খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল এক উদাহরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ক্ষমতার সঙ্গে নয়, বরং সংগ্রাম, সাহস ও সময়ের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার মতো কারিশমাটিক, দৃঢ়চেতা ও আন্দোলনমুখী নেত্রী আর দেখা যায়নি। শুধু বাংলাদেশ নয়, রাজনীতিতে সফল নেতৃত্বের জন্য যেসব মৌলিক গুণাবলী প্রয়োজন—আপোষহীনতা, ধৈর্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনসম্পৃক্ততা—তার সবকটিরই সুস্পষ্ট উপস্থিতি ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে।

১৯৯০ সাল। বাংলাদেশ তখন এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে উত্তাল গণআন্দোলন, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কেয়ারটেকার সরকারের প্রস্তুতি, রাজপথে ছাত্র–জনতার টানা লড়াই—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন নতুন ভোরের অপেক্ষায়। সেই সময়, ডিসেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায়, ঢাকার ধানমণ্ডীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো কাছ থেকে দেখা হয় বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে।

সে দিন বিএনপি যুবদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া। কিন্তু খালেদা জিয়ার উপস্থিতি, তার কথাবার্তার দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্বের ভার আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তখনই মনে হয়েছিল—এই নেত্রী কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন না, তিনি নিজ গুণেই একদিন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে পৌঁছাবেন। ইতিহাস পরে সেই ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করেছে।

আমি তখন জার্মানিতে প্রবাসজীবনে থাকলেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি ধাপ গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। প্রবাস থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি দেখা মানে এক ধরনের দূরত্ব বজায় রেখে বিশ্লেষণের সুযোগ পাওয়া। সে সময় তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আখতারুজ্জামানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ছাত্র আন্দোলনের গতি ও রাজপথের বাস্তবতা সম্পর্কে আমাকে অবহিত রাখতেন।

তার বিশ্লেষণে একটি বিষয় বারবার উঠে আসত—ছাত্র আন্দোলনকারীদের কাছে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও আপোষহীন। তিনি শেখ হাসিনার তুলনায় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মাঠের কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অনমনীয় প্রতিরোধের প্রতীক। কোনো সমঝোতার রাজনীতিতে না গিয়ে তিনি যে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন, তা আন্দোলনকারীদের সাহস ও আস্থাকে আরও দৃঢ় করেছিল।

এরশাদ শাসনামলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক। তার রাজনীতিতে আসা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ক্ষমতার লড়াই ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি যখন নেতৃত্বশূন্য ও বিভক্ত, তখন তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও দলের হাল ধরেন। প্রতিকূল পরিবেশ, রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর থেকেও তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে।

এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তাকে বহুবার আপোষের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ক্ষমতার ভাগ কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার লোভ। কিন্তু প্রতিবারই তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই আপোষহীন অবস্থানই তাকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বের কাতারে তুলে আনে।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। ছাত্র–জনতার আত্মত্যাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন, তা তিনি বজায় রাখতে পেরেছিলেন। ফলে এরশাদ সরকারের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

স্বৈরাচার পতনের পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহনকারী। একটি ধ্বংসপ্রায় প্রশাসন, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক বিভক্তির ভেতর দিয়েই তাকে দেশ পরিচালনা করতে হয়। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তী সময়গুলোতেও খালেদা জিয়া ছিলেন আন্দোলন ও প্রতিরোধের রাজনীতিতে অবিচল। কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধীদলে থেকেও তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন দায়িত্ব হিসেবে, সুবিধা হিসেবে নয়। কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নানা প্রতিকূলতার মুখেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি। তার এই দৃঢ়তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল এক উদাহরণ।

আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে স্পষ্টভাবে দেখা যায়—খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন, তিনি একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতিনিধি। তার নেতৃত্বে বিএনপি যেমন সংগঠিত হয়েছে, তেমনি দেশের রাজনৈতিক পরিসরে শক্তিশালী বিরোধী দলের ধারণাটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর বিরোধী শক্তি যে কতটা জরুরি, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন তার বাস্তব প্রমাণ।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রবাস থেকে পর্যবেক্ষণ এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—সব মিলিয়ে আমার কাছে খালেদা জিয়া মানে আপোষহীন নেতৃত্বের এক প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস হয়তো তার সব সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করবে, কিন্তু তার সাহস, দৃঢ়তা ও স্বৈরাচারবিরোধী অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নেত্রী খুব কমই আছেন, যিনি সংকটে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন এবং প্রতিকূলতার মাঝেও আপোষহীন অবস্থান ধরে রেখেছেন। খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—যার নাম উচ্চারণ করলেই একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের কথা স্মরণে আসে।

লেখক:
হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম । 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.