বাংলাদেশ যেন এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছে—এ কথা এখন আর নতুন নয়, তবুও প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এটিকে আরও নতুন করে দৃশ্যমান করে তোলে। দেশের ভেতর ও বাইরে সবাই এখন একটি প্রশ্নই করে: “এই অস্থির সময় কবে কাটবে?” যেদিকে তাকাই, একই সংশয়, একই অনিশ্চয়তা, একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি। শীতকাল ঘনিয়ে আসছে, আর এই সময়টাতেই হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাদের অধিকাংশের মুখে এখন একটাই উদ্বেগ—দেশ কি নিরাপদ? রাজনৈতিক উত্তাপ কি বাড়ছে? নির্বাচন কি হবে? দেশ কতটা স্থিতিশীল?
রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতির ভিন্ন মাত্রা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে সংঘাত, অনিশ্চয়তা ও নানা ঘটনাপ্রবাহ দেশকে যেন এক ধরনের স্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাতে যোগ হয়েছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একাধিক ভূমিকম্প—যা মানুষের আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেকে হয়তো বলবেন, ভূমিকম্প তো প্রকৃতির বিষয়; কিন্তু মানুষের মনোজগতের ভীতি যখন ইতোমধ্যেই তীক্ষ্ণ, তখন এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় রাজনৈতিক অস্থিরতার মানসিক চাপকেও বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।
আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যেন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। “দেশের অবস্থা কবে ভালো হবে ?”—এমন প্রশ্নের উত্তর এখন কোন জ্যোতিষী বা বিশ্লেষকই সুনির্দিষ্টভাবে দিতে পারবে না। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ, মিছিল, মিটিং, পুলিশি ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, হামলা–বোমাবাজি—সব মিলিয়ে দেশ এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এই আবর্ত যেন ততই তীব্র হচ্ছে।
অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ঘটনার ঘনঘটা আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা। মানুষের মনে প্রশ্ন—সংঘাতের কোন প্রতিকার কি নেই? সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ—কেউই যেন সুনির্দিষ্ট কোন উদ্যোগ নিতে পারছে না বা নিতে আগ্রহী নয়। যেন সবাই অপেক্ষায় আছে—শেষ মুহূর্তে কিছু একটা হবে, আপস হবে, সমঝোতা হবে। কিন্তু সেই ‘শেষ মুহূর্ত’ কখন আসবে তা কেউই জানে না।
নির্বাচনের মাত্র আট সপ্তাহ বাকি, অথচ পরিস্থিতি ঠিক কোন দিকে যাবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও নিশ্চিত নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অবস্থান এখনও অনির্দিষ্ট। তারেক রহমানের দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই দলটির ভিতরে ও বাইরে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি করছে। কেউ বলছেন, তিনি নির্বাচন চান না; আবার কেউ বলছেন, তার অনুপস্থিতিতে বিএনপি সংগঠিত হতে পারছে না। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা যেন দলটিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
অন্যদিকে মৌলবাদী ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর উত্থান এবং সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আরও শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে উদ্বেগজনক হারে। বাউল, কবি, লেখক বা সামাজিক সংস্কৃতির ধারকদের ওপর নির্যাতনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়—এটি বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও হুমকি। সমাজে একটি ভয় ও চুপ করে থাকার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা কোনো দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নের শেষ নেই, উত্তর নেই কোথাও। জনগণ জানতে চায়—নির্বাচন কি অবাধ হবে? সংঘাত কমবে তো? রাজনৈতিক পর্যায়ে সংলাপের কোন সম্ভাবনা আছে? নাগরিকদের জীবন–জীবিকা কি নিরাপদ? কিন্তু এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কেউই দিতে পারছেন না। এমনকি নির্বাচন কমিশনও পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী নয় বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে।
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা, আস্থাহীনতা—এই তিনটি উপাদান প্রোথিত হয়ে আছে, তা আজ আরও দৃশ্যমান। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে সংকটের উৎসস্থল, সমাধানের পথ নয়। অথচ সুস্থ রাজনীতি ছাড়া একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা-ব্যবস্থা কখনো টেকসই হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন—সমাধান কোথায়?
প্রথমত, রাজনৈতিক আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। দলগুলো যদি পারস্পরিক শত্রুতার জায়গা থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে গণতান্ত্রিক পরিসরে আনতে না পারে, তবে অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হবে।
দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, মৌলবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার—কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
চতুর্থত, নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে—নির্বাচন হবে, কিভাবে হবে, কোন নিয়মে হবে—এ নিয়ে তারা স্পষ্ট ঘোষণা দিলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এগুলোর কোনোটিই এখনই বাস্তবায়িত হবে এমন প্রত্যাশা করা কঠিন। বরং আমরা এমন এক সময়ের ভেতর আছি যেখানে অস্থিরতার শেষ কোথায় তা কেউই বলতে পারছে না। এমনকি নির্বাচন শেষ হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে তখনও পরিস্থিতি অস্থির থাকতে পারে।
সুতরাং বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্যার ফল। এটি রাতারাতি কাটবে না। তবে নাগরিকরা আশা করতে পারে—সংলাপ, সহনশীলতা, মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা যত বাড়বে, অস্থিরতার অবসানও তত ঘনিয়ে আসবে।
শেষ কথা—আমরা জানি না এই অস্থির সময় আর কতদিন চলবে। আমরা জানি না নির্বাচনের পরও প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে কিনা। কিন্তু আমরা জানি—প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের আছে, আর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্বও আমাদেরই। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে মিলেই এ পথ চলতে হবে।
লেখক: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

