স্বাধীনতার পরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা এখনো ভুলতে পারি না। যুদ্ধ শেষ, দেশ স্বাধীন—কিন্তু সামনে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা তরুণেরা তখন একটাই স্বপ্নে বিভোর—একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া।
সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জন্ম নেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদ। আমরা ছিলাম সেই সূচনালগ্নের অংশীদার। তখন পৃথিবীব্যাপী সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার। রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ভেবেছিলাম, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেও আমরা গড়ে তুলব তেমন এক সমাজ—যেখানে সবাই সমান, সবাই মানুষের মর্যাদা পাবে।
আমরা তরুণ ছিলাম, আদর্শে উজ্জীবিত, স্বপ্নে মগ্ন। কিন্তু বুঝিনি—যুদ্ধবিধ্বস্ত এক রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়া শুধু রোমান্টিক স্বপ্ন নয়, তা এক কঠিন বাস্তব কাজ। মার্ক্স বলেছিলেন, ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করলেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।’ অথচ আমরা তখন বাস্তবতার চেয়ে আবেগে বেশি ভেসে গিয়েছিলাম।
১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও, ১৯৭৫ সালের অসংগঠিত সিপাহী আন্দোলন, গণবাহিনী গঠন—সব মিলিয়ে আমাদের পথচলায় হঠকারিতা ছিল স্পষ্ট। আমরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারিনি, কী করা উচিত, কী নয়। সেই বিভ্রান্তির মাশুল দিতে হয়েছে প্রিয় সহযোদ্ধাদের জীবন দিয়ে। আজও মনে পড়ে তাদের মুখগুলো—যাদের সঙ্গে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখেছিলাম, পথ চলেছিলাম। তাদের হারানো আমাদের বুকের ভেতর আজও শূন্যতা তৈরি করে রাখে।
তবু একটা জিনিস আজও অটুট—কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা আর বন্ধন। নেতৃত্বে ভুল থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু কর্মীদের মধ্যে যে মমতা, যে একাত্মতা ছিল—তা এখনো টিকে আছে স্মৃতিতে, হৃদয়ে।
ভাঙাগড়ার গল্প
সময় গড়িয়েছে। আদর্শের সেই ঐক্য আজ ইতিহাসের পাতায় টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে। ১৯৮১ সালে জাসদ ভেঙে গঠিত হয় বাসদ—আমি তখন বাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অনেক সহযোদ্ধাও নতুন ধারায় যোগ দেন। তারপর বাসদও ভেঙে যায়, তৈরি হয় নতুন নতুন অংশ। এতগুলো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এক সময়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন—আজ তার সঠিক সংখ্যা আমিও জানি না।
কখনো কখনো ভাবি—এত ভাঙাগড়ার পর আমরা আসলে কী পেলাম? যদি এখন জাসদ বা বাসদের নেতাদের কেউ এই প্রশ্ন করেন, হয়তো কেউ কেউ উত্তর দিতে পারবেন, কিন্তু সেই উত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াবে না। আমরা হারিয়েছি ঐক্য, হারিয়েছি জনগণের আস্থা, হারিয়েছি আমাদের স্বপ্নের দীপ্তি।
তবু, মাঝে মাঝে কোনো পুরনো সহযোদ্ধার সঙ্গে দেখা হলে, ফোনে কথা হলে, মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলো। আমরা অনেক কিছু বলি, হাসি, স্মৃতি রোমন্থন করি—কিন্তু আর প্রশ্ন করি না, “কেন এমন হলো?” শুধু নীরবে মনে মনে বলি—
“কি ছিলাম, আর কি হইলাম…”
আজ বয়স বেড়েছে, সময় বদলেছে, রাজনীতির ভাষাও পাল্টেছে। কিন্তু এখনো যখন রাতের নীরবতায় চোখ বন্ধ করি, দেখি সেই দিনগুলোর দৃশ্য—মিছিল, উচ্ছ্বাস, হাহাকার, ভালোবাসা, ত্যাগ—সব মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় সময়।
আমরা হয়তো ভুল করেছি, তবু সেই ভুলের মধ্যেও ছিল একরাশ সততা, দেশপ্রেম আর স্বপ্নের দীপ্তি। আমরা চেয়েছিলাম দেশের জন্য কিছু করতে, মানুষকে মুক্ত দেখতে। সেই চাওয়াই ছিল আমাদের সাহস।
আজ নতুন প্রজন্ম হয়তো সেই সময়ের গল্প শুনে ভাববে—আমরা অতি আদর্শবাদী ছিলাম। কিন্তু আমি জানি, আমরা শুধু রাজনীতি করিনি, আমরা এক সময় স্বপ্ন দেখেছিলাম। আর স্বপ্ন দেখা কখনো ভুল নয়—শুধু এখন বুঝি, স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে লাগে সময়, অভিজ্ঞতা, আর বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ানো বোধ।
আমরা সেই শিক্ষা পেয়েছি দেরিতে, অনেক মূল্য দিয়ে।
হাবিব বাবুল
সাবেক জাসদ কর্মী ও স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং বর্তমানে জার্মান প্রবাসী , অনলাইন পত্রিকা শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ।

