স্মৃতিকথা ৫ পর্ব ।
আমি যে গ্রামে বড় হয়েছি, তার নাম বরিশুর — আমার নানার বাড়ি। জন্মের পর থেকেই আমি আর আমার বড় বোন সেই গ্রামেই মানুষ হয়েছি। আমার বড় বোন আর আমার ছোট খালার বয়স সমান; ফলে তারা একই সাথে বড় হয়েছেন। পরে আমার নানা-ই আমার বড় বোন এবং ছোটখালাকে পাশের গ্রামের এক বাড়িতে বিয়ে দেন। তখনও আমি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। তারা একই স্কুলে পড়তেন । তারা সহপাঠী এবং বন্ধুর মতো ছিলেন ।
সেই স্কুলের নাম ছিল মাদারীপুর ভোট স্কুল। যা আমি আগেই লিখেছি কিন্তু যতই চেষ্টা করি, স্কুলটিকে কোনোদিন ভালো লাগেনি। ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়ত, শিক্ষকও ছিলেন অনেক, তবু খুব কম জনকেই আমার ‘শিক্ষক’ বলে মনে হতো। আমার অঙ্ক আতঙ্ক ছিল , তারও মধ্যে এলজেব্রা ছিল আমার চিরশত্রু। ভয় আর বিরক্তি নিয়েই কোনোভাবে সেই প্রাথমিক জীবন পার করেছি।
আমার সমবয়সী ছেলেদের বেশিরভাগই প্রাইমারি শেষ করেই বাবার দোকানে বসে গেছে। যার দোকান নেই, সে অন্যের দোকানে চাকরি নিয়েছে। তখন আমার মনে হতো — এই দোকানই যেন এদের জীবনের শেষ গন্তব্য। ভবিষ্যতের স্বপ্ন বলতে ফুটবল আর ভারতীয় সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের গল্প।
আর সেই সব গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ইসমাইল ভাই।
বাজারের পাশের মাঠে আমরা গোল করে বসতাম, আর তিনি শুরু করতেন তাঁর জাদুকরী বয়ান। ব্রাজিলের মাঠ থেকে কলকাতার মোহনবাগান — সবই যেন তাঁর চোখের সামনেই দেখা। পেলের খেলা তিনি এমনভাবে বর্ণনা করতেন, মনে হতো যেন সেদিনই মারাকানার গ্যালারি থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। বলতেন, “পেলে বল পেলে যেন বল বাতাস বেয়ে চলে যেত।” আবার কলকাতার বলাই, সামাদ জাদুকর ছিলেন তাঁর কাছে ফুটবলের জাদুকর। কে কখন কীভাবে গোল করত — এমন জীবন্ত বর্ণনা দিতেন, যেন তিনি নিজেই গোলপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমি, রহমত উল্লাহ বাবু, নাজিমসহ আরও কয়েকজন ছিলাম তাঁর সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা। বিকেলের সেই সময়গুলো আমাদের কাছে ছিল এক অনাবিল আনন্দময় পাঠশালা। আমারও বিকেল বেলা নানার দোকানে থাকায় সুবিধায় বাইরে বেরনোর সুযোগ থাকত , স্বাভাবিকভাবে আমার নানা আমার বাইরে বের হওয়া বা গ্রামের অনন্য সমবয়সীদের মেলামেশার বিষয়টি সীমিত করে রেখেছিলেন , মুখে কিছু না বললেও তার মনোভাব আমি বুঝতে পারতাম, কিন্তু ইসমেইল ভাইর গল্প আমাকে চুম্বকের মতো টানতো, নানা বাড়িতে না থাকলে বা দোকানে গেলে আমার নিজকে খব স্বাধীন মনে হতো । ইসমাইল ভাইয়ের গল্প শুনতে শুনতে আমারও ইচ্ছে হতো — আমি-ই একদিন হবো ব্রাজিলের কালা মানিক পেলে, কিংবা কলকাতার সামাদ জাদুকর !

