স্মরণে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : আলো যার পথচিহ্ন

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাঁদের উপস্থিতি ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না, অথচ তাঁরা সকল বিন্দুতে উপস্থিত। তাঁরা আলো হয়ে বাঁচেন—সময়ের বাইরে, মৃত্যুর প্রায় পরেও। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সেই বিরল আলোকমানবদের একজন। তাঁর প্রয়াণের পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও মনে হয় তিনি যেন কোথাও আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন—নিঃশব্দ, দীপ্ত, কিন্তু গভীরভাবে উপস্থিত।

হাইডেলবার্গের নিকটবর্তী শান্ত, নিভৃত শহর হিসবার্গে তাঁর বাস। সেই শহরটি আমার থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে হলেও আমাদের সম্পর্কের দূরত্ব ছিল শূন্য—সম্পর্কের প্রকৃত মাপে পরিমাপ করা যায় না কিলোমিটারে। হৃদয়ের ওপর হৃদয়ের যে বন্ধন, সেখানে দূরত্বের কোনো ভূগোল নেই।

অলোকরঞ্জনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখার গল্পটি যেন সাহিত্যিক নিয়তিরই এক অনুপম বিন্যাস।
১৯৮৮ সাল। জার্মানিতে আমার ঘরে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের তিন আলোকপুরুষ—
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, এবং আনন্দ পাবলিশার্সের কর্ণধার বাদল বসু

তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এসেই অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রথম আমার বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন। সেই প্রথম রাতেই আমাদের পরিচয় এমন এক সেতুবন্ধনে পরিণত হয়েছিল, যা আজও টিকে আছে স্মৃতির গভীরে অটুট হয়ে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দেশে ফিরে ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছিলেন “প্রবাসে বাংলা সাহিত্যপ্রেমী” শিরোনামের কলাম; সেখানে তিনি অলকদা ও আমাকেও উল্লেখ করেন। তাঁর লেখায়   ট্রুট বার্টা  দাশগুপ্তকে নিয়ে এক স্নেহদীপ্ত আশ্চর্য উচ্চারণ ছিল—
“তার মতো মহিলা এই যুগে শুধু গল্প-উপন্যাসেই পাওয়া যায়।”

অলোকরঞ্জনের বৃদ্ধা মাতার প্রতি  ট্রুট বার্টার যে মমত্ব, যত্ন ও দায়বোধ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সেই পরিবারটি আমার কাছে হয়ে উঠেছিল আপনজনের ঘর।

আমি বহুবার গিয়েছি অলকদার সেই ছবির মতো সাজানো হিসবার্গের বাড়িতে।
অদ্ভুত এক দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে—
আমরা পৌঁছানোর আগেই তিনি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন, যেন বহুদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত।

তারপর শুরু হত তাঁর উষ্ণ ও পরিমার্জিত আতিথ্য। টুরডবাটার হাতে রান্না হওয়া বাঙালি খাবার, অলকদার স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, এবং তাঁর গভীর অথচ মোলায়েম কণ্ঠে ভেসে আসা সাহিত্যআলোচনা—সে সব মুহূর্ত আজও আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ।

একদিন গল্প করতে করতে অলকদা হঠাৎ তাঁর বইয়ের তাক থেকে একটি বই নামিয়ে আনলেন। তারপর একটি পাতা ফটোকপি করে আমার হাতে দিলেন। আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—
তিনি আমাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছেন!
আর সেটি তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থে মুদ্রিত।

এ জীবনে কত প্রাপ্তি পেয়েছি, কিন্তু সেই মুহূর্তটি যেন সময়কে ছাপিয়ে উঠেছিল। পরে ফ্রাঙ্কফুর্টের পূজার অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই কবিতাটি আবৃত্তি করেন। যখন আমার নাম তাঁর কণ্ঠে কবিতার ছন্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, আমি অনুভব করেছিলাম অদৃষ্টের এক অচিন আলো আমাকে ছুঁয়ে গেল।  কবিতাটি পাঠকদের জন্য এখানে উল্লেখ করলাম ।

ফ্রাঙ্কফুর্টে বাবুলের আয়োজিত বঙ্গসম্মেলনে

—অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

ফ্রাঙ্কফুর্টে বাবুলের আয়োজিত বঙ্গসম্মেলনে
দিরাষ্ট্রিকতার মধ্যে পরবাসী রয়ছে বাঙালি ফ্রাঙ্কফুর্টে।
অনুজপ্রতিম বন্ধু বাবুলের আয়োজিত বঙ্গসম্মেলনে
আমি অচাম্বিতে ত্রোস্তময় রাগিণীতে
এই কথা বলে খুব দ্রুত লয়ে সরে যেতে থাকি,
যেন আমি
কোনদিন  অংশই নিইনি কোন সংগ্রামের
ন্যূনতম ধ্রুব মূল্যবোধে।
আমি
শুধু ক্রমান্বয়ে সরে যাই
একক প্রভাতফেরী জারি করে
ভাষার শহীদ সেজে
শহরতলীর অভিমুখে।

অথচ এ সম্মেলনে
আরও বেশী স্পষ্ট সিদ্ধান্তের বড় প্রয়োজন ছিল।
এমন–কি এই মর্মে দ্রিমিকি ধিক্কার দিয়ে চলে গেলো
সিরাজুল এবং নন্দিতা।

তবে কি অনপনেয় অনটন রয়ে গেছে
বাংলা ও বাঙালি নিয়ে
আমারই নিজস্ব অঙ্গীকারে?

তীব্র অভিমানে
আমি সেমিনার ছেড়ে এসে
লক্ষ করি
বাবুল ব্যতিত আর সকলেই
অন্তর্হিত–অন্তর্নিহিত হয়ে আছে।

আমি কিছু ব্যর্থ
এবং কিছু দ্ব্যর্থক
বাবুলের আয়োজিত বঙ্গসম্মেলনে।

অলোকদা মাঝেমধ্যেই আমাকে ফোন করতেন।
তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত সঙ্গতি—
গভীর, ধীরস্থির, পরিমিত।
তিনি এত সুবিন্যস্ত ভাষায় কথা বলতেন যে অনেকসময় আমি ঢাকাইয়া উচ্চারণে লজ্জা পেতাম।

তিনি শুধু হাসতেন—দয়া করে নয়, স্নেহ দিয়ে।
তারপর বড় বড় বাক্যের ভেতরে আমাকে জায়গা করে দিতেন।
এ যেন ভাষার মধ্য দিয়েও মানবিকতার এক অনন্য শিক্ষা।

চিঠিও লিখতেন। তাঁর লেখা চিঠিগুলো আজও আমার কাছে ধনরত্নের মতো সযত্নে আছে।
অনেক শব্দ বুঝতে বাংলা অভিধান খুলতে হত—কিন্তু সেই অভিধান খোলা ছিল শুদ্ধ আনন্দের দ্বার।

 

২০২০ সালের ১৭ ই নভেম্বর  তাঁর ছোট ভাই দীপঙ্কর দাশগুপ্ত জানালেন তাঁর মৃত্যুসংবাদ।
আমার ভেতরে যেন এক শূন্য ঝড় বয়ে গেল।
বাংলা সাহিত্যের এক পর্ব, এক আলো, এক শিক্ষাগুরু—নিভে গেলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল-পরবর্তী বাংলা কবিতার যে নতুন শাখাটি বিশ্বসাহিত্যের দিগন্তে নতুন আভা নিয়ে আসে—অলোকরঞ্জন ছিলেন সেই শাখার অন্যতম গর্ব।

অনেকেই পাঠ করেন তাঁর কবিতা; কিন্তু তাঁর মতো মানুষকে যারা জানতেন, তারা জানেন—
অলোকরঞ্জন ছিলেন কেবল কবি নন, মানবিকতার এক উজ্জ্বল শিক্ষালয়।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো থাকে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমাদের জন্য রেখে গেছেন সেই আলো—
• ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা
• মানবিকতার গভীর শিক্ষা
• শিল্পমগ্ন দৃষ্টির পরিমার্জন
• প্রবাসেও বাংলা চর্চার দায়
• এবং সবচেয়ে বড় কথা—নম্রতাকে মহৎ করে দেখার সক্ষমতা

আজ তাঁকে স্মরণ করি এক অগাধ শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও চিরকালের ঋণবোধে।

তিনি আর নেই—
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্নিগ্ধ আলো আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে বহু দূর পর্যন্ত।

—হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক
শুদ্ধস্বর ডটকম
জার্মানি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.