দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রেইনবো নেশন’ ধারণা ছিল সহাবস্থান ও ঐক্যের প্রতীক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সম্প্রতি দেশকে ‘রঙধনু জাতি’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় এই দর্শন কতটা বাস্তবায়নযোগ্য ?
“রেইনবো নেশন” বা “রঙধনু জাতি” ধারণাটি দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেয় ১৯৯০-এর দশকে, অ্যাপারথাইড—বর্ণবৈষম্যের—অবসানের পর। আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটু এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন; পরে নেলসন ম্যান্ডেলা এটিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় করেন। এর মূল ভাবনা ছিল: ভিন্ন বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষ যেন এক ছাতার নিচে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে।
বাংলাদেশ এমন এক সমাজ, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ যুগের পর যুগ একসঙ্গে বাস করে আসছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষতা”, “মানবিক মর্যাদা” ও “সমতা”র মতো মূল্যবোধকে স্থান দেওয়া হয়েছিল। এই দিক থেকে বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই “রেইনবো নেশন”-এর মৌলিক ধারণা নিহিত রয়েছে।
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় ধর্মীয় বিভাজন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক বৈষম্য ও আস্থাহীনতা ক্রমে বেড়ে চলেছে।
ভিন্নমত দমন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এসব কারণেই সহাবস্থানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে “রেইনবো নেশন” তুলে ধরা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন।
একটি সত্যিকারের রেইনবো নেশন গড়তে হলে বাংলাদেশের প্রয়োজন তিনটি মৌলিক পরিবর্তন—
রাজনৈতিক সহনশীলতা: ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা জানানো ও সংলাপভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধ: তরুণ প্রজন্মকে বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের চেতনায় গড়ে তুলতে হবে।
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন: নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও মানবিক নীতি ছাড়া সামাজিক ঐক্য টিকে না।
“রেইনবো নেশন” কোনো কল্পনাপ্রসূত রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি মানবিক সমাজ গঠনের বাস্তব দর্শন।
বাংলাদেশ তখনই সত্যিকার অর্থে “রঙধনু জাতি” হতে পারবে, যখন রাজনীতি হবে জনগণের জন্য, ধর্ম হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় সীমাবদ্ধ, আর রাষ্ট্র হবে সবার সমান অধিকারের রক্ষক।
হাবিব বাবুল — রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক ও প্রধান সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডট কম। সমসাময়িক রাজনীতি, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

