ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। একইভাবে বাংলাদেশের কূটনীতিও বরাবরই ‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, বৈরিতা কারও সঙ্গে নয়’—এই নীতিকে সামনে রেখে পরিচালিত হয়েছে। এই দুই নীতির সম্মিলনই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক বক্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, যা সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তেজক শিরোনাম, একপেশে বিশ্লেষণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অসম্পূর্ণ তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রভাব না বুঝেই তা নিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়া হয়। এর ফলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়, যা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়।

ভারত ও বাংলাদেশের উচিত এই মুহূর্তে সম্পর্কের বৃহত্তর ছবিটির দিকে তাকানো। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বক্তব্যকে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা, বরং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে উদ্বেগ ও মতপার্থক্য তুলে ধরা—এটাই পরিণত রাষ্ট্রের আচরণ। একই সঙ্গে উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায়িত্ব আছে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারের। কারণ একটি দায়িত্বহীন মন্তব্য দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সৌহার্দ ও সহযোগিতার বদলে ঘৃণার চাষ কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাম্য নয়। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল দুই দেশের সরকারের বিষয় নয়; এটি দুই দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক রেটরিকের ঊর্ধ্বে উঠে যদি উভয় দেশ বাস্তববাদ, সংযম ও পারস্পরিক সম্মানের পথে অগ্রসর হয়, তবেই এই সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হবে। অন্যথায়, ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম , ফ্রাঙ্কফুর্ট , জার্মানি ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.