কী দিয়ে কী ঢাকবে ? 

সংবাদ সরবরাহ করা সংবাদমাধ্যমের কাজ। এখন সেখানে জায়গা দখল করে নিয়েছে সামাজিক প্রচার মাধ্যম। ভুল-শুদ্ধ যাই হোক, বাতাসের চাইতে তো বটেই এমনকি প্রায় আলোর গতিতে সংবাদ নিয়ে আসে সংবাদ পিয়াসী পাঠকের কাছে। ফলে প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকায় বেশ মুখরোচক খবর আসছে। এবারের খবরটা স্বাদ উদ্রেককারী খাবার নিয়ে। সারা রাত জাগলে, ভোর রাতে বা ভোরে ক্ষুধা তো লাগবেই। প্রশ্ন সেটা নয়, কৌতূহল এখন হাঁসের মাংস আর দামি হোটেলের নাশতা নিয়ে। প্রতিদিন কোটি মানুষ নাশতা করে। তারা কোথায় করে, কী খাবার খায় মানুষের তা নিয়ে ভাবনা নেই। কিন্তু যদি তিনি হন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাহলে তো মানুষ নড়েচড়ে উঠবেই। সেই নড়াচড়া দেখছে এবং কথা বলছে মানুষ। বাজারে বাহারি পণ্যের মতো তথ্যও একটি পণ্য এবং এটি শক্তিশালী পণ্য। ‘পুঁজিবাদী পণ্য’ অর্থনীতি জীবনের সব ক্ষেত্রকে গ্রাস করে। পণ্য মানসিকতা এমনভাবে জীবন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে যে, মানুষ পণ্য কাতর হয়ে পড়ে। কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি বাজার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভোক্তার মধ্যে এমন মানসিকতা সৃষ্টি করা হয় যে, ভোক্তা মনে করতে থাকে এটা তার প্রয়োজন। পণ্যের উপযোগিতা কী, তার চাইতেও প্রচারিত পণ্যটা ছাড়া তার আর চলবেই না।  তার নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে হলেও, সেই পণ্যটা তার চাই-ই চাই। একে বলা হচ্ছে পণ্য আসক্তি। এ যেন এক সর্বনাশা নেশা। এই নেশার প্রধান শিকার তরুণ, যুবক আর সহজ টার্গেট শিশুরা। মোবাইল ফোনের নতুন নতুন ফিচার যেন তাদের টার্গেট করেই তৈরি হচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে নতুন নতুন মডেল। দাম যাই হোক, অন্য কিছু বাদ দিয়ে হলেও নতুন মডেল কিনতেই হবে। মোবাইল ফোনের উদাহরণ একটা ছোট্ট অংশ মাত্র, শত শত পণ্য ঘিরে আছে ভোক্তার জীবন। ব্যবসায়ীদের কাছে মানুষ নয়, ভোক্তাই প্রধান লক্ষ্য। তাই আকর্ষণীয় মোড়কে অপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবেশন করা, তাক লাগানো বিজ্ঞাপনে মোহ তৈরি করার মাধ্যমে মূল উদ্দেশ্য বিক্রি বাড়ানো, ক্রেতা ধরে রাখা আর সবশেষে মুনাফা সর্বোচ্চ করা। সে কারণেই দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখার তাগিদ তৈরির চাইতে, মুখের সুগন্ধে আকর্ষণ করার জন্য নৃত্যরত তরুণ-তরুণীর বিজ্ঞাপন কিংবা মুঠো ফোনে সেবা দেওয়ার বিজ্ঞাপনে এত হাসিমুখ কেন আকর্ষণ কর, প্রলুব্ধ কর, বিক্রি এবং মুনাফা বাড়াও।

যে পণ্যের দাম বেশি, সেই পণ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতাও বেশি। সেটা খাদ্য, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, বিলাসী দ্রব্য যাই হোক না কেন। সন্দেহ দূর করে ক্রেতাকে স্বস্তি দেওয়া না হলে, বাজারে অস্থিরতা শুরু হবে এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয়েছিল গ্যারান্টি দেওয়ার ব্যবস্থা। এখন যদিও এখন গ্যারান্টিরও গ্যারান্টি নেই। নাম এবং দায় নেওয়ার ধরন পরিবর্তিত হয়ে ওয়ারেন্টিতে পরিণত হয়েছে।  তারপরও ভোক্তা সান্ত্বনা পায় এই ভেবে, পণ্যটির মান ঠিক আছে কোম্পানিটি সঠিক। তারপর বাকিটা দেখা যাক! তথ্যের ক্ষেত্রেও তেমনি। যে তথ্যের কাটতি বেশি অথবা যে তথ্য সরবরাহ করতে চায় তার বাজার তৈরি করা সব ক্ষেত্রেই চমকপ্রদ তথ্যের ছড়াছড়ি। আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে তথ্য পরিবেশন করা এখন ‘আর্ট অব কমিউনিকেশন’। ফলে সাংবাদিকরা ছুটতে থাকেন, প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন খবর পরিবেশনের জন্য। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না, এটা একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ। প্রবাদ যেমন সহজবোধ্য, তেমনি যেকোনো প্রবাদের বিপরীত যুক্তি থাকে। যেমন মাছটা জীবন্ত, লাফায় এবং শাকের পরিমাণ কম তাহলে কথা সত্য কিন্তু মাছটা যদি মরা হয় আর শাক যদি বেশি হয় তাহলে কী হবে? আর যদি মাছটা বড়, শক্তিশালী হয় তাহলে শাকের আচ্ছাদন ভেদ করে সে বেরিয়ে আসবে। সে কারণেই আবার বলা হয় সত্য চাপা দেওয়া যায় না, সে প্রকাশিত হবেই। কিন্তু এই আশাবাদের সঙ্গে চাপা হতাশাও কাজ করে, সত্য কত দিনে প্রকাশিত হবে? তত দিনে যে, মিথ্যার কাছে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে অনেক কিছু। এখন আর এক নতুন প্রবণতা, মাছের লাফানো দেখতে দেখতে মানুষ ভুলেই যাবে যে, আরও কিছু ছিল দেখার। যারা মানুষকে বোকা বানাতে চান, তাদের জন্য মনোযোগ অন্যদিকে সরানো একটা বড় কাজ। এ কাজে প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা অন্যতম।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের  ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। অভ্যুত্থানের আগের দিন পর্যন্ত মানুষের ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত ছিল অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী সরকার হটানোর লক্ষ্যে। পনেরো বছরের সব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা ঐক্যবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, একটি সাধারণ দাবি তৈরি হয়েছিল এবং মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছিল। সেই সব দাবির লক্ষ্য ছিল, সরকারের পতন ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যে নির্বাচন হতে হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। সেটা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না, ফলে অভ্যুত্থানেরও বিকল্প ছিল না। অভ্যুত্থানে সরকারের পতন নতুবা বিরোধীদের অশেষ নির্যাতন ও নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এর বাইরে ভাবার কিছু ছিল না। ছাত্রদের অংশগ্রহণ আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছে, অভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছে আর সব স্তরের মানুষের মনে এক বিপুল আশার জন্ম দিয়েছে। বৈষম্যের বেদনা থেকে মুক্তির আকুতি তো আমাদের জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। আকুতি যেন আশায় রূপ নিয়েছিল অভ্যুত্থানে। একটা শোষণহীন সমাজ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ আমাদের শত বছরের চাওয়া। ধর্মের পরিচয়ের কারণে নিপীড়িত হবে না কেউ, নারী বলে লাঞ্ছিত হবে না, লিঙ্গ পরিচয় নয় রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক ও সমাজের কাছে সবাই মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে। সুযোগ ও অধিকারের সাম্য কথাটা শুধু লিখে রাখা নয়, প্রয়োগ হবে সমাজে। কেউ কোনো মত প্রকাশ করলে, তা নিয়ে বিতর্ক হবে, কিন্তু মত প্রকাশের কারণে জীবন বিপন্ন হবে না কারও।

রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার, আয়না ঘরে হারিয়ে যাওয়া বা গুম হয়ে যাবে না কেউ। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দেরি হলেও অধিকারের স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করবে না রাষ্ট্র। মানুষের এই চাওয়াগুলো স্বাধীনতা আন্দোলনে যেমন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তেমনি আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এবারের অভ্যুত্থানের পর সেই চাওয়াগুলো প্রথমে ফিকে হয়ে যাওয়া ও ক্রমাগত হারিয়ে যেতে দেখে এক ধরনের হতাশা এবং শেষে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে দেশের মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, অভ্যুত্থান কি সংগ্রামের চেতনা না সুবিধার হাতিয়ার? যে দুঃশাসন আইনের শাসনকে ধ্বংস করেছিল, সেই দুঃশাসনের অনুসরণ বা অনুকরণ করে আন্দোলনের চেতনা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। দুর্নীতি শেষ করে দিয়েছে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। এক ব্যক্তি কেমন করে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারেন এই প্রশ্ন যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উত্থাপন করেন, তখন উত্তর দেওয়ার দায় কার? এই নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে কেউ লাখ-কোটি টাকার মালিক হয়ে যান কীভাবে? সুইস ব্যাংকে টাকা তো রাখেন, এক বছরে তা ২৩ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায় কীভাবে? পিয়ন থেকে প্রধানমন্ত্রী সবাই দুর্নীতির দৃষ্টান্ত কীভাবে তৈরি করতে পারেন? কোনো দায়বদ্ধতা নেই, জবাবদিহি নেই, শ্রমিক কৃষক আর প্রবাসীদের শ্রমে তৈরি সম্পদ এভাবে লুটপাট ও পাচার হতে পারে? অভ্যুত্থানের পর এর একটা ছেদ ঘটবে, অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আর আগের মতো থাকবে না এটাই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু একের পর এক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা, প্রত্যাশাগুলোকে যেন চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

বাজারে সবজির দাম চড়া। মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস অবস্থা। সরকার পে-কমিশন গঠন করে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ঠিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির এই বাজারে সাড়ে সাত কোটি বেসরকারি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন চলছে কেমন করে? এ রকম সময়ে কৌতূহল তৈরি হচ্ছে, ওয়েস্টিন হোটেলে সকালের নাশতা করতে একজনের কত টাকা লাগে? হোটেলের একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ৪০৫০ টাকা। রাতে কাজ করে সকালে চারজন একসঙ্গে নাশতা করলে ১৬ হাজার টাকার বেশি লাগবে। সপ্তাহে একদিন নাশতা করলে মাসে ৬৪ হাজার টাকা নাশতার খরচ। প্রতিদিন অনেক মানুষ ঢাকা শহরের পাঁচতারা হোটেলগুলোতে নাশতা করেন। এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দেশে অনেকের আর্থিক সামর্থ্য বেড়েছে। সামর্থ্যরে কারণ যদি হয় দুর্নীতি এবং ফলাফল যদি দৃশ্যমান হয়, বৈষম্যে তাহলে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক এবং প্রশ্ন করাটাই গণতন্ত্রের শক্তি। ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করতে পারে, তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। ক্ষমতাসীনদের পরিমিতিবোধ খুব প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতা অনেকটা লবণের মতো। কম হলে স্বাদ লাগে না, স্বাভাবিক হলে সুস্বাদু আর অতিরিক্ত হলে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। দেশের মানুষ শুধু দুঃশাসন দেখেনি, পাশাপাশি দেখেছে দুঃশাসকদের দুঃখজনক পরিণতি। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা ভুলে যান সবাই। নেতাদের জীবন নিয়ে জনগণের আগ্রহ থাকবেই। তারা কীভাবে চলেন, কী কথা বলেন আর কী কাজ করেন তা দেখে মানুষ গভীর আগ্রহের সঙ্গে। এসব অনুসরণও করে অনেকে। বলা হয়, স্বাস্থ্য সংক্রামক নয় বরং রোগ সংক্রামক। তেমনি গুণ অর্জন করার চাইতে, দোষ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। তাই সচেতন ও সতর্ক থাকা দরকার নেতাদেরই বেশি কারণ কর্মীরা তা অনুকরণ করে। কিন্তু প্রশ্ন তো জাগতেই পারে, নির্বাচন নিয়ে সন্দেহের দোলাচলের সময় হাঁসের মাংস আর ওয়েস্টিনে সকালের নাশতার আলোচনা দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবে কি না? দূতাবাস তৎপরতা, বন্দর পরিচালনায় বিদেশিদের ইজারা দেওয়া নিয়ে সংশয়, নির্বাচনী সন্দেহ আর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন নতুন খবর ভাবনার উদ্রেক করে। কিছু আড়াল করার জন্য, কিছু প্রকাশ করা হচ্ছে না তো?

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.