বাংলাদেশের রাজনীতি যেন ক্রমশ এক অগ্নিগর্ভ মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। জুলাই সনদকে ঘিরে যে বিরোধ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনী মাঠের উত্তাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। দেশজুড়ে এখন এক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—এই অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যেও কি বিএনপি এবং তার সহযোগী দলগুলো একক কৌশলে মাঠে নামতে পারবে ?
জুলাই সনদ মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের এক প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এই সনদ নিয়ে মতপার্থক্যই এখন জোটের ভেতরে ফাটল সৃষ্টি করেছে। একদিকে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চেষ্টা করছে দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে, অন্যদিকে জামায়েত , এন সিপি ভোটের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ।
অন্যদিকে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’সহ কয়েকটি ছোট দল তাদের নির্বাচনী এলাকায় বিএনপিকে প্রার্থী না দেওয়ার দাবি তুলছে।
তাদের যুক্তি—বড় দলের প্রার্থী থাকলে তারা মাঠে টিকতে পারে না, আর এভাবে ছোট দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাবির বাস্তবতা কতটুকু ?
বিএনপি যদি কেন্দ্রীয়ভাবে কিছু আসন শরিকদের জন্য ছেড়েও দেয়, স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা বছরের পর বছর রাজনীতি করে আসছেন একটি মূল লক্ষ্য নিয়ে—নিজেদের অথবা তাদের ঘনিষ্ঠ নেতাদের এমপি বানানো। ফলে, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মাঠে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, তৃণমূলের এই প্রতিযোগিতা প্রায়ই শরিক দলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। এতে জোটের ঐক্য দুর্বল হয় এবং ভোট বিভক্ত হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্র মঞ্চ বা অন্য ছোট দলগুলো চাইছে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এবং স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে। কিন্তু বিএনপির মতো সংগঠন, জনসম্পৃক্ততা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া তারা কতটা ভোট টানতে পারবে—তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যদি বিএনপির প্রার্থী না থাকে, ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা থাকবে, সেটিও অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট যদি না কাটে, তাহলে আসন্ন নির্বাচন তাদের জন্য “মিলিয়ন ডলারের ঝুঁকি” হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি সবসময়ই উত্তেজনা, নাটকীয়তা ও অজানার মিশেলে ভরপুর। জুলাই সনদ ঘিরে যে রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে, তা আসন্ন নির্বাচনের কৌশল ও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একথা স্পষ্ট—বিএনপি বা তার শরিক দল কেউই একে অপরকে ছাড় দিতে সহজে রাজি নয়। কেন্দ্রের চেয়ে মাঠের রাজনীতি এখন অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি স্বার্থনির্ভর।
আগামী দিনগুলো তাই শুধু নির্বাচনী লড়াই নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণেরও সময়।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম ।

