বিশ্বের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম বইমেলা হিসেবে ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলার সুনাম সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে আয়োজিত এই মেলা যেন বইপ্রেমীদের এক মিলনমেলা। প্রকাশক, লেখক, অনুবাদক, সাহিত্য সমালোচক থেকে শুরু করে বই ব্যবসায়ী—প্রায় পৃথিবীর প্রতিটি দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন জ্ঞান ও সংস্কৃতির এই মহাসমাগমে।
আমার সৌভাগ্য যে আমি টানা ৪৫ বছর ধরে এই মেলায় অংশ নিচ্ছি। প্রতিবারই মনে হয়, যেন নতুন করে এক পৃথিবীর দরজা খুলে যাচ্ছে। এখানে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের। যাদের বই আগে পড়েছি মুগ্ধ হয়ে, তাঁদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কথা বলা—এ এক আজীবনের সম্পদ। সাহিত্য যে শুধু পৃষ্ঠার অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে—তা আমি এই মেলা থেকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।
এবারের বইমেলার বিশেষ আকর্ষণ গেস্ট অব অনার দেশ ফিলিপাইন। এর মাধ্যমে ফিলিপিনো সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের দারুণ সুযোগ তৈরি হবে। তাদের ইতিহাস, সংগ্রাম, লোককথা ও আধুনিক সৃষ্টির বৈচিত্র্য আমাদের সাহিত্যবোধকে আরও সমৃদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুধু বই কেনা-বেচার আসর নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মহাতীর্থক্ষেত্র। এখানে অনূদিত হয় এক ভাষার সাহিত্য অন্য ভাষায়, জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা চুক্তি, পরিকল্পিত হয় নতুন গ্রন্থ প্রকাশনা। শিশু সাহিত্য থেকে বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ, কল্পকাহিনি থেকে দার্শনিক রচনা—সবই এখানে সমান মর্যাদায় স্থান পায়।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বইমেলাটিও বদলে যাচ্ছে। ছাপা বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অডিওবুক, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বইপাঠ—সবকিছুরই আলাদা বিভাগ রয়েছে। ফলে তরুণ পাঠকদের আগ্রহও বেড়েছে বহুগুণ।
আমার কাছে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা শুধু একটি মেলা নয়, এটি এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রতি বছর এসে নতুন করে শিখি, নতুন মানুষকে জানি, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে হাত মেলাই। যারা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন, তাঁদের জীবনে অন্তত একবার এই মেলায় আসার আহ্বান জানাই। কারণ এখানে এসে বোঝা যায়—বই কেবল একটি পণ্য নয়, এটি মানুষের ইতিহাস, সৃজনশীলতার উত্তরাধিকার এবং বিশ্বমানবতার সেতুবন্ধন।
হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

