আপসহীন দেশনেত্রীর সঙ্গে যেভাবে শুরু আমার রাজনীতি

দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একদল বিপদগামী সেনা স্বাধীনতার ঘোষক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। এরপর নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে সরিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন; দেশে রাজনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে দেখা দেয়। এ অবস্থায় দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে সবার অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আমাদের যুবদলের ৮ থেকে ১০ জনকে বাসায় ডাকলেন। তাৎক্ষণিক আমরা তাঁর বাসায় গেলাম। ওই দিন তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয়। এ সময় একটি বিষয়ে আমাদের তর্ক হয়। এখান থেকেই আপসহীন দেশনেত্রীর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তর্কটা ছিল যে, আপনারা কাজ করবেন না; খালি কথা বলবেন। আমি বললাম, ম্যাডাম আপনি রাজনীতি করবেন, রাজনীতির মাঠে এলে বুঝবেন, আমরা কথা বলি নাকি কাজ করি। এখন কোনো কিছু প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ নাই। আমি চাই আপনি রাজনীতি করেন। তিনি যখন রাজনীতিতে এলেন প্রথমে বিএনপির সদস্য এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে। কিন্তু বিচারপতি সাত্তার চেয়ারম্যানের পদ ছাড়বেন না। তাই আমাদের অনেকেই ওনার কাছে গিয়ে বুঝিয়ে-শুনিয়ে পদত্যাগপত্র নিয়ে এলাম। এরপর সেই পদত্যাগপত্র ওনাকে (খালেদা জিয়া) দিলাম। তারপর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলেন। এরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এভাবেই উনার পাশে আমার রাজনৈতিক পথচলা শুরু।

আমি প্রথম বারের মতো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ সফরে যাই। তিনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, আমি মাঝপথে মঞ্চ থেকে চলে আসি। তখনও উনি খেয়াল করেন নাই। পরে যখন কথা হয়; তখন আমাকে বললেন, আপনি তো খুব সুন্দর বক্তব্য দেন। যাই হোক, এরপর আবার খাওয়ার টেবিলে যখন বসলেন, তখন আমাকে খুঁজে আনলেন। খাবার শেষে আসার সময় আমার সঙ্গে আবার গল্প করলেন। তাঁর রাজনীতির দর্শন শুনলাম। ওখান থেকে আসার পরে সিদ্ধান্ত নিলেন, যুবদল পুনর্গঠন করবেন।

সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে তখন পুরোপুরি ধারণা ছিল না। ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর যুবদল পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়; সেখানে আমাকে আহ্বায়ক; মির্জা আব্বাসকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব করেন ম্যাডাম। আমি তখন বললাম আব্বাসকে আহ্বায়ক করেন। তিনি বললেন আব্বাস পারবে না। তুমি চালাও। আমি বললাম আমি পারব আপনি বিশ্বাস করেন? বললেন হ্যাঁ। আমি বললাম আমি পারব মির্জা আব্বাসকে সামনে রেখে। আমাদের ৯০ দিন সময় দিলেন। আমরা ৮০ দিনের মধ্যে ৬৬টি জায়গায় সম্মেলন করে ওনার সময় চাইলাম। তিনি বললেন, আমায় এক মাস সময় দাও। ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ সম্মেলন ছিল। সেই সম্মেলনে আমরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হই। এই ভোটের মাধ্যমে উনার সঙ্গে ঘনিষ্টতা শুরু হলো। রাজনীতিতে আমার বক্তব্য উনি খুব মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। তিনি বলতেন, আমি জনগণকে মাতিয়ে রাখতে পারি; আমার কথা শুনলে মানুষ হাসতে পারে আবার কাঁদতেও পারে। উপরন্তু আমি উত্তেজিতও করতে পারি। উনি উনার রাজনৈতিক জীবনে দেশব্যাপী যত জায়গায় যেতেন, আমাকে নিয়ে যেতেন। যার ফলে দেখা গেছে তাঁর সঙ্গে কয়েক হাজার সফর হয়েছে। উনার সাথে খাওয়ার টেবিলে বসলেই আমাকে কিছু খাইতে দিতেন। যদি না খেতাম থাপ্পড় দেখাতেন। বলতেন, না খেলে কাজ করবা কীভাবে! তো, যাই হোক ১৯৮৮ সালে যখন মহাসচিব ওবায়দুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো, তখন কথা উঠলÑ কে হবেন মহাসচিব? তখন আমি বললাম, মহাসচিবটা আপনি রাজনীতিবিদদের থেকে করেন ম্যাডাম। কোনো অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে করবেন না। তিনি বললেন, কেন? আমি বললাম আপনি তো সামরিক পরিবারের অভিভাবক। কাজেই জনগণের নেতা না দিলে এই যে মানুষ বলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে জন্ম নেওয়া দল, ওটা তো ম্যাচ করে ফেলবে। তখন বললেন, কারে করা যায়? আমি আর আব্বাস বললাম, আব্দুস সালাম তালুকদারকে দেন। যাই হোক, এ পর্ব শেষ হলো। কমিটি ঘোষণা হলো। তখন দেখা গেল, ওই কমিটিতে আমার কোনো নাম নাই। আমি সদস্য নই। আমার সঙ্গের অনেকেই হয়েছে। আমার যুবদল থেকে ১০ জন হয়েছে। আব্বাসকে করা হয়েছে যুব সম্পাদক, কিন্তু আমার কোনো নাম নাই। তাতে আমি মাইন্ডও করি নাই। কিন্তু উনি মনে করলেন, আমি মাইন্ড করেছি। দুই দিন পর টের পেয়ে আমাকে ডাকলেন সালাম তালুকদারের বাড়িতে। সঙ্গে আব্বাসকে নিয়ে গেলাম। কথা হচ্ছে। খাবার টেবিলে কথা হচ্ছে। তখন আমার একটা অপারেশন হয়েছে, আমি ঝাল খাই না। ম্যাডাম বললেন, ভাবি একটু গরম পানি দেন। সেই গরম পানিতে উনি পুরো মুরগির রোস্টটা ধুয়ে দিয়ে বললেন, এখন খাও। আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়া দেখছি। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখছো? আমি বললাম, দেখছি আপনাকে। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। মা খুব আদর করে খাইয়ে দিত। আপনার মধ্যে সেই মাতৃরূপটা লক্ষ্য করছি। বলেন, তাই! আমি কি তোমাকে আদর করতে পারি না? আমি বললাম, পারেন কিন্তু মায়ের মতো না। তিনি বললেন, কেন? আমি বললাম, আপনি একজনের মা হতে পারেন না। আপনি লক্ষ কোটি জনতার মা, আপনাকে দেশের কথাও ভাবতে হবে। শুধু এক গয়েশ্বরকে ভালোবাসলে হবে না। ম্যাডাম বললেন, তোমার এই আধ্যাত্মিক কথা রাখো। পরবর্তী পর্যায়ে আব্দুস সালাম তালুকদারকে জিজ্ঞেস করলেন, সালাম সাহেব ওর নাম ছিল? কাগজ বের করে দেখেন, আমার নাম ছিল গবেষণা সম্পাদক হিসেবে। তখন সালাম তালুকদার বললেন, ম্যাডাম পাঠিয়েছেন আমি যেটা পড়ি নাই। আমার জ¦র ছিল। পরে তিনি খেয়াল করলেন যে, ১২টা নাম নতুন ঢুকানো হয়েছে। ম্যাডামের দেওয়া ১২টা বাদ দিয়েছে। তখন ম্যাডাম বললেন, এই কাজটা করল ওরা? যাই হোক আপনি গয়েশ্বরের কাছে চিঠিটা দিয়ে দেন। আমি বললাম, ম্যাডাম চিঠি দিয়েন না। কেন? আমি বললাম, আমাকে যদি চিঠি দেন তাহলে আরও ১০ জন আসবে। আর সিদ্ধান্ত যেটা নেবেন, সেটা বদলাবেন না। যদি সিদ্ধান্ত পাল্টান তাহলে আপনার নেতৃত্ব কিন্তু ধরে রাখতে পারবেন না। আমাকে নিয়ে আপনি ভাববেন না। কোনো পদের দরকার নেই। এটা নিয়ে আপনার ভাবার কোনো দরকারও নেই। আমাকে যে দায়িত্ব দিচ্ছেন যুবদলের, এটি বড় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাই। বিএনপিতে আরেকটা পদের দরকার নেই। তিনি আমাকে বললেন, তুমি দল নিয়ে এত ভাবো!

আরেকবার মঠবাড়িয়া যাওয়ার সময় একতলা লঞ্চে ভাণ্ডারিয়া যাচ্ছি। রাতে তো উনার ঘুম হয় নাই। তখন দেখি, উনি একটু ঘুমঘুম। আমি বললাম, ম্যাডাম আপনার মনে হয় ঘুম পাচ্ছে। বললেন, হ্যাঁ। তখন আমি ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে দিয়ে বলি, এটার উপর শুয়ে থাকেন। আমরা উপরে যাই। লঞ্চে থাকব। যখন লঞ্চ থামছে, তখন উনার ঘুম ভেঙেছে। উনি মুখ ধুয়ে আমাদের সঙ্গে চলে আসলেন।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যে কোনো ক্ষেত্রে আমরা উনার আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলাম। আমাদের বিশ্বাস করে তিনি কোনো কঠিন কাজ দিলেও আমরা সহজেই করে ফেলতাম। উনারও একটা চরিত্র ছিল- কঠিন কাজটা সহজেই করে ফেলতে পারতেন। করার আগ পর্যন্ত কেউ টেরও পেত না। কে পার্টিতে দুই নম্বর এক নম্বর; কে ভালো বা মন্দÑ সব সিদ্ধান্তই নিতেন তিনি। কাউকে বুঝতে দিতেন না। অত্যন্ত সহনশীলতার সঙ্গে দলটাকে ধরে রেখেছেন সবসময়। এবং কে কোন কাজে পারদর্শী সেটা উনি অনুমান করতে পারতেন। ওইভাবেই তিনি কাজ দিতেন। কাজের মধ্য দিয়ে আমি ওনাকে চিনতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি উনার দৃঢ়তা। আমাদের দল ভাঙার জন্য শেখ হাসিনা, এইচ এম এরশাদ মিলে যত চক্রান্ত করেছে, এসব চক্রান্ত উতরে যেতে আমাদের মতো বিশ্বস্তদের (যদিও ছোট ছিলাম) ওপর তিনি নির্ভর করতেন এবং আমাদের মাধ্যমে এসবের উত্তরণ ঘটাতেন। উনি যে আমাদের এত আদর করতেন বা আমাদের কথা রাখতেন, এটা কিন্তু বুঝতেও দিতাম না। ওনার জীবনের ৪০টি বছর, বিশেষ করে এক-এগারোর পরের দুই বছর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমাকে নিয়েই নিতেন। মার্চ মাসের ২৭ তারিখে সাঈদ এস্কান্দারের বাসায় প্রথম অন্তরীণ অবস্থা থেকে গেলেন। হাইকোর্টের রিটের পর সেখানে আমাকে ডাকলেন। আমি, ডা. জুবাইদা রহমান ও ম্যাডাম আড়াই ঘণ্টা গল্প করলাম। এ সময়ে পরিস্থিতি উত্তরণে যত কৌশলগত দিক আছে, সেসব নির্ণয় করা হলো। ডা. জুবাইদা রহমান খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। উনি কোনো মন্তব্য করেননি। উনি কারাগারে যাওয়ার পর, যেহেতু আগে থেকেই আমাদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা ছিল, সে কারণে আমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই সমস্যা পোহাতে হয়নি। কারণ ওনার মনের ভাব বুঝতাম। মাঝেমধ্যে উনি জেলখানা থেকে আমার কাছে খবর পাঠাতেন। আমিও আবার উনার বিশ্বস্ত লোক মারফত খবর পাঠাতাম। এমন করেই সময় কাটল। রাজনৈতিকভাবে উনাকে মূল্যায়ন করতে হলে আমি বলব, একটা অনন্য ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে খালেদা জিয়ার ধারে-কাছে কেউ নেই। আত্মসম্মানবোধ এবং কোনোরকম ছলচাতুরি তৈরি না করা এবং রাজনীতিতে জনগণের জন্য দলের যেটা করার, তা করার ক্ষেত্রে তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই করতেন। সেখানে কোনো আপস কোনো দিন করেননি। এমনি এমনি উনি আপসহীন হননি। আর এত সহজ, এত স্বাধীন শব্দ উচ্চারণের ক্ষমতা কোনো রাজনীতিবিদের থাকে না, যা তাঁর ছিল। একজন নারীর মধ্যে সচরাচর যেসব গুণ থাকে না, উনার মধ্যে তা-ও ছিল। পরচর্চা, পরনিন্দা উনি মোটেও পছন্দ করতেন না। আমাদের মধ্যে অনেক সময় শেখ হাসিনার বিষয়ে নানা কথা হতো, উনি ধমক দিতেন। উনি বিশ্বাস করতেন, একজন নারী সম্পর্কে কথা বলার সময় যথেষ্ট সংযত হয়ে বলা উচিত।

সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.