ইলিয়াস কাঞ্চনের পার্টিতে অর্থায়ন করেন সেই মার্কিন নাগরিক এনায়েত

দিন যত যাচ্ছে ততই উন্মোচিত হচ্ছে ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরীর কার্যকলাপ। নিজেকে বিদেশের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট দাবি করা এই ব্যক্তি দেশে নতুন আত্মপ্রকাশ করা একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থায়ন করতেন। এখন পর্যন্ত এনায়েত করিমের সঙ্গে পুলিশের দুজন প্রভাবশালী ডিআইজির নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়া অন্তত দেড়শ কোটি টাকার চুক্তিতে একজন প্রভাবশালী আমলাকে দুদকের মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন এই ব্যক্তি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।

 

 

সূত্র বলছে, এনায়েত করিম চৌধুরীর সঙ্গে দেশের প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির নানা বৈঠক, অর্থ লেনদেনসহ নানা যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। সেইসঙ্গে তার এদেশীয় একজন বেতনভুক্ত গোলাম মোস্তফা আজাদ নামে সহযোগীরও সন্ধান মিলেছে। এরই মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়ায় গাড়িতে করে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরির সময় গত শনিবার সকালে আটক হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী। বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে তুলে রিমান্ড চাইলে ৪৮ ঘণ্টার রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। সেই রিমান্ড শেষে গতকাল বুধবার তাকে সহযোগীসহ আদালতে হাজির করে ফের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। ওই ঘটনায় দায়ের মামলা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত থাকা অন্তত তিন কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে নতুন আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’কে অর্থায়ন করতেন এনায়েত করিম। নতুন ওই রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত তিনি। পার্টির গঠন থেকে শুরু করে পার্টি পরিচালনার ক্ষেত্রে সব কিছুতেই সংশ্লিষ্টতাসহ পার্টি পরিচালনার সিংহভাগ অর্থের জোগান দিতেন রহস্যময় ওই ব্যক্তি।

জানা গেছে, গত ২৫ এপ্রিল নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’। আত্মপ্রকাশের দিন রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে দলের নাম ঘোষণা করাসহ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে ইলিয়াস কাঞ্চনের মোবাইল ফোন নম্বরটি সক্রিয় পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ইলিয়াস কাঞ্চনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাইয়ের সাবেক মহাসচিব লিটন এরশাদ বলেন, ‘স্যার দেশে নেই। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির রমনা জোনাল টিমের পরিদর্শক আক্তার মোর্শেদ বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন ও তার গঠিত দলের সঙ্গে এনায়েত করিমের সম্পৃক্ততা রয়েছে। দল গঠনের সময়ও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এনায়েত করিম নতুন দলটিতে প্রতি মাসে সাড়ে ৩ লাখ করে টাকা দিয়ে থাকেন। বাকি টাকা ইলিয়াস কাঞ্চন নিজে জোগাড় করতেন।’

এই কর্মকর্তা বলেন, আসামির কাছ থেকে পাওয়া এ তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এজন্য ইলিয়াস কাঞ্চনের বক্তব্য নেওয়া হবে। তবে তিনি দেশের বাইরে থাকায় এখনো তা সম্ভব হয়নি।

এনায়েত করিমের সহযোগী কে এই মোস্তফা আজাদ: তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোস্তফা আজাদ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে কাজ করতেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তিনি স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দেন। তার স্ত্রীও চ্যানেলটির কর্মী।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আক্তার মোর্শেদ বলেন, ‘মোস্তফা আজাদকে ২ লাখ টাকা বেতনে নিজের সহকারী হিসেবে রেখেছিলেন আসামি এনায়েত করিম। এই সহযোগীর মাধ্যমে এনায়েত তার টাকা বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতেন। গুলশানে যে বাড়িতে এনায়েতের থাকার কথা, সেই বাড়িটিতেও থাকতেন মোস্তফা আজাদ। এই বাসা ভাড়ার জন্যও মাসে ২ লাখ টাকা দিতেন এনায়েত।’

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এনায়েতের সঙ্গে একজন প্রভাবশালী আমলার গভীর যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই আমলার নামে দুদকে বেশ কিছু চলমান মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাদের কথাবার্তা, যোগাযোগ ও বৈঠকের বিষয়েও জানা গেছে। মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার শর্তে অন্তত দেড়শ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে দুজনের। তবে টাকা লেনদেনের কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া একজন ডিআইজির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি চাউর হলেও মূলত এনায়েতের সঙ্গে দুজন ডিআইজির যোগাযোগ ও সখ্যর তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে একজন গত ৬ সেপ্টেম্বের এনায়েত করিমকে ঢাকায় বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে যান। আরেকজনের সঙ্গে ঢাকায় আসার পর সাক্ষাৎ করেন এনায়েত।

এদিকে রাজধানীর রমনা থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় এনায়েত করিম চৌধুরী ও তার সহযোগী গোলাম মোস্তফা আজাদকে আদালতে হাজির করে সাত দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন করে পুলিশ। আসামিপক্ষ থেকে জামিনের আবেদন করা হয়। উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.