সকালের আলোয় বার্লিনের এক পার্কের বেঞ্চে বসে আমি যেন তাঁকে দেখি—পাতলা গড়নের মানুষটি, চোখে একধরনের বিষণ্ণ উজ্জ্বলতা। তাঁর পাশে বসে আছেন ডোরা ডায়ামান্ট। দু’জনেই নীরবে তাকিয়ে আছেন শরতের ঝরা পাতার দিকে। সেই নীরবতায় লুকিয়ে আছে প্রেম, উদ্বেগ, আর এক লেখকের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি ফ্রানৎস কাফকা
যিনি প্রাগে জন্মেছিলেন, কিন্তু ভালোবাসার টানে এসেছিলেন বার্লিনে, ১৯২৩ সালে। তিনি লিখেছিলেন, “আমি বার্লিনে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই।” হয়তো সেই স্বাধীনতাই খুঁজে ফিরতেন তিনি স্টেগলিৎসের শরতের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেনের কাচঘরের উষ্ণতায়। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা জমত ক্যাফে ইয়স্তিতে। কিন্তু শরীরের দুর্বলতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেল দূরে, বার্লিন থেকে অনেক দূরে।
ট্রেনে চড়ে আমি পৌঁছাই উত্তরের শহর ল্যুবেকে। এখানে বাতাসে মিশে আছে থমাস মানের পরিবারের গন্ধ—পুরনো বণিকঘর, নোনা নদীর গন্ধ, আর ইতিহাসের আভিজাত্য।
থমাস মানের লেখা “বুডেনব্রুকস” যেন এই শহরের জীবন্ত ইতিহাস। নিজের পরিবারের কাহিনি মিলিয়ে তিনি এঁকেছিলেন এক ব্যবসায়ী বংশের পতনের আখ্যান। সেই আখ্যানই তাঁকে এনে দেয় নোবেল পুরস্কার, ১৯২৯ সালে। হাঁটতে হাঁটতে যখন আমি পৌঁছাই বুডেনব্রুক হাউস-এর সামনে, মনে হয়—এই বাড়িটা যেন কোনো উপন্যাসের চরিত্র, এখনো নিঃশব্দে বলছে তার গল্প।
দক্ষিণের পথে যাত্রা করে আমি পৌঁছাই ডরস্টেনে—কর্নেলিয়া ফুনকের শহরে। নদীর ধারে এক পুরনো গ্রন্থাগার, উঁচু খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে—একটা সত্যিকারের “ট্রিহাউস”। ছোট্ট মেয়েটি কর্নেলিয়া, প্রতি সপ্তাহে যেত সেখানে। হয়তো সেখানেই প্রথম কল্পনার দরজা খুলেছিল তাঁর। বছর পরে তিনি লিখলেন “ইঙ্কহার্ট”, যেখানে বইয়ের চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে। এখনো সেই ট্রিহাউসের জানালা দিয়ে ঝিলিক মারে পড়ুয়াদের হাসি।
পূর্ব দিকে এগোতেই পথ মেলে ভাইমারে। এই শহরেই একসময় মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই দিগন্ত—গ্যোতে ও শিলার।
প্রথমে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসতেন না, এমনকি সহ্যও করতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার সহচর। ১৭৯৮ সালে গ্যোতে লিখেছিলেন শিলারকে—
“তুমি আমাকে দ্বিতীয় যৌবন দান করেছ, এবং আবার কবি বানিয়েছ।”
ভাইমারের গলি, জাদুঘর আর তাদের দু’জনের বাড়ি—সব যেন সেই বন্ধুত্বের সাক্ষী। এখানেই জন্ম নেয় জার্মান সাহিত্যের এক নতুন অধ্যায়—ভাইমার ক্লাসিসিজম।
তারপর আমি চলে যাই দক্ষিণ-পশ্চিমে, পাহাড়ি শহর ক্যালভে। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে হারমান হেসের মূর্তি। তিনি যেন এখনো শুনছেন নদীর স্রোতের শব্দ, আর লিখছেন “সিদ্ধার্থ”—এক মানুষের আত্মঅন্বেষণের গল্প।
হেসে একবার বলেছিলেন, “যখন আমি বন, নদী, উপত্যকা বা পাইনগাছের ছায়ার কথা বলি, আমি ক্যালভের কথাই বলি।” তাঁর কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো সাহিত্য মানেই নিজের মাটিতে ফিরে যাওয়া।
শেষ গন্তব্য মেয়ার্সবুর্গ। লেক কনস্টান্সের তীরে, পুরনো এক দুর্গের জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায় ধোঁয়াশায় মোড়া জলরাশি। এখানেই বসবাস করতেন আনেত্তে ফন দ্রোস্টে-হ্যুলশফ, উনবিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর লেখা “দ্য জিউ’স বিচ ট্রি” আজও জার্মান সাহিত্যের স্মারক।
তিনি নিজের জন্য একটি ছোট ঘর কিনেছিলেন—“লিটল প্রিন্স’স হাউস”। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন দুর্গেই, ১৮৪৮ সালে। এখন সেই দুর্গই এক সাহিত্য জাদুঘর, যেখানে দেয়ালের প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে কবিতার প্রতিধ্বনি।
যাত্রার শেষে আমি ফিরে আসি বার্লিনে। সন্ধ্যার আলোয় পার্কের বেঞ্চে আবার দেখি কাফকাকে—চুপচাপ বসে আছেন, পাশে ডোরা। পাতা ঝরছে, বাতাস হালকা ঠান্ডা। মনে হয়, সমস্ত লেখক—মান, ফুনকে, গ্যোতে, শিলার, হেসে, দ্রোস্টে—সবাই যেন সেই একই নিঃশব্দ বাগানে বসে আছেন, তাঁদের প্রিয় শহরগুলোর গল্প লিখে চলেছেন।
লেখা: ক্রিস্টিনা হেনিং | অনুবাদ ও পুনর্লিখন: হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম . ।

