ইউনুস সরকারের অনেকগুলো কাজ আমার পছন্দ না, তবে এই শেষদিকে এসে একটা ভাল কাজ তারা করেছেন। বহু বছরের একটা জঞ্জাল অপসারনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে বিদেশী সংস্থা নিয়োজিত করে প্রফেসর সাহেব দেশের ইতিহাসে নি:সন্দেহে একজন বড় মাপের সংষ্কারক হিসেবে নাম লেখালেন। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুন্ঠনের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এর ইতিহাসও অনেক পুরনো। স্বাধীনতাপূর্বকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সকল ভারী শিল্প কলকারখানার মালিকানা ছিল অবাঙ্গালী বা পশ্চিম পাকিস্তানীদের। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই তারা তাদের ব্যবসাপাতি ফেলে চলে যায়। ফলে স্বাধীনতার পর দেখা যায় এগুলো মালিকানাবিহীন। কিছু লুট হয়ে যায়। পরিত্যক্তগুলো সরকার অধিগ্রহন করে। এ সময় সমাজতন্ত্রের একটা জজবা ওঠে। আমরা যুদ্ধ করলাম হানাদারদের পরাজিত করে দেশ ম্বাধীন করার জন্য, যুদ্ধের পর এক শ্রেনীর রাজনীতিক আর বুদ্ধিব্যপারি দাবী করলেন আমরা নাকি দেশ স্বাধীন করেছি সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য! কি আর করা! রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে বসানো হলো সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু আজীবন কম্যুনিস্টবিরোধী রাজনীতি করলেন, ধান্ধাবাজদের পল্টিতে পড়ে তিনিও রাতারাতি সমাজতন্ত্রী হয়ে গেলেন! এই যে ফাঁদে পড়ে গেলেন মৃত্যুর আগদিন পর্যন্ত সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারেন নাই। তো সমাজতন্ত্র কিভাবে কায়েম হলো- পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া মালিকানাবিহীন শিল্প কারখানা জাতীয়করন করে তাতে একএকজন প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া হলো। বলাই বাহুল্য এরা সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা বা বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদধন্য। এই প্রশাসক ভাইজানেরা মাত্র তিন বছরের মধ্যে লুটেপুটে কলকারখানাগুলোর লালবাতি জ্বালিয়ে দিলেন। এদের স্যাঙাৎ হলো সরকারি বেসরকারি একশ্রেণীর শ্রমিক নেতা। সকলে মিলে ভাগজোক করে মুলধন হজম করে তারপর কলকব্জাও খেয়ে শেষে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলতো! হিসাব আর কে নেয়! এই হচ্ছে আমাদের সমাজতন্ত্রের শেষটা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের এইযে চল, আজও চালু আছে সগৌরবে। চোরেরা দেশের পাটকলগুলো খেয়েছে। আদমজী জুট মিল ছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল। লুটপাট করতে করতে এটার এমন লালবাতি জ্বালায়, শেষে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন শোধ করতে মিলের মেশিনপত্র মন দরে বেচে দিতে হয়। সরকারিখাতের বস্ত্রকলগুলো প্রায় ধ্বংশপ্রাপ্ত। কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মোহন কটন মিলের মুল মালিকানা ছিল ভারতীয় বাঙ্গালীদের। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর একজন পরিচালক ছিলেন। পাকিস্তান আমলেও এই মিল সগৌরবে চালু ছিল। স্বাধীনতার পর সরকার নিজ মালিকানায় নিয়ে নেয়। তারপর প্রশাসক, শেষে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া, কয়েকবার হাতবদল আর প্রতিবার রিনোভেশনের নামে ব্যাংক থেকে শত শত কোটী টাকা লোন নিয়ে মেরে দেওয়া- সবার সম্মিলিত ভক্ষনলিপ্সায় এটা এখন সম্পূর্নভাবে মৃত। মিলপাড়ার বিশাল এলাকা আজ এক মৃত্যুপুরী। এমনিভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব সবকয়টা প্রতিষ্ঠানে বহাল আছে অবাধ লুটপাটতন্ত্র। বিমান রেল বন্দরগুলোয় ভীষন শক্তিশালী সব লুটপাট সিন্ডিকেট। একমাত্র রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থাটা কোনমতে ধুকছে। তারপরও এই লুটপাট সিন্ডিকেটের কারনে তা লাভজনক করা যাচ্ছে না, বেসরকারি মালিকানায় ছেড়েও দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রফেসর ইউনুস সবগুলোয় হাত দেন নাই মাত্র বন্দর খাতটাকে ধরেছেন। তাতেই তাবৎ চোর বাটপার লুটেরা লুটপাট সিন্ডিকেট রে রে করে উঠেছে! বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের কাছে গেলে এতদিনের সোনার ডিমপারা হাঁসটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। নেমে পড়েছে কোটী কোটী টাকা নিয়ে। এই টাকার ভাগ পেয়ে এক শ্রেণীর মিডিয়া রাজনীতিক বুদ্ধিব্যপারি এবং তথাকথিত শ্রমিক নেতা উঠে পড়ে লেগেছে উদ্যোগ ঠেকাতে। অসাধু শ্রমিক নেতাদের ব্যপারটা সহজে বোধগম্য, তাদের আয়ের প্রধান উৎসই হচ্ছে চাঁদাবাজী বখরাবাজী আর লুটপাট সিন্ডিকেট থেকে আসা ভাগ। এখন বোঝা যাচ্ছে বন্দর ছিল তাদের ইনকামের একটা বড় খাত। প্রতিদিন নাকি ২০০ কোটী চাঁকা চাঁদা ওঠানো হয় এক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। এই টাকার ভাগ যায় শ্রমিক নেতাদের পকেটে রাজনৈতিক নেতাদের দরবারে। শ্রমিক কর্মচারিদের পরিষদ নামে একটা সংস্থা আছে। রাম বাম আম জাম নকশাল বাকশাল, সব কিসিমের নেতাদের এক মহামিলনকেন্দ্র এই পরিষদ। এক সময় এই সংগঠনের নাম ভাঙ্গিয়ে বেশ কিছু শ্রমিক নেতাকে দেখা যেতো মাঠ দাপাতে। গত চুয়ান্ন বছরে শ্রমিক কর্মচারিদের এক কানাকড়িরও উপকার করতে পারে নাই অথচ নেতারা ফুলেফেপে উঠেছে, রাজনীতিবিদ হয়েছে, এমপি হয়েছে মন্ত্রী হয়েছে। এবারও দেখা গেল তেনারা মাঠে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না, এতে নাকি দেশের সার্বভৌম শেষ হয়ে যাবে। প্রতিবার যখনই কোন জনকল্যানধর্মী কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয় এই লুটপাট সিন্ডিকেট কায়েমী স্বার্থ হাতছাড়া হবার ভয়ে একই জিগির তোলে। এরা দেশের স্বার্থ দেখে না জনগনের পালস বোঝে না। ফেসবুক যদি সমাজের আয়না হয়ে থাকে এটি ব্যবহারকারিদের শতকরা পঁচানব্বইভাগকেই দেখা যাচ্ছে লুটপাট সিন্ডিকেটের খপ্পর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষায় সরকারি উদ্যোগকে সমর্থন জানাতে। মানুষ কি পরিমান ভুক্তভোগী এবং চোরদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত তা বন্দর সংশ্লিস্ট যে কোন পোস্টের কমেন্টগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
লেটেস্ট একটা বোল বাজারে এসেছে- অনির্বাচিত সরকারের নাকি এখতিয়ার নাই বন্দর নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অবশ্য এটর্নী জেনারেল পরিষ্কার বলেছেন এই সরকারের অবশ্যই এখতিয়ার আছে। বাস্তবতা হচ্ছে এ পর্যন্ত দেশের যতগুলো মৌলিক সংষ্কার হয়েছে উন্নয়ন কাজ হয়েছে, অনির্বাচিত সরকারগুলোই করে দিয়ে গেছে। এরশাদ সাহেব যত সংষ্কার করেছেন, প্রশাসনিক সংষ্কার বা মহকুমাগুলোকে জেলা এবং থানাগুলোকে উপজেলায় উন্নীতকরন, অষুধনীতি, ঢাকা শহরের বড় বড় কয়েকটা সড়ক যেমন রোকেয়া সরণী বিজয় সরণী জনপথ পান্থপথ প্রগতি সরণী নর্থ সাউথ রোড ধোলাই খাল রোড- সবই মার্শাল ল’ আদেশ দিয়ে করেছেন। নির্বাচিত সরকার হয়ে এক ছটাক নতুন রাস্তাও বানাতে পারেন নাই। এক সময় ঢাকার ফুলবাড়িয়া ছিল কেন্দ্রিয় বাস টার্মিনাল। এখান থেকে দেশের সব জেলা উপজেলার বাস ছাড়তো আসতো। এতে পুরো এলাকা চব্বিশ ঘন্টা জ্যাম লেগে থাকতো। এরশাদ সাহেব পরিকল্পনা নেন এই টার্মিনাল বিকেন্দ্রিকরনের। গাবতলী মহাখালি এবং যাত্রাবাড়ীতে তিনটা আলাদা আলাদা টার্মিনাল হবে। এই শ্রমিক ঐক্য পরিষদ তখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধুম আন্দোলন শুরু করে। হরতাল অবরোধ পালন করে, অসংখ্য গাড়ী ভাংচুর করে। সব কিছু ভ্রুক্ষেপ করে এরশাদ টার্মিনাল তিনটা ঠিকই চালু করেছিলেন। কেউ কল্পনা করতে পারেন সেদিন যদি আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে ফুলবাড়িয়াতেই একমাত্র টার্মিনালটা রেখে দিতেন ঢাকার অবস্থাটা কি দাঁড়াতো আজ! নির্বাচিত সরকারের পক্ষে এই কাজ করা কক্ষনও সম্ভব হতো না। শেখ হাসিনাকে আমরা অবৈধ অনির্বাচিত বা অগনতান্ত্রিক সরকার মনে করি। নির্বাচিত সরকার হলে তার পক্ষে মেট্রোরেল পদ্মা সেতু বা ঢাকা শহরে এত ফ্লাইওভার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানানো সম্ভব হতো কিনা আমার সন্দেহ আছে। কাজেই আজ যখন বলা হয় কাজগুলো নির্বাচিত সরকার এসে করবে মানুষ আর বিশ্বাষ করে না।
প্রফেসর ইউনুসের এই বন্দর সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত জনগন স্বত:ষ্ফূর্তভাবে গ্রহন করেছে। সবার একটাই কথা, বন্দর রক্ষার নামে তাবৎ চোর বাটপার লুটেরা সিন্ডিকেট যখন এক হয়েছে তার মানে প্রফেসর ইউনুস ঠিক কাজটাই করেছেন। তিনি যেন মেয়াদকালীন শেষ দিনটি পর্যন্ত সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। নির্বাচিত সরকার এসে বাতিল করলে কিছু করার থাকবে না। তবে দেশবাসী জানবে প্রফেসর ইউনুস চেষ্টা করেছিলেন লুটপাট সিন্ডিকেটটা ভাঙ্গতে। এরশাদের করা উপজেলা ব্যবস্থা ’৯১এর নির্বাচিত সরকার বাতিল করে দিয়েছিল। জনপ্রিয় এই ব্যবস্থা বেশীদিন আটকে রাখতে পারে নাই। কয়েক বছরের মধ্যেই ফেরত আনতে হয়েছিল। সামনের নির্বাচিত সরকার আজকের করা এই ব্যবস্থা বাতিল করে দিলেও নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে কখনও সত্যিকার দেশপ্রেমিক কোন সরকার তা পুনর্বহাল করবে। সরকারি খাতের সকল লুটপাট সিন্ডিকেট ভেঙ্গে জনকল্যানধর্মী এবং জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা কায়েম করবে। মানুষ সে আশায়ই থাকবে।
সাঈদ তারেক , লেখক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

