“জলের শ্যাওলা”- আমার বহু লেখায় উল্লেখ করেছি, আমি বিএনপির রাজনীতিটা বুঝতে পারছি না এবং মোটেও না। এমন কি বিএনপির নেতাদের বহুভাবে প্রশ্ন করেও বুঝে উঠতে পারছি না। হতে পারে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ধরছে না। তবে আমার না বুঝা মানে, এই নয় যে, বিএনপির রাজনীতি বৃথা যাবে। তা বলছি না। নিশ্চয়ই বিএনপির মতন বড় দল এবং যারা বেশ কয়েকবার ক্ষমতায় ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে দলটির, সেই দল নিশ্চয়ই তদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়েই রাজনীতি করছে। হয়তো কোন একদিন আমার মতন সাধারণ জনগণ বুঝতে পারবে এবং বিএনপিও হাসবে।
যেহেতু বিএনপির রাজনীতিটা সত্যিই বুঝে উঠতে পারছি না, তাই বিএনপির রাজনীতিটাই বারবার বুঝার চেষ্টা করেই চলছি। অতঃপর আপন জ্ঞানে যা বুঝে আসছে, সেটা খোলা হৃদয়েই এই লেখায় লিখছি। হয়তোবা বিএনপির কর্মী- সমর্থকরা আমার বুঝের সাথে সহমত হবেন না এবং নেতারা হাসবেন। সেটা হতেই পারে আবার রাজনীতির অঙ্ক কষে যদি কেউ ভাবেন তাহলে হয়তো আমার ভাবনার সাথে মিললেও মিলতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরে বিএনপি আসলে কোন ধরণের রাজনীতিটা করছে? যদি এক কথায় বলি তাহলে বলতে হয়, “সহনশীলতার রাজনীতি” করছে। কেউ হয়তোবা প্রশ্ন করতেই পারেন, “বিএনপি কি সত্যিই সহনশীলতার রাজনীতি করে”? উত্তর পক্ষভেদে নানান রকমের হবে, এটা নিশ্চিত। তবে আমরা যত কথাই বলি না কেন, বিএনপি কোন কট্টর রাজনৈতিক দল নয় এবং সরাসরি ডান বা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলও নয়। জানি, দক্ষিণপন্থী রাজনীতি বিষয়টি বহুজনের বেশ জানা আছে তবে যাদের একান্তই জানা নেই তাদের জন্যই লিখছি, দক্ষিণপন্থী রাজনীতি হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্তরবিন্যাসকে স্বাভাবিক এবং কাম্য মনে করে। বামতো প্রশ্নই উঠে না। বিএনপিকে বলা যায় মোটাদাগে একটি লিবারেল রাজনৈতিক দল। লিবারেল রাজনীতি হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা মোটাদাগে, ব্যক্তির স্বাধীনতা, সাম্য, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নতির উপর জোর দেয়। এই মতবাদের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তি স্বাধীনতার নীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের চিন্তা, মত প্রকাশ ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্র ভাল করে পর্যবেক্ষণ করলে, সরাসরি লিবারেল রাজনৈতিক দল না হলেও, কাছাকাছি বলাই যায় (আপন মত)। কেন সরাসরি লিবারেল রাজনৈতিক দল বলছি না, সেটা আবার বহু উদহারণ দিয়ে লিখতে হবে।
একটি উদহারণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হলেও হতে পারে। লিবারেল রাজনৈতিক নীতিতে (উপরেই লিখেছি), “রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তি স্বাধীনতার নীতি, সাম্য ও মানবতা “, একটু স্মরণ করুন, বিএনপির ক্ষমতাকালীন সময়েই “অপারেশন ক্লিন হার্ট” পরিচালিত হয়েছিল। যদিও সেই অপারেশন ক্লিন হার্টে বিএনপির উদ্দেশ্য যে একবারেই খারাপ ছিল তা কিন্ত নয় (ও হ্যা এখানে আবার আমাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করবেন না, প্লিজ/ বিষয়টি পরিষ্কার বলতেই উদ্দেশ্য বলা)। স্মরণ করুন, বিএনপির অপারেশন ক্লিন হার্টের কিন্ত বিএনপির বেশিরভাগের হার্ট অ্যাটাকে হত্যা হয়েছিল। হার্ট অ্যাটাকে কেন? সেটা মনে হয় না বললেও চলবে, আশা করছি। আরও স্মরণ করুন, সেই সময়ে (যদি সঠিক স্মরণ হয় আমার) তিন বা চারজন কমিশনারের হত্যা হয়েছিল। তাদের মধ্য একজন ছিল নারায়ণগঞ্জের বিএনপির একনিষ্ঠ ও তুখোড় সংগঠক, ডেবিট। নারায়ণগঞ্জে সদ্য জেল থেকে মুক্ত হওয়া জাকির খানের চেয়েও সম্ভবত দশগুণ বেশি মাস্তান (তবে একনিষ্ঠ বিএনপি) ও সংগঠক ছিলেন। মূলত বিএনপি সেই সময়ে বিএনপির ভিতরের মাস্তানদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং অপারেশন ক্লিন হার্ট শুরু করেছিল বা বাধ্য হয়েছিল এমন অপারেশন করতে। সেই অপারেশনে প্রথম দিকে একজনও আওয়ামীদের হত্যা হয়নি। হঠাৎই একজন আওয়ামী মাস্তানের (নাম স্মরণ নেই) সেই অপারেশনের নৈমিত্তিক হার্ট অ্যাটাকের মৃত্যু হয় এবং আওয়ামীদের ঠেলায় (সাথে অবশ্যই আমাদের সুশীলগণেরা ছিলেন জোড়ালোভাবে) মূলত বিএনপি অপারেশন ক্লিন হার্ট বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে এবং সেই হিসেবেই বলা যায লিবারেল রাজনৈতিক দল তবে শতভাগ অবশ্যই নয়।
আরও পরিষ্কার হবে বিএনপির জন্মসূত্রের সময়কাল এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠার সময়কাল মিলালে বলাই যায়, একটি প্লাটফর্ম থেকে ধীরে ধীরে একপ্রকার মিশ্রণের রাজনীতির চর্চায় বহাল আছে, বিএনপি। সেই হিসেব থেকেই বিএনপিকে আপন ক্ষুদ্র জ্ঞানে সরাসরি কি রাজনৈতিক দল, লেখাটা মুশকিল হচ্ছে। তবে কোন গুণি ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে সরাসরি কোন নামে আসতেই পারে।
বিএনপি কি ধরণের রাজনৈতিক দল এবং সেটাই লেখার চেষ্টা কেন করলাম? কারণ হলো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্র ও রাজনৈতিক চর্চা দুটোতেই বেশ ফারাক বেশ লক্ষ্যণীয বটে। আপন ধারণা থেকে বলছি, বিএনপি মূলত চাইছে, সরকারের সাথে কোন ঝামেলায় না গিয়ে, যে ভাবেই হোক একটি নির্বাচন আদায় করা। বিএনপি বেশ জানে, যে যত কথাই বলুক না কেন, এই মুহূর্তে আওয়ামীদের অনুপস্থিতিতে একমাত্র বিএনপিই ক্ষমতায় যাবে। আবার বলি একমাত্র বিএনপি। ঠিক সেই হিসেবটা করেই বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বহু অপকর্মের বিপরীতেও টুশব্দটি করছে না। উদহারণস্বরুপ সনদ স্বাক্ষর ও সনদ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাটপারি বা ফোরটুয়্যান্টিগিরিতেও (শব্দটি আমার নয়/ রাজনৈতিক নেতাদের) বিএনপি কিন্ত একপ্রকার নীরব। দুই চারজন নেতা- নেত্রী এদিক- সেদিক বক্তব্য দিয়েছেন চড়া মেজাজে টিভির পর্দায় বা রাজনৈতিক মাঠে, তবে ওই পর্যন্তই।
যেহেতু বিএনপি জানে নির্বাচন হতেই হবে এবং নির্বাচন না হলে সবচাইতে বেশি বিপদে পড়বে খোদ সরকার অতঃপর সকল রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন না হলে সবচাইতে বেশি লাভবান হবে আওয়ামীরা। পূর্বের সরকারের মতন ‘হামি- ডামি- নৈশ্য বা যে কোন প্রকারের”‘ নির্বাচন হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিপদ কম হবে এবং বিএনপিই সেই পথ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সকলকে দখিয়ে দেবে। স্মরণ রাখবেন, ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক ঘটনার নায়কদের বিএনপি সরাসরি কিন্ত মুক্তির পথ দেখিয়ে সম্মানিত করেছিল। উদহারণটি দেবার কারণ নিজের মতন করে মিলিয়ে নিবেন।
তাহলে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায়ন হলে কি জুলাই স্পিরিট এবং সনদ সব পাক্কা হয়ে যাবে বা উধাও হয়ে যাবে? যদি গণভোট হা জয়যুক্ত হয়, তাহলেই কি জুলাই সনদ পাক্কা হয়ে যাবে? সরাসরি উত্তর হচ্ছে, “না”। কারণ বিএনপি তাদের নিজেদের ৩১ দফায় এগিয়ে যাবে এবং সনদে যত প্রকার ‘নোট অফ ডিসেন্ট ‘ দিয়েছে, সেই সূত্রেই এই সনদকে চার আনা দাম দিবে না এবং জনগণও নিশ্চিত বিএনপির বিপরীতে খুব বেশি হুক্কাহুয়া করতে পারবে না। হ্যা, টকশ্যো বা বক্তৃতায় বহুজনে চিৎকার চেঁচামেচি করবে এবং সেটা ওই পর্যন্তই থাকবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাহলে কি বলা যাবে বিএনপির কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের মূল্য বা সনদ ভবিষ্যতে বিনষ্ট হবে? এখানেও সরাসরি উত্তর হচ্ছে, “না” কেননা স্বাক্ষরের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অতি চালাকি করে বা বেশি বুঝে, যে বাটপারি করেছে, সেই কারণেই জুলাই সনদ নিশ্চিত বেহেস্তে যাবে যাবে। অবশ্যই বিএনপির কারণে নয়। তবে হ্যা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে সনদে না হলেও, বিএনপি একেবারেই ফেলে দিবে না। যেভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সহনশীলতার ভাবে আছে, ঠিক একইভাবে জুলাই স্পিরিটের সাথেও সহনশীলতার ভাবে থাকবে তবে বিএনপির দর্শনের সাথেই। ওই যে লিখলাম মোটাদাগে বিএনপি একটি প্লাটফর্ম থেকে একপ্রকার লিবারেল পজিশনে রাজনীতি করে, সেটার একটি মিশ্রণ নতুন করে ঘটবে।
তবে শেষে ছোট্ট প্রশ্ন মনে জাগ্রত হয়, বিএনপির এই সহনশীলতার ফাঁকে বা স্রেফ একটি নির্বাচনের আশায় আশায়, দেশের যে বারোটা বাজছে, সেটার দায়ভার কি বিএনপির কাঁধে উঠবে না। প্রশ্নটি আপাতত মনের কোণ থেকে উঠছে তবে জবাব সময়েই আসবে। শেষে বলবো, বিএনপির রাজনীতি বিএনপি অবশ্যই করবে বা করুক তবে শুধু আশা করবো, সেই রাজনীতিটা যেন স্রেফ দলের তরে না হয়, হোক দেশের তরেও।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

